ডাক নাম হল সুহৃদ, আর আসল নাম আলিমুল রেজা।
কি? আলিমুল রেজা? ইয়াসমিন আর আমি পরষ্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। আমার ঠোঁট নাক ভুরু সব বেঁকে থাকে।
আলিমুল রেজা আবার কি? এইটা কোনও নাম হইল? আজকাল আরবি নাম কেউ রাখে?
বাবা কঠিন স্বরে বললেন, রাখে।
সুন্দর একটি বাংলা নাম রাখব ইচ্ছে ছিল। ইচ্ছে ছিল হৃদয় রাখব, হৃদয় সমুদ্র। আমার ইচ্ছের কোনও মূল্য নাম রাখার মত বড় ক্ষেত্রে নেই। মা বললেন, কোন এক পীরের কাছ থেইকা আলিমুল রেজা নামডা আনছে।
কোন পীর?
রাজিয়া বেগমের পীর। তর মাথার তাবিজও ওই বেডির কাছ থেইকা আনছিল।
মাস দুই পর ছোটদা গীতাকে নিয়ে এলেন সুহৃদকে দেখতে। সুহৃদের জন্য একগাদা বিদেশি জিনিসপাতি রেখে ক্যামেরায় সুহৃদকে কোলে নিয়ে তাঁদের বিভিন্ন কায়দার ছবি তুলে নিয়ে বিকেলেই চলে গেলেন ঢাকায়। অবশ্য পিয়নপাড়া হয়ে গেলেন। সুহৃদ মার কোলে কাখে বড় হচ্ছে। মার রাত দিন ব্যস্ততা। নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। শাড়ি আলথুালু চুল না আঁচড়ানো। সুহৃদের কাজের জন্য নার্গিস নামের এক মেয়েকে রাখা হয়েছে, নার্গিস সুহৃদের থাল বাটি ধোয়, খাবার জল ফুটোয়, সুহৃদের কাথাঁ কাপড় কাচে, তবু মার এক ফোঁটা বিশ্রাম নেই। সুহৃদ মার য−ত্ন আদরে মোটা তাজা হতে থাকে। ক্যালেন্ডারের গ্লাক্সো কোম্পানীর বাচ্চাদের থেকেও সুন্দর হয়ে উঠতে থাকে ও। মা মা ডাকার আগে শেখে দা দা, দা দু। বাড়িতে সুহৃদের আদর হাসিনা আড়চোখে দেখে। দাদাও। বড় আদরে বড় হতে থাকলেও সুহৃদের একটি অসখু দেখা দেয়। পেচ্ছাব করার সময় ও চিৎকার করে কাঁদে। ডাক্তার দেখে বললেন, অপারেশন করতে হবে। সুহৃদকে নিয়ে আমি আর বাবা হাসপাতালে যাই। বাড়িতে মা গলা ছেড়ে কাঁদছেন দুশ্চিন্তায়। অপারেশন থিয়েটার ফেটে যায় সুহৃদের চিৎকারে, বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা আমারও চোখ ভেঙে জল নামে। পরের মাসে ছোটদা আর গীতা এলে সুহৃদের কষ্টের কথা শুনে দুজনের চোখই ভিজে থাকবে সারাক্ষণ, ভাবি। কিন্তু এলে, যেই না বিস্তারিত বর্ণনা করতে নিই কি করে এইটুকুন একটি বাচ্চা যনণ্ত্রায় ছটফট করেছে, ছোটদা মাঝপথে আমাকে থামিয়ে বলেন, মুসলমানি হইয়া গেছে ভালাই হইছে। এটুকুই, একটি আহা শব্দ শোনার সৌভাগ্য আমার হয় না। ভারি গলায় বলি, এইডা মুসলমানি না, ফাইমসিস হইলে এই অপারেশন করতে হয়।
চল তাস খেলি গা। ছোটদা এক হাতে আমাকে, আরেক হাতে গীতাকে ধরে শোবার ঘরের দিকে যেতে যেতে বলেন।
তাস যখন খেলছি এ ঘরে, ও ঘরে মা সুহৃদকে ঘুম পাড়ানি গান গাইয়ে ঘুম পাড়াচ্ছেন। ঘুম আসেনা ওর, ছটফট করে, গায়ে জ্বর আসছে ওর। মাথায় জলপট্টি দিচ্ছেন মা, জ্বর আসছে খবর পেয়ে আমি আর ইয়াসমিন দৌড়ে খেলা থেকে উঠে যাই। বাবাকে খবর পাঠানো হয়, বাবা এসে সুহৃদের জ্বর দেখেন। দ্রুত চলে যান ফার্মেসি থেকে ওষধু আনতে। ছোটদা আর গীতাকে বলি, সুহৃদের গা জ্বরে পুইড়া যাইতাছে। গীতা কপাল কুঁচকে বলে, জ্বর হইল কেন? বাসি কিছু খাওয়াইছিল নাকি?
বাসি? পাগল হইছ? মা দুধের বোতল ফুটানো পানিতে সাতবার ধইয়া নেয়।
চোখ কপালে তুলে গীতা বলে, সাতবার ধইয়া নেয়? যেন সাতবার যে কোনও জিনিস ধোয়া যায়, তা সে এই প্রথম শুনল। মা তাই করেন, মার ভয়, কখন আবার পেটের অসখু , জ্বরজ্বারি হয়ে যায়। সুহৃদের খুব অল্প কিছুতেই কিছু হয়ে যায়।
যাও, সুহৃদের কাছে যাও না একটু। যাও, দেইখা আসো। বলি গীতাকে। সে অগত্যা তাস ফেলে সুহৃদের কাছে বসতে যায়। কিন্তু বসার দুমিনিট পর শুয়ে পড়ে, শুয়েই ঘুম। শেষ অবধি অন্য বিছানায় এসে তাকে ঘুমোতে হল। মা সারারাত জেগে রইলেন জ্বর হওয়া সুহৃদকে নিয়ে।
সুহৃদ অবকাশে তিন মাস যাপনের পর হাসিনাকে হাসপাতালে যেতে হল। তার বাচ্চা হবে। দাদার বন্ধুরা ডাক্তার, বাবার বন্ধুরা অধ্যাপক, মহা সুবিধে হাসপাতালে, বাচ্চা হয়ে যাবার পর, ইঁদুরের মত ছোট্ট ছেলেটির জন্য হাসপাতালের কেবিনে সব ডাক্তারদের মিষ্টিমখু নয় কেবল, বিরানি-মখু করালেন দাদা। আমি ক্লাসের বন্ধুদের নিয়ে বিরানি খেয়ে এলাম। ইদুঁরটি নিয়ে অবকাশে ফেরা হল। সুহৃদের যেমন যত্ন হয়, ঠিক তেমন য−ত্নর আয়োজন করল হাসিনা তার নিজের বাচ্চার জন্য। অর্জুনখিলা থেকে বাচ্চার জন্য একটি কাজের মেয়ে নিয়ে আসা হল, নতুন মেয়ে নতুন বাচ্চাকে কোলে রাখে, নতুন বাচ্চার কাথাঁ কাপড় কাচে। বাড়িতে কাজের মানুষ এখন চারজন। নার্গিস আর ঝর্ণা, সুহৃদ আর নতুন বাচ্চা শুভর জন্য। বড়দের কাজ করার জন্য, রান্নাবান্নার, কাপড়চোপড় ধোবার, ঘর দোর পরিষ্কারের জন্য আনুর মা আর সুফি। আরেক জন ফুলেরা, অর্জুনখিলা থেকে আনা, হাসিনার ব্যক্তিগত কাজকর্ম করার জন্য। বাবা একদিন বাড়ির মানুষের মাথা গুনতে বসেন। গুনে বলেন, এতগুলা মানুষের খাওন একজনের যোগাড় করতে হয়! লোক বিদায় কর।
কারে বিদায় করতে কয় তোমার বাবা? ঝর্ণারে নাকি? হাসিনা কটাক্ষ করে।
দাদা বলেন, ঝর্নার কথা কয় নাই।
ঝর্নারে আনার আগে তো বাবা মাথা গুনে নাই!
বাবা মাথা প্রায়ই গোনে।
নার্গিস আসার পর গুনছিল?
তাও তো কথা! গুনে তো নাই।
দুনিয়াডা একটু বুঝার চেষ্টা কর।
দুনিয়া কি আমি বুঝি না নাকি?
না, মোটেও বুঝো না। বুঝলে তুমি মখু ফুইটা কিছু কইতে পারতা। সুহৃদই তাদের একমাত্র নাতি না। সুহৃদের জন্য যা করা হয়, তার কয়ভাগ শুভর জন্য করা হয়? হিশাব আছে।
