আয়-ব্যয়ের কোনো খোঁজখবর করিতাম না। আমি যা রোযগার করিতাম স্ত্রীর হাতেই আনিয়া দিতাম। যা খরচ করিতাম তাও স্ত্রীর কাছ থনেই চাহিয়া নিতাম। পনের-ষোল বছরের বালিকা স্ত্রীর উপর এমন গুরুদায়িত্ব দেওয়াটা ছিল বিশ্বাস ও ভরসা উভয় দিকেই অসাধারণ। টাকা-পয়সার দায়িত্ব স্ত্রীর হাতে ছাড়িয়া দেওয়ার নজির খুবই বিরল। কাজেই আমার এমন ব্যবহার দেখিয়া-শিখার ব্যাপার নয়। তবে এটা আমি শিখিলাম কই? শিখিতে হয় নাই। অমনিতেই হইয়াছে। কিন্তু তারও ত একটা কারণ থাকার কথা? আমার মনে হয় সে কারণটা আমার স্ত্রীরই কৃতিত্ব। আর্থিক ব্যাপারে তাঁর তখনকার ব্যবহার সেটা ছিল নিতান্তই অসাধারণ। খুব হিসাবি মিতব্যয়ী স্ত্রীরাও স্বামীর টাকা-পয়সার ব্যাপারে নিজের খরচের বেলা মিতব্যয়ী হন না। কিন্তু আমার পনের-ষোল বছরের বালিকা স্ত্রীর মধ্যে আমি এর ব্যতিক্রম দেখিলাম। পুলকিত ত হইয়া ছিলামই, চমৎকৃতও হইয়াছিলাম। প্রথম ঘটনাটা এই :
স্ত্রীকে ময়মনসিংহ বাসায় আনার পর প্রথম শীতের আগমনেই স্ত্রীর জন্য আট টাকা দামে একটি গরম ফুলহাতা সুয়েটার কিনিয়াছিলাম। বাসায় ফিরিয়া গায়ে দিতেই বুঝা গেল আস্তিনটা তিন-চার ইঞ্চি খাট। বদলাইয়া আনিতে একাই দোকানে গেলাম। দুইটা অসুবিধা দেখা দিল। সুয়েটারের রং বদলাইতে হয়। আর পাঁচ টাকা দাম বেশি দিতে হয়। স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করিতে বাসায় ফিরিলাম। স্ত্রী রং বদলাইতে আপত্তি করিলেন না। কিন্তু পাঁচ টাকা বেশি খরচ করিতে আপত্তি করিলেন। তার বদলে তিনি পশমি মোটা সুতার একজোড়া বেবি হাফ মোজা কিনার হুকুম দিলেন। তাঁর নির্দেশমত আমি এক জোড়া পশমি হাফ মোজা কিনিলাম। কেন মোজা কিনিলাম বুঝিবার চেষ্টা করিলাম না। পাঁচ টাকার বদলে দশ আনার মোজা কিনিয়াই আমি খুশি হইলাম। পরদিন সন্ধ্যায় কোর্ট হইতে ফিরিয়াই দেখিলাম, কবজি-তক লম্বা আস্তিনের সুয়েটার গায় দিয়া আমার স্ত্রী আমার অপেক্ষায় দাঁড়াইয়া আছেন। তার মুখে মুচকি হাসি। বেবি হাফ মোজা দিয়া তিনি সে সুয়েটারের আস্তিন লম্বা করিয়াছেন, তাঁর ভাষায় এই ‘সোজা কাজটাও তিনি আমাকে নাশতা-চা দেওয়ার আগে বুঝাইলেন না। জোড়া মিলানের কৌশল ও অদৃশ্য সিলাইর নিপুণতা বুঝাটা আমার জন্য নিতান্ত সোজা কাজ ছিল না। তাঁর সিলাই নিপুণতা আমাকে মুগ্ধ করিয়াছিল। নিশ্চয়ই। কিন্তু অব্যক্ত আনন্দে পুলকিত হইয়াছিলাম অন্য কারণে। তারই পোশাক বাবত স্বামীর টাকা খরচে অমন মিতব্যয়িতা? একটি বালিকা স্ত্রীর মধ্যে? আমি এক মুহূর্তে বুঝিলাম এই বালিকার উপর আমি সব ভার ছাড়িয়া দিতে পারি। দিলামও। এর পরও অমন অনেক ঘটনা ঘটিয়াছে। সবটাতেই আমি বুঝিয়াছি, আমি ভুল করি নাই।
.
৪. কুশলী নিপুণা গিন্নি
তাঁর এই আর্থিক স্বাধীনতা ও আমার একান্ত স্ত্রী-নির্ভরতা আমার জীবনের। অমূল্য সম্পদ। আমার সুখ-শান্তির আকর। সম্পূর্ণ নিশ্চিন্তে, নিরুদ্বেগে ও বেপরোয়াভাবে উকালতি, রাজনীতি, সাহিত্য ও সাংবাদিক জীবন যে আমি যাপন করিতে পারিয়াছি, তা একান্তভাবেই আমার এই বৈষয়িক নিশ্চিন্ত। সংসার পরিচালনায়, মেহমানদারিতে আমাকে কোনও দিন ভাবিতে হয় নাই। আমার স্ত্রী আমাকে ভাবিতে দেন নাই। টাকা নাই কোনও দিন বলেন নাই। আমারও তার এমনকি ছেলেদের (ততদিনে তিনি মনসুর আনাম ও মহবুব। আনাম এই দুই পুত্রের মা) কাপড়-চোপড়, জুতা-জামার ভাবনাও তিনি আমাকে ভাবিতে দেন নাই। কী কবে খাইব, কোন শেরওয়ানি-পাজামা-জুতা পরিয়া কোর্টে যাইব, তা-ও তিনিই আগে হইতে ঠিক করিয়া রাখিতেন। এটা ঘটিয়াছে অবশ্য সারাজীবনই। এটা বুঝিয়া ফেলিয়াছিলাম উকালতি জীবনের প্রথম দশ বছরেই। শুধু ব্যক্তিগতভাবে আমি নই, আমার সারা সংসার জীবনই তাঁর মুঠায়। আমার সংসারে তিনি নিজেও গলাতক ডুবিয়াছেন, তার প্রথম উপলব্ধি ঘটে আমার কৃষক-সম্পাদনার জন্য উকালতি ও ময়মনসিংহ ছাড়িয়া কলিকাতা যাওয়ার প্রাক্কালে। কলিকাতার প্রতি তার টান ছিল আগে হইতেই। কাজেই তিনি খুশিই হইলেন। কিন্তু অসুবিধাও দেখাইলেন। এই দশ বছরে তিনি সংসার কম গোছান নাই। এই ভাড়াটিয়া বাসায় তিনি গলাতক পুঁতিয়া গিয়াছেন। ইতিমধ্যে তিন ছেলের মা হইয়াছেন। বাড়িওয়ালাকে দিয়া বাড়ি কুশাদা করাইয়াছেন। ডাইনিং হল ও গেস্ট রুম করাইয়াছেন। তার উপযোগী টেবিল-চেয়ার-চৌকি-আলনা-মিটসেফ করিয়াছেন। প্রয়োজনমত লেপ-তোষক বাড়াইয়াছেন। গোসলের জন্য বাথরুম বানাইয়াছেন। বাড়ির মধ্যে ফুলের বাগান করিয়াছেন। উঠানের এক কোণে গোলাঘর করিয়াছেন। এতে তিনি চাউল-সরিষা ও কলাইর স্টক করেন। মওসুমের সময় সস্তা দামে কিনিয়া গোলাজাত করেন। বাজার চড়িলে বিক্রয় করিয়া লাভ করেন। এসব কাজে তিনি কোনও দিন আমার সাহায্য চান নাই। প্রজা-কর্মী বা মুহরী-মক্কেলদের সাহায্যে তিনি এ সব খরিদ-বিক্রি করিয়া থাকেন। নিজের খরচে হাঁস-মুরগি-কবুতরের ঘর বানাইয়াছেন, বাড়ির মধ্যে বেগুন, মরিচ, আলু, ডাটার ক্ষেত করিয়াছেন। লাউ-কুমড়া শসা-করল্লা-ঝিঙ্গার জাংলা করিয়াছেন। শাক-সবজি, তরি-তরকারি, মুরগ মুরগি তাঁর বাজার হইতে কিনিতে হয় না। বরঞ্চ চাকরকে দিয়া তিনি ঐ সব বিক্রি করিয়া থাকেন। এ সব সত্ত্বেও বাসার ভিতরে তিনি একটু ময়লা আবর্জনা হইতে দেন নাই। তিনি নিজ হাতে ঝটা-দা-কোদাল মারিয়া বাড়ির ভিতর ঝক-ঝকা রাখিতেন। দেওয়াল ঘেঁষিয়া ফুলের গাছ লাগাইয়াছেন। তার মাঝে-মাঝে লেবু-ডালিমের গাছ করিয়াছেন। এ সবই তিনি করিতেন আমার অজ্ঞাতে। কারণ বাসায় থাকিলে বৈঠকখানায় মক্কেল লইয়া বৈঠক করা, সারা দিন কোর্টে থাকা, সভা-সমিতি উপলক্ষে মফস্বলে বা কলিকাতায় কাটান, এত সব করিয়া আমি বেচারীর খোঁজখবর খুব কমই রাখিতাম। অবসর সময়ে এসবের জন্য যদি তার তারিফ করিতাম, তখন জবাব দিতেন : প্রশংসার আসল দাবিদার তার মা-আমার শাশুড়ি। কথাটা সত্য। তারই জন্য আমার স্ত্রীর পক্ষে রান্নাঘরের বাহিরে এতসব কাজ করা সম্ভব হইয়াছিল।
