গীতার বাচ্চা হওয়ার তারিখ পড়েছে, ছোটদা জানিয়ে দিলেন, মা যেন সময়মত ঢাকা চলে যান। মা ঢাকা চলে গেলেন বাসে করে, সঙ্গে নিয়ে গেলেন ছোট ছোট কাথাঁ, ছোট পাতলা কাপড়ের জামা। চামেলিবাগে ডাক্তার টি এ চৌধুরির ক্লিনিকে সতেরোই জুন গীতা নয় পাউন্ড ওজনের একটি ছেলের জন্ম দেয়। ক্লিনিক থেকে ফিরে সে হাত পা ছড়িয়ে বিশ্রাম নিতে থাকে, আর দাগ দূর করার মলম মাখতে থাকে পেটে। মা রেঁধে বেড়ে গীতাকে খাওয়ান, গীতার স্নানের জল গরম করে দেন,ম্যাজম্যাজ করা গা মালিশ করে দেন, বাচ্চাকে গীতার কোলে বসিয়ে মিনতি করেন, বাচ্চারে নিজের বুকের দধু খাওয়াইতে চেষ্টা কর আফরোজা। মায়ের দধু টা বাচ্চার জন্য বড় উপকারি। গীতা আগেও চেষ্টা করেছে, তার বুক থেকে বাচ্চার জন্য কোনও উপকারি দুগ্ধ নির্গত হয় না। এসব তো আছেই, প্রচণ্ড উদ্যমে বাচ্চাকে খাওয়ানো, গোসল করানো, ঘুম পাড়ানো, কাথাঁ বদলানোর কাজ করে যান মা। গীতার মা মাসি, বোন ভাই এসে বাচ্চা দেখতে এসে সপ্তাহ খানিক কাটিয়ে যায়। কড়া লাল সিঁদুর পরা, হাতে শাখা পরা গীতার মার সঙ্গে মা হেসে কথা বলেন, নিজেকে বোঝান, হিন্দু হোক তাতে কি, বাচ্চার তো সে নানি। তারও ত হক আছে বাচ্চা দেখার। মা একাই বাচ্চার যত্ন, বাচ্চার মার যত্ন, বাচ্চার দিদিমা, মামা মাসির যত্ন করে যান। তিনমাস অবদি এই চলল, তিন মাস পর ছেলেকে ছেলের বাবা মার হাতে বুঝিয়ে দিয়ে মা বলেন, এইবার তোমাদের ছেলেরে তোমরা পালো, আমি ময়মনসিংহে যাই। মা ব্যাগে যখন কাপড় গোছাচ্ছেন, গীতা আড়মোড়া ভেঙে তার দীর্ঘ বিশ্রাম সেরে উঠে ঘোষণা করল, সে চাকরি করতে যাবে আবার, ঘরে বসে থাকতে তার ভাল লাগছে না।
তাইলে বাচ্চা দেখবে কে?
গীতা নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বলে,আমি কি জানি! তোমার বাচ্চা তুমি জানো!
ছোটদা মখু চুন করে ঘরে বসে রইলেন। গীতা যদি চাকরি করতে চলে যায়, বাচ্চা তবে কার কাছে থাকবে?
কাজের লোক রাইখা লও। বাচ্চা রাখুক। গীতার নিরাসক্ত স্বর।
ছোটদা গীতার শিয়রের কাছে বসে গীতার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গীতা ও গীতা গীতা গীতা করে গেলেন সারা দুপুর, এরপর গীতার কানের কাছে মখু এনে অনেকক্ষণ ফিসফিস করলেন, মুখটি ঘুরিয়ে ঠোঁটে চুমু খাবার চেষ্টা করে গেলেন অনেকক্ষণ। বিকেলে গীতা শাড়ি পরল, ছোটদার সঙ্গে বাইরে বেরোল। ফেরত এল মার জন্য একটি শাড়ি নিয়ে। মার হাতে শাড়িটি দিয়ে বলল, অনেক খাটছেন ছেলের জন্য, এই নেন শাড়ি।
ছোটদা বললেন, শাড়িটা গীতা পছন্দ কইরা কিনছে। টাঙ্গাইলের বেস্ট শাড়ি।
মা শাড়ি হাতে নিয়ে, হ খুব ভাল শাড়ি বলে শাড়ি বিছানার ওপর রেখে কপালের উস্কোখুস্কো চুল সরিয়ে বললেন,বাবা কামাল, আমারে কালকে কি একটু বাসে তুইলা দিতে পারবা?
কই যাইবেন?
ময়মনসিং।
ময়মনসিং যে যাইবেন, বাচ্চা কার কাছে থাকব? গীতা ত অফিসে যাবে কালকে থেইকা।
ক্লান্তিতে নুয়ে আসা মা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, আমি ত অনেকদিন থাকলাম। এইবার যাই।
তাইলে বাচ্চারে আপনে নিয়া যান মা। ময়মনসিংহে নিয়া যান।
মা চমকে ওঠেন প্রস্তাব শুনে। এ কি করে হয়। এ কদিনের মামলা! কদিনের তা ছোটদা বলেন না, গীতাও বলে না। গীতার সাফ কথা, চাকরি সে যে করেই হোক করবে, বাচ্চার জন্য চাকরি বাদ দেবে না। এখন, মা যদি এ বাড়িতে থেকে বাচ্চা লালন পালন করেন, তো ভাল, নয়ত ময়মনসিংহে নিয়ে করুন।
পরদিন মা বাচ্চা কোলে নিয়ে ময়মনসিংহে এলেন। গীতার হাঁড়িমুখে হাসি ফোটে। মা যখন অবকাশে এলেন বাচ্চা নিয়ে, মার রাতজাগা ক্লান্ত মুখের দিকে কারও নজর পড়েনি, নজর পড়েছে নজরফোঁটা লাগানো চমৎকার দেখতে বাচ্চাজ্ঞটর দিকে। অবকাশে এত ছোট শিশু কখনও জীবন যাপন করেনি, আমি আর ইয়াসমিন ঝাঁপিয়ে পড়ি বাচ্চাকে কোলে নিতে। ওকে ছোঁয়া সহজ কথা নয়, গোসল করে পরিষ্কার জামা গায়ে দিয়ে তবেই কোলে নেওয়া যাবে। এ বাচ্চা আমাদের মত ধুলো কাদায় বড় হওয়ার কপাল নিয়ে আসেনি, এর ব্যবহারের সমস্ত জিনিস, এখনও খেলার বয়স না হলেও, আগাম খেলনা, বিদেশ থেকে তো আনা বটেই, ছোটদা নাকের পাটা বুকের পাটা যত পাটা আছে ফুলিয়ে আরও বলেন, জনসন বেবি লোশন আর পাউডার লন্ডনের মাদার কেয়ার থাইকা আনি, দধু আনি সিঙ্গাপুর থাইকা, কাপড় চোপড় আনি দুবাই থেইকা।
বাচ্চার থাকার জায়গা হল বাবার ঘরে, বাবার বিছানায়। বাবা ঘরের কিনারে অন্য একটি খাট পেতে নিলেন নিজের জন্য। ঘরের বন্ধ জানালা খুলে দেওয়া হল, বাবার গায়ে প্রয়োজন না হলেও বাচ্চার গায়ে আলো বাতাস লাগার প্রয়োজন আছে। বাবার ঘরটি ধুয়ে মুছে ঝকঝক করে ঘরে টেবিল পেতে বাচ্চার খাবার সরঞ্জাম সাজিয়ে নিলেন মা, কমলার রস করার যন্ত্র, ভাত শাক সবজি মাছ মাংস মিহি করার যন্ত্র, বিদেশি দুধের কৌটো, বিদেশ আরও নানারকম গুঁড়ো খাবারের কৌটো, বিদেশি ফিডার, বিদেশি বাটি, চামচ। বাচ্চার খেলনা আর কাপড় চোপড় চলে গেল আলমারিতে। বাচ্চার জন্য প্রতিদিন মুরগির বাচ্চার সপু লাগবে,বাবা বারোটি মুরগির বাচ্চা কিনে পাঠিয়ে দিলেন। প্রথম নাতির জন্য বাবা দাতা হরিশচন্দ্র হয়ে উঠলেন।
দাদার আদরের মুমু চোখ বড় বড় করে বাচ্চার বিদেশি জিনিস দেখে। বিদেশি জিনিসে মার কোনও আগ্রহ নেই। কতদূর গেলে ঠিক বিদেশ যাওয়া হয়, মার কোনও ধারণা নেই, বিদেশ খুব সাংঘাতিক কিছু হবে হয়ত, সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে যেতে হয়, কিন্তু বিদেশি সিল্কের জামা দূরে সরিয়ে দেশি সুতির জামা বাচ্চাকে পরান মা, গরমের দেশে সুতির মত আরাম আর কি আছে! সেরেলাক্স, ফেরেলাক্স ইত্যাদি নানারকম বিদেশি গুঁড়ো খাবার সরিয়ে নিজের হাতে তিনি টাটকা টমেটো, গাজর, পুই শাক পালং শাক নরম করে বাচ্চাকে খাওয়ান। প্যাকেটের ফলের রস ফেলে দিয়ে বাজারের টাটকা ফল থেকে নিজের হাতে রস করে খাওয়াতে লাগলেন। গুঁড়ো দুধে মার বিশ্বাস বাচ্চার পেট খারাপ হয়, ব্রহ্মপুত্রের ওপারে গিয়ে নিজে তিনি ভাগীরথীর মাকে বলে আসেন, তাঁর নাতির জন্য এখন থেকে প্রতিদিন খাঁটি গরুর দধু লাগবে। ভাগীরথীর মা পরদিন থেকে প্রতিদিন আধ সের করে দধু দিয়ে যায়। বাড়িতে বাচ্চাজ্ঞট রাজার বাচ্চার মত বড় হতে থাকে। মার ঘুম হারাম, বাবারও অনেকটা। আমি আর ইয়াসমিন ঘুম হারাম না করলেও বাচ্চা নিয়ে দিনের বেশির ভাগ সময় কাটাতে থাকি। বেশ তো চলছে, কিন্তু বাচ্চার নামের তো দরকার আছে, মণিটা সোনাটা বাবুটা এসব ডাকলে কি চলবে! বাবা আকিকার আয়োজন করলেন। আমরা যে যার বন্ধু বান্ধবকে নেমন্তন্ন করলাম, ছোটদা আর গীতাকেও নেমন্তন্ন করা হল। আকিকার দিন বিশাল এক ষাঁড় জবাই হল, বাবুচির্ আনা হল, বেল গাছের তলে বিশাল গতর্ করে, বড় বড় পাতিলে পোলাও মাংস রান্না চড়ানো হল। মহা আড়ম্বরে আকিকা অনুষ্ঠান হল। বাবা পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে নাম পড়লেন বাচ্চার।
