আমার শ্বশুর মওলানা আকালুবী সাহেব নারী শিক্ষার খুব জোর সমর্থক ছিলেন। বহু ধনী শাগরিদ-মুরিদকে তিনি মেয়েদেরে উচ্চশিক্ষা দিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিলেন। কিন্তু নিজের মেয়েদের কাউকে তিনি উচ্চশিক্ষা দেন নাই। তৎকালে মেয়েদের উচ্চশিক্ষা খুব ব্যয়সাধ্য ছিল। মওলানা আকালুবী সাহেব গরীব মানুষ ছিলেন। কাজেই নিজের বাড়িতে বালিকাদের জন্য একটি স্কুল খুলেন। তাতে আরবি, ফারসি, বাংলা, অঙ্ক, ইতিহাস, ভূগোল ও সামান্য ইংরাজি পড়াইবার ব্যবস্থা ছিল। পাড়াগাঁয়ের মেয়েরাও সাধারণত কমপক্ষে বার বছরের বেশি কেউ অবিবাহিত থাকে না। এর পরেই হয় মেয়েদের বিবাহ হইয়া যায়, নয়-ত বিবাহের যোগ্য মেয়েকে বাপ-মারা পর্দায় বন্ধ করিয়া থাকেন। মওলানা সাহেবের পাঁচ মেয়ের সবারই লেখা-পড়া ঐ স্কুল পর্যন্ত। আমার স্ত্রীও ঐটুকু বিদ্বান হইয়াই আমার ঘর করিতে আসেন। পাড়াগাঁয়ের আমার বাপ-মার খেদমত করার জন্য এইটুকু বিদ্যাই যথেষ্টের চেয়ে বেশি হইল। কিন্তু আমি তাকে সাংবাদিকের সহধর্মিণী হিসাবে যখন কলিকাতা নিয়া গেলাম, তখন স্বভাবতই তার আর একটু লেখা-পড়া জানার দরকার হইল। আমার কিছু বলিতে হইল না। আমার শ্বশুর ও সম্বন্ধীই আমার স্ত্রীকে তা বুঝাইলেন। দ্বিতীয় বার দেখা হইবার সময়েই দেখিলাম, তাঁরা এঁকে কিছু-কিছু নূতন পুস্তক কিনিয়া দিয়াছেন। আমিও দিলাম। গোড়াতে আমার নিজের ও আমার স্ত্রীর সংকল্প ছিল যে তিনি প্রাইভেট ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিবেন এবং তদনুসারে কিছুদিন পড়াশোনাও চালাইলেন। কিন্তু দুই-এক বছরের মধ্যেই আপনা-আপনি তিনি লেখাপড়া ছাড়িয়া সংসারী হইয়া গেলেন এবং আমিও যেন তা বিনা প্রতিবাদে মানিয়া লইলাম।
কারণ তাঁর পনের বছর বয়স হইবার আগেই আমরা একটি পুত্র সন্তান লাভ করিলাম এবং আর দুই বছর পরে আরেকটি পুত্র সন্তান লাভ করিলাম। এটা খুবই নিষ্ঠুরতা হইয়াছিল। সতের বছর বয়সের নারী দুইটি সন্তানের মা হওয়া কোনও নারীর স্বাস্থ্যের পক্ষেই শুভ হইতে পারে না।
.
৩. কচি ঘাড়ে ভারী বোঝা
বিয়ার তিন বছর পরেই আমি উকালতি শুরু করিলাম। কলিকাতা ছাড়িয়া ময়মনসিংহ শহরে আসিলাম। নূতন উকিলের পক্ষে পেটে-ভাতের আয়ের বেশি কিছু করা সম্ভব ছিল না। তবু আমি দুই সন্তানের মা সতের বছরের বয়সের বালিকাকে শহরে আনিয়া আমার অভাবের সংসারের দায়িত্ব তার উপর চাপাইয়া দেই। এর আগে কলিকাতার জীবনে তাকে বিশেষ কোনও দায়িত্ব বহন করিতে হয় নাই। আমরা দুজনের জন্য একবেলা ডাল-তরকারি রাধিয়া দুই বেলা শুধু এক পোয়া চাউল সিদ্ধ করিলেই রান্না-বান্নার কাজ শেষ। কয়লার চুলাটাও তার নিজের ধরাইতে হইত না। প্রতিবেশী বন্ধু আমাদের বাজারটাও করিয়া দিতেন। তার চাকরটা আমাদের বালতির চুলাটাও ধরাইয়া দিত। কাজেই কলিকাতায় সপরিবারে বাস করা সত্ত্বেও আমি না শিখিয়াছি বাজার করিতে; আমার স্ত্রী না শিখিয়াছেন কয়লার চুলা ধরাইতে। কাজেই আমরা উভয়েই শুরু করিলাম ইংরাজিতে যাকে বলে ফ্রম দি ক্র্যাচ। আঁচড় হইতে।
কথায় বলে ‘আম ছোট হইলে কী হইবে আঁটি বড় আছে’; আমারও আয়। কম ও বাবুর্চি নাবালিকা হইলে কী হইবে, আমার বাসায় মেহমানের জোর ছিল। এই সময় প্রতিমাসে আমার বাসায় চার মণ চাউল খরচ হইত। তার। মানে প্রতিবেলা গড়ে পনের-বিশ জন লোক খানা খাইতাম। এত লোক হইবার প্রধান কারণ এই যে আমি স্থানীয় লোক। আত্মীয়-স্বজন অন্য কাজেই শহরে আসুন, আর মামলা-মোকদ্দমা করিতেই আসুন, আমাকে দিয়াই মামলা করান, আর অপর উকিলকে দিয়াই মামলা করান, আমার বাসায় চারটা ডাল ভাত না খাইয়া গেলে আমি অসন্তুষ্ট হইতে পারি, এ সম্পর্কে আত্মীয়-স্বজনরা সর্বদাই সচেতন ছিলেন। মেহমান বেশি হওয়ার দ্বিতীয় কারণ প্রজা আন্দোলনের নেতা ও প্রজা-সমিতির সেক্রেটারি হিসাবে সমিতির আফিসের লোকদের খাওয়ার ব্যবস্থাটা আমারই দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া মফস্বল হইতে নেতৃস্থানীয় কর্মীরা আসিলে তাঁদেরে সম্মান করা ও তাদের থাকা-খাওয়ার সুবিধার দিকে নজর রাখাও আমারই কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া আমার বৈঠকখানায় সমাগত ভদ্রলোকদের চা খাওয়ানোর রেওয়াজ ছিল। আমার রাজনৈতিক গুরু মৌলবী মুজিবর রহমান সাহেবের নিকট আমি এটা শিখিয়াছিলাম। তিনি সকলকে উপদেশ দিয়াছিলেন, যদি তোমরা নূতন কোনও মতবাদ প্রচার করিতে চাও, তবে নিজের বৈঠকখানাকে চায়ের আড্ডায় পরিণত কর। এই ধরনের চায়ের বৈঠকেই দুনিয়ার সমস্ত নূতন মতবাদ দানা বাঁধিয়াছে। মৌলবী সাহেবের এই উপদেশ আমি সাধ্যমত মানিয়া চলিতাম। ফলে বাসায় খাবার ব্যবস্থা যেমন থাকুক, চায়ের ব্যবস্থা থাকিতই। এ সবে যে খরচ খুব বেশি হইত তা নয়। কারণ চা তখন আট দশ আনা পাউন্ড। দুধ তখন টাকায় ষোল সের; চিনি পাঁচ আনা সের। ছয় পয়সা করিয়া তশতরিসহ চায়ের কাপ পাওয়া যাইত। সুতরাং ডজনে-ডজনে চায়ের কাপ কিনিতেও খুব কষ্ট হইত না। কিন্তু কষ্ট হইত আমার স্ত্রীর। একটি মাত্র চাকর লইয়া তিনি এতলোকের জন্য রান্না-বান্না ও চা তৈরি করিতেন। তা ছাড়া আমার মেহমানদারির কোনও ওয়াকত-বেওয়াকত ছিল না। মফস্বলে মিটিং করিতে গিয়া হয়ত রাত একটার সময় তিন-চারজন মেহমান লইয়া বাসায় ফিরিলাম। স্ত্রীকে জানাইলাম আমার নিজের অবশ্য ক্ষিধা নাই, না খাইলেও চলে। কিন্তু মেহমানদের ত আর ভুকা রাখা যায় না। কাজেই আর কিছু না হউক, কয়টা আলু, বেগুন বা শিম ভর্তা ও কয়টা আন্ডা ভাজা করিলেই চলিবে, আর কয় ছটাক চাউল সিদ্ধ করা, এই ত? আর কিছু করার দরকার নাই। সদ্য ঘুম-ভাঙ্গা এই বালিকা আমার এই ভণ্ডামিতে রাগ করিতে পারিতেন। তার বদলে একটু হাসিয়া পাক ঘরে ঢুকিলেন। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে মেহমানসহ আমাকে খাওয়াইয়া দিতেন। এমনি ঘটিত প্রায়ই।
