মনে মনে হাসছো, না?
আসলেই, সত্যি মনে হলো এতোদিনে আমাদের ভালবাসার শুরু। যেন এতোদিন আমরা শুধু পরস্পরকে ছুঁয়ে ছিলাম, আজ যেন আমরা পরষ্পরের শরীরের উত্তাপ পাচ্ছি। বুঝতে পারছি পরষ্পরের হৃদপিণ্ডের ধ্বনি। আজ মনে হচ্ছে কোনোবারই বুঝি এতোটা মন ভরেনি। তুমি একটু একটু করে সহজ হচ্ছে!, স্পষ্ট হয়ে উঠছো। আমি যেন এক অচেনা পৃথিবীকে চিনতে পারছি। আমি তো এতোদিন ধরে তোমার এই সহজ হয়ে ওঠার প্রতীক্ষায় ছিলাম। তুমি আরো, আরো বেশি সহজ আর স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তুমি আরো বেশি উ−ন্মাচিত হয়ে উঠবে। আমাদের মতো এতো সুন্দর আর কারো ভালোবাসার ঘর হবে না—-তুমি দেখে নিও। এবার একটু আদর করো না লক্ষ্মী। না. না. মখু টা ঘুরিও না।তাকাও, আমার চোখের দিকে তাকাও। এতো লজ্জার কি আছে। আমি তো তোমার সেই কতোদিনের চেনা। এই চোখ, এই ভুরু, এই কপাল, এই মখু , এই শরীর তুমি কতোবার ছুঁয়েছো। কতোবার আমরা আমাদের আলাদা কোরে চিনতে পারিনি। তবে? তবে এতো লজ্জা পাচ্ছে! কেন? ঠোঁটটা ছোঁয়াও। কই—ছোঁয়াও।
একটু একটু কোরে বশ করছি নিজেকে। এরোম কোরে আমায় যদি একটু ভালোবাসা দাও, দেখো আমি ঠিক তোমার মনের মতো হয়ে উঠবো। অথবা তুমি ঠিক আমার মনের মতো। আসলে ভালোবাসা মানে বোধহয় দুটি মনকে একটি মন বানিয়ে ফেলা। ইচ্ছে করছে চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার কোরে সবাইকে ডেকে বলি—তোমরা শোনো, আমি আমার ভালোবাসার মানুষ পেয়েছি, আমরা একটি হৃদয় হতে পেরেছি।
লক্ষ্মী থেকো, সোনা আমার। ভালো থেকো প্রাণ। আদর আদর আদর। তোমার রুদ্র।
১৬. বদলে যাচ্ছে
অবকাশের চেহারাটি খুব পাল্টো গেছে। ইয়াসমিন মেট্রিক পাশ করেছে। পাশ করেছে প্রথম বিভাগে। রসায়নে একটি লেটার আছে তার। এই লেটারের কারণে ইয়াসমিন আমার চেয়ে বেটার ট্রিটমেন্ট পাচ্ছে সংসারে। বাবা,ওকেও, স্বপ্ন দেখেন ডাক্তারি পড়াবেন। ওর আনন্দমোহনে ভর্তি হওয়ায় বাবা আপত্তি করেননি। ইয়াসমিন হঠাৎ করে যেন অনেক বড় হয়ে গেছে। আগের ছোট্ট বাচ্চাজ্ঞট নেই আর। আমরা দুবোন কোথাও গেলে, অনেকে, যারা ইয়াসমিনকে চেনে না, ভাবে যে ও আমার বড় বোন, গায়ে গতরে আমার চেয়ে বেশি বেড়ে উঠেছে বলেই। আমি যে বয়সে ওড়না পরতে শুরু করেছি, অবশ্য ঘরে নয়, বাইরে, ইয়াসমিনকে তার আগেই পরতে হয়েছে। বুকের বেঢপ বেড়ে ওঠার কারণে ও কুঁজো হয়ে হাঁটতে শুরু করেছে আমার মতই, ওড়না না পরার মাশুল এভাবেই দিতে হয় কি না। মা ওর কুঁজো পিঠেও কিল দিয়ে বলেন, সোজা হ। ওড়না পইরা আয়, তবু সোজা হইয়া হাঁট। বড় হইছে মেয়ে ওড়না পরতে শরম কেন? বয়সে না হয় বড় লাগে আমার চেয়ে ওকে, দুজনের মধ্যে দেখতে কে সুন্দর এই প্রশ্ন উঠলে, আমার দিকে পাল্লা ভারি হয়। ইয়াসমিন নিজের চেহারা, বয়সের চেয়ে বেশি বয়স দেখতে লাগা শরীরটি নিয়ে ভোগে মনে মনে। অথচ চোখের তুলনা করলে ও যদি হরিণ হয়, আমি হাতি,ওর ঘন কালো চুলের সামনে আমার চুল নিতান্তই ফিনফিনে, কিন্তু ছোট নাক, ছোট চিবুক, পুরু ঠোঁট নিয়ে ইয়াসমিনের খুঁতখুঁতুনির শেষ নেই। ওর ভেতরে গোপনে গোপনে একটি ঈর্ষার জন্ম হয়। আমার কোনও ঈর্ষা হয় না, বরং ওকে বাইরের সকল প্রলোভন থেকে, ভুল থেকে মিথ্যে থেকে সরিয়ে রাখতে ইচ্ছে হয়। আমি কিছুতেই চাই না আমি যে দুঃখ বাবাকে দেব, সেরকম কোনও দুঃখ ইয়াসমিনও দিক। আমার চোখের ওপর একটি স্বপ্নের প্রজাপতি এসে বসে, বলে, ইয়াসমিন মেডিকেল কলেজে পড়বে, আমি যত বড় ডাক্তার হব, তার চেয়ে বড় হবে ইয়াসমিন। ডাক্তারি পাশ করে হাবিবুল্লাহর মত কোনও সুদর্শন ডাক্তার ছেলেকে বিয়ে করবে। এতে যদি আমার দেওয়া দুঃখ খানিক লাঘব হয় বাবা মার। ইয়াসমিনের ঈর্ষা আমাকে ব্যথিত করে। লক্ষ করি ও দূরে সরছে। আমার গায়ে গায়ে লেগে থাকা ইয়াসমিন এখন দাদার বউএর গায়ে গায়ে বেশি লেগে থাকে। কলেজে যায় আসে, বাকিটা সময় দাদার বউএর সঙ্গে হাস্যরসের ঢলে সাঁতার কাটে। যদি ওর পড়াশোনার খবর নিতে যাই, ও এমন চোখ করে তাকায় আমার দিকে যেন আমি ওর সবচেয়ে বড় শত্রু। ছোটদা নেই অবকাশে। সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে আমার মেতে থাকা নেই। ছোটদা যেহেতু লেখাপড়া না করা, অকালে বিয়ে করা, টইটই করে ঘুরে বেড়ানো বখাটে ছেলে ছিলেন, তার সঙ্গে, নাচ গান কবিতা নাটকের অনূষ্ঠানে বাবাকে লুকিয়ে মাকে নিমরাজি করিয়ে আমার আর যাওয়া হয় না। ছোটদাও এখন পাল্টো গেছেন। তাঁকে এখন এ বাড়িতে বড় পিঁড়িটি দেওয়া হয়, টুডাইল্যা নামটি তাঁর ঘুচেছে, তিনি আর খবর রাখেন না শহরে কোথায় কি হচ্ছে, কোথায় নাটক, কোথায় নাচ গান। দাদা আছেন, তবে থেকেও নেই। এ বাড়ির মানুষগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বদলে গেছেন দাদা। তিনি আর সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে মাথা ঘামান না। সেঁজুতির প্রসঙ্গ এলে তিনি আর বলেন না, যা আমি ছাপাইয়া দিয়াম নে। সংসারের অন্য কারও কিছু নিয়ে মাথা ঘামান না। গান শোনা, ছবি তোলা, নিজের সুটবুট কেনা, দামি সগু ন্ধি মাখা এসব ব্যাপারেও তাঁর আগ্রহ নেই আর। তিনি বউএর জন্য শাড়ি গয়না কেনায় ব্যস্ত। প্রায়ই শাড়ি কিনে নিয়ে আসেন, আমাদের দেখান শাড়ি কেমন হয়েছে, আমরা বলি খুব ভাল শাড়ি, খুব মানাবে বউকে। বউএর আত্মীয়ের বাড়িতে নিমনণ্ত্র খেতে ব্যস্ত দাদা। বাড়িতে অতিথি এখন বেশির ভাগই হাসিনার বোন, বোনজামাই, ভাই, ভাইবউ ইত্যাদি। আত্মীয়ের মধ্যে কে ভাল, কে মন্দ, কে বেশি কথা বলে, কে কম, কে দেখতে সুন্দর, কে নয়, কার কত ধন আছে, কার কত দারিদ্র এসব নিয়ে আলোচনা করতে তিনি পছন্দ করেন বেশি। বাঁশের কঞ্চির মত শরীর হাসিনার। মা প্রতিদিন ভাল ভাল রান্না করে তাকে খাওয়াচ্ছেন। হাসিনা দাদার সঙ্গে প্রায় বিকেলে বেড়াতে যায়, বাকিটা সময় মুখে কাঁচা হলুদ মেখে দুপুরবেলা বারান্দায় বসে থাকে, অনেকক্ষণ সময় নিয়ে গোসল করে, পাঁচ ছ বেলা খায়, আর ঘুমোয়। তবু সে একটি নতুন জিনিস বাড়িতে, আমাদের উৎসাহ কমে না। বিশেষ করে ইয়াসমিনের। ইয়াসমিন হাসিনার সঙ্গে লেপ্টে থাকে, এমনকি হাসিনার ব্লাউজ খুলে স্তন মুঠোয় নিয়ে মায়ের দুদু খাওয়া বাচ্চার মত শুয়ে থাকে। দেখে লজ্জায় সরে গিয়ে আমি দূর থেকে বলি হাসিনাকে, তোমার শরম করে না? সে বলে, বিয়া হইয়া গেলে আবার শরম থাকে নাকি? মারও তো বিয়ে হয়ে গেছে। মা কখনও স্তন উদোম করে রাখেন না। গীতাও কোনওদিন রাখেনি। গীতার অবশ্য স্তন জিনিসটি কম, ব্রেসিয়ারে তুলো ভরে পরতে হয় তাকে। হাসিনা যেহেতু ভাল শাড়ি পরতেও জানে না, ভাল সাজতেও জানে না, বেড়াতে যাওয়ার আগে ইয়াসমিন হাসিনাকে শাড়ি পরিয়ে দেয়, গীতার শাড়ি পরা দেখে দেখে এই জিনিসটি ভাল শিখেছে ও। হাসিনার মুখ সাজিয়ে দেয়, এও গীতার কাছ থেকে ওর শেখা। হাসিনাকে প্রথম প্রথম আমি হাসিনা বলেই ডাকতাম, কিন্তু এতে সে খুশি হয়নি, বৌদি ডাকার আদেশ দেয়। ইয়াসমিন দিব্যি বৌদি ডাকে। বৌদিকে নিয়ে সে বৌদির বোনের বাড়ি ভাইয়ের বাড়ি বেড়াতে যায়। বৌদি শাড়ি কিনতে যাবে, ইয়াসমিন সঙ্গে যাবে পছন্দ করে দিতে। বৌদি জুতো কিনবে, ইয়াসমিন বাজারের সবচেয়ে ভাল জুতোটি দাদাকে বলবে কিনে দিতে। আমার পক্ষে সম্ভব হয় না কলেজের চেনা একটি মেয়েকে বৌদি ডাকার। হাসিনা ডাকে আপত্তি তোলার পর এই হয় আমার, আমার হাসিনা ডাকটিও বন্ধ হয়ে যায়, এই শোনো, এই দাদার বউ শুনে যাও, এভাবে কাজ চালাই। হাসিনা নামটি দাদার খুব অপছন্দ, তিনি হাসিনা মমতাজ থেকে হাসিনা বাদ দিয়ে, মমতাজ থেকে মম নিয়ে, মমকে মুমু বানিয়ে হাসিনাকে মুমু বলে ডাকেন। দাদা এখন আর মার জন্য বা আমার আর ইয়াসমিনের জন্য কোনও জিনিস কেনার কথা ভাবেন না। ঈদ এলে হাসিনার জন্য বাজারের সবচেয়ে দামি শাড়িটি কিনে আনেন। মাকে একটি শাড়ি দেবার পুনঃ পুনঃ অনুরোধে তিনি চক্ষুলজ্জার খাতিরে ঈদের আগের রাতে মার জন্য হয়ত একটি সস্তা সুতির শাড়ি কিনে আনেন। মা টের পান, এই দেওয়ায় আগের সেই ভালবাসা নেই। আমরাও টের পাই। আমাদের, আমাকে আর ইয়াসমিনকে যে তিনি চক্ষুলজ্জার খাতিরেও কিছু দিচ্ছেন না এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন বা অনুযোগ আমরা করি না। কারণ এরকমই নিয়ম বলে ভাবি যে দাদার এখন বউ হয়েছে দাদা বউকেই সব দেবেন। বউকে সুখী দেখলে আমাদের ভাল লাগে। বউএর মুখে হাসি ফুটলে দাদার মুখে হাসি ফোটে। দাদার পকেট থেকে আমাদের আর টাকা নেওয়া হয় না, ছোটদা চলে যাওয়ার পর আমি আর ইয়াসমিনই সে কাজ নিজ দায়িত্বে অনেকদিন চালিয়েছি, ঘরে এখন বউএর পাহারা আছে। দাদার হাত থেকে দপু য়সা খসলে সে পয়সা বাড়ির অন্য কারও জন্য খসতে দিতে রাজি নয় হাসিনা। দাদার টাকাকে দাদার জিনিসপত্রকে হাসিনা তার নিজের টাকা, নিজের জিনিসপত্র বলে মনে করে। আমাদের কাচের বাসনপত্র থেকে সে দাদার কেনা কাচের বাসনপত্র আলাদা করে সরিয়ে নিতে নিতে বলেছে, আমারগুলা তুইলা রাখতে হবে। এইগুলা যেন ইউজ না হয়। দাদার কেনা ফ্রিজে আনুর মা পানির বোতল রাখতে যায়, যেমন আগে রাখত, এখন আনুর মাকে থামিয়ে হাসিনা বলে আমার ফ্রিজে হাত দিতে হইলে আমারে আগে জিগাস কইরা নিবা। ফ্রিজটি নিজ হাতে মুছতে মুছতে সে বলে, আসলে ফ্রিজ একজনের হ্যান্ডেল করা উচিত, এত লোক ফ্রিজে হাত দিলে আমার এই ফ্রিজটা কয়দিন পরেই নষ্ট হইয়া যাইব। হাসিনার এই আমার শব্দটি শুনে মনে হয় আমরা যেন এ বাড়িতে দুটো দল, এক দলে আমরা, আমি বাবা মা ইয়াসমিন, অন্য দলে দাদা আর হাসিনা। রিয়াজউদ্দিনের ছেলে জয়নাল টিনের ঘরে থাকে, ইশকুলে পড়ছে শহরে। জয়নালকে দেখলে হাসিনা বলে, এই ছেড়া এক গ্লাস পানি দে তো অথবা এই ছেড়া দৌড়াইয়া একটা রিক্সা লইয়া আয়, যা। জয়নাল পানি নিয়ে দেয়। দৌড়ে রিক্সা ডেকে আনে। হাসিনা শাড়ি পরছে, আশেপাশেই ছিল জয়নাল,এই ছেড়া জুতাডা মুইছা দে তো। জয়নাল হাসিনার পায়ের কাছে বসে ছেঁড়া ত্যানায় তার জুতো মুছে দেয়। মা একদিন বললেন, জয়নালরে এইভাবে কইও না বৌমা। জয়নাল ত বাড়ির কাজের ছেলে না, নোমানের আপন চাচাতো ভাই লাগে। হাসিনা খসখসে গলায় বলে, ছেড়ারে কইতাম না তো কারে কইতাম? বেডি যে একটা আছে, ও তো পাকঘরেই পইড়া থাহে। ডাইকা পাওয়া যায় না।
