কালকে ছিল।
রুম এখনো ছাড়ে নাই নাকি?
না।
হুম। তর বান্ধবীর সাথে না দেখা করতে গেছিলি? দেখা হইছিল?
হ।
কি নাম?
নাদিরা।
নাদিরা? ও ওইযে রামকৃষ্ণমিশন রোডের মেয়েটা না?
হ।
তুই না একদিন কইলি ও জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হইছে।
কালকে আসমার সাথে দেখা করতে আইছিল রোকেয়া হলে। থাইকা গেছে।
আসমা কুনডা? হাশিমুদ্দিনের মেয়েডা না?
হ।
ও কি ঢাকা ইনিভার্সিটিতে পড়ে?
হ।
তর না সার্টিফিকেট তোলার কথা!
হ। তুলাম।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে কম্পমান কণ্ঠটিকে বিশ্রাম দিতে ঘরে লম্বা হয়ে শুয়ে দুঃস্বপ্নের মত রাতটির কথা ভাবি। গত রাতটির কথা। রুদ্র বলেছে আমি নাটক করেছি। ও কি নাটক ছিল! অভিমান আমাকে নিঃশব্দে কাঁদাতে থাকে। সারা শরীরে যনণ্ত্রা, যেন এইমাত্র বাঘের গুহা থেকে ফিরেছি। হাঁটতে গেলে যন্ত্রনা হচ্ছে উরুসন্ধিতে। পেচ্ছাব করতে গিয়ে দেখি যন্ত্রণার এক ফোঁটা দু ফোঁটা পেচ্ছাব। বকু যেন বুক নয়, দুমণ পাথর, চুমুর লাল দাগগুলো টনটন করছে, আঙুল ছোঁয়ানো যায় না। একটি রাত কাটানোর কথা রুদ্র সেই কাগজে সই করার পর থেকে বলছে। সই করার আগেও সে কম কামড় দিতে আসেনি, ঝাঁপিয়ে পড়েছে চুমু খেতে, বুকে হাত দিতে, নিজেকে ছাড়িয়ে বাঁচিয়ে নিয়েছি। ধস্তাধস্তি আঁচ করে মাসুদের বাড়ি থেকে না বলে দেওয়া হয়েছে। সেটি না হওয়াতে অভিমান আর রাগ দুটোই সে কম দেখায়নি আমার সঙ্গে। রাতের মূল্য রুদ্রর কাছে এত বেশি কেন, বোঝা হয়নি আমার। আমি তাকে অনেক বলেছি, জীবনের সমস্ত রাত তো পরেই আছে সামনে, অপেক্ষা করি চল। অপেক্ষার যে কষ্ট, সে কষ্ট তো একরকম সখু দেয়। না রুদ্র অপেক্ষা করবে না। অপেক্ষায় কোনও সখু নেই, সে বলে। আমি যত বলি, চল ভালবাসি, রুদ্র বলে চল শুই, শুতে যাই। রুদ্র হাভাতের মত খাই খাই করছে। আজই তার চাই। এক্ষুনি চাই। এক্ষুনি না হলে তার আর চলছে না। ময়মনসিংহে যখন যায়, নির্জন একটি ঘর পেতে উন্মাদ হয়ে ওঠে। আমার পক্ষে নির্জন ঘর পাওয়া সম্ভব নয় জেনেও ঘর আমি কেন পাইনি এ নিয়ে অভিমান করে, কেবল অভিমান নয়, রাগ। একটি রাত তার কাটানোই চাই। একটি রাত তো শেষ অবদি কাটানোই হল, দুঃস্বপ্নের একটি রাত। আমি এমন করে নিজের জীবনকে ভাবিনি কখনও। আমারও তো অভিমান হয়, আমারও তো রাগ হতে পারে। রুদ্রকে ইচ্ছে করে ছুঁড়ে ফেলে দিই। কিন্তু ফেলতে গেলে দেখি হাত দুটো অচল হয়ে আছে আমার। যেন পঙ্গু আমি। কেবল ওই কাগজটির কাছে হার মেনেছি, আমার ওই সইটির কাছে, যেহেতু ওই কাগজে সইএর নাম বিয়ে! নাকি রুদ্রকে আমি ভালবাসি! ভাবি। ভাবনা আমাকে ছেড়ে কোথাও এক পা যায় না। ছোটদাকে বলা মিথ্যেটি নিয়েও ভাবি। ছোটদা তো ভাবতে পারেন এরকম যে ঝুনু খালার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর আমার সেই ইশকুলের বান্ধবীর সঙ্গে অনেকদিন পর আমার গল্প করা গড়িয়ে গড়িয়ে মধ্যরাত ছুঁলে, অগত্যা রুনুখালার পুরোনো ঘরটিতে আমি বাকিরাতটুকু শেষ করেছি ঘুমিয়ে। ছোটদা কি রকম ভেবেছেন কে জানে, তবে আমাকে আগলে রেখে আর কোনও বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে একা বেরোতে না দিয়ে, রেজিস্টার বিল্ডিংএ আমাকে নিজে নিয়ে গিয়ে সার্টিফিকেট তুলিয়ে, দুদিন পর আমাকে পৌঁছে দিয়ে আসেন ময়মনসিংহে।
রুদ্র পরে বলেছে, আমি তাকে সম্পর্ণ বিশ্বাস করি না। আমার এখনও সংশয় মনে। আমি আহত হয়েছি শুনে। বলেছি তাকে বিশ্বাস করি বলেই, তাকে আমি সম্পণূর্ বিশ্বাস করি বলেই ভালবাসি, ভালবাসতে হলে যে জিনিসটির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সে বিশ্বাস। এই বিশ্বাসের মধ্যে একসুতো ফাঁক থাকলে ভাল লাগা হয়ত হয়, ভালবাসা হয় না। রুদ্র লিখেছে, আমি কি এতটাই হতভাগ্য যে আমাকে সব কিছুই জোর করে নিতে হবে? সব কিছু আদায় করে নিতে হবে? জোর করে যতটুকু নেওয়া যায়, যতটুকু নেওয়া শোভন, আমি তা নিয়েছি। আমার আর যা একান্ত পাওয়ার, যা আমার নিভৃততম পাওয়া, যদি কোনোদিন নাও পাই, তবু আমি তা জোর করে নেবো না, আদায় করে নেবো না। বিশ্বাস আর ভালবাসা নিয়ে আমি কখনোই প্রশ্ন তুলি না। সম্পণূর্ বিশ্বাস বলতে আমি অন্য কিছু বোঝাতে চেয়েছি, সেটা বুঝতে না পারার তো কোনো কারণ নেই।
এই ঘটনার প্রায় দেড়বছর পর রুদ্র লেখে, বউসোনা, এবার কি হয়েছে জানো? শাড়ি পরা তোমাকে দেখে প্রথম মনে হল আজ যেন প্রথম তোমাকে দেখছি। যেন তুমি অন্য কেউ, যেন এক অন্য মানুষ, এক নোতুন মানুষ। গত দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন রকম ভালো লাগা পেয়েছি কিন্তু এ যেন তার সব কিছু থেকে আলাদা। একেবারে আলাদা এক ভালো লাগা। মনে হলো যেন আমাদের এইবারই ভালবাসার শুরু। যেন এতোদিন শুধু মহড়া হয়েছে। আজ একেবারে মঞ্চে।
দেড় বছরে দুমাস কি তিন মাস অন্তর অন্তর একবার এসেছে রুদ্র ময়মনসিংহে। সম্বোধন করি না বলে রাগ করে আমাকে সম্বোধন হীন চিঠি লিখেছে বেশ কয়েক মাস। প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনে আমাদের সময় কেটেছে। ক্যান্টিন থেকে যখন উঠতে হয়েছে, এদিক ওদিক কোথাও বসে কথা বলার জন্য আগের মতই জায়গা খুঁজেছি। বরাবরের মতই জায়গা খুঁজে পাওয়া আমার জন্য দুঃসাধ্য হয়েছে। রুদ্রর অনুরোধে একদিন শাড়ি পরে দেখা করতে যাই। শাড়ি আমি ভাল পরতে জানি না, ইয়াসমিনের সাহায্য নিয়ে মার একটি শাড়ি পরে বান্ধবীর জন্মদিনে যাচ্ছি বলে বেরোই। সে দিনটিতে খানিকটা নির্জনতার সুযোগে দুটো তিনটে চুমু খাবার, বুকে হাত দেবার সুযোগ রুদ্র পেয়েছিল, ফিরে গিয়ে লিখেছে ওই চিঠি।
