আমাদের বেলা এত দীর্ঘ সময় লাগিবার কোনও হেতু বা কারণ নাই। রাষ্ট্রীয় সত্তার সঙ্গে আমরা ধর্ম-সমাজ-কৃষ্টি-ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সকল ব্যাপার ও স্তরে আমরা স্বতন্ত্র। ভাষিক-সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র ছাড়া বাংলাদেশ তার রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা রক্ষা করিতে পারিবে। এই কারণেই মার্কিন পক্ষের আমার ভাষাবাদের উৎস। মার্কিনীদের জাতীয় ভাষা সাহিত্য বিকাশে নোআ ওয়েবস্টারের আমেরিকান ইংলিশ ডিকশনারি যে অবদান রাখিয়াছিল, বাংলাদেশের ভাষা-সাহিত্য বিকাশে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ-সম্পাদিত পূর্ব পাকিস্তানি আঞ্চলিক ভাষার অভিধান-এর অবদান হইবে ঠিক তাই। ১৯৬৫ সালে ড. শহীদুল্লাহ ঐ অভিধান বাহির করিয়াছিলেন বলিয়া কেউ নিরাশ হইবেন না। মনে রাখিবেন, ওয়েবস্টার তার অভিধান বাহির করিয়া ছিলেন ১৮২৮ সালে। আর আমেরিকার ভাষার সাহিত্যের মার্কিনী রূপায়ণ চুড়ান্ত হইয়াছিল একশ বছর পরে বিশ শতকের ত্রিশের দশকে।
ষষ্ঠ খণ্ড
সাংবাদিক জীবন
অধ্যায় সতের – সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি
১. এক ঢিলে দুই পাখি
সাংবাদিক হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমার ছেলেবেলা ছিল না। যেটা ছিল, সেটা সাহিত্যিক হওয়ার সাধ। আসলে সাহিত্যিক-সাংবাদিক যে দুইটা আলাদা বস্তু, সে জ্ঞানই তখন আমার ছিল না। সাহিত্যিক যারা তারাই খবরের কাগজও চালান, এটাই ছিল আমার ধারণা। সাহিত্যিক হওয়ার চেষ্টা ত আমি করিতেছিই। খ্যাতনামা লেখকদের বই-পুস্তক পড়িতেছি। নিজে কবিতা, প্রবন্ধ ও গল্প লিখিতেছি। আর খবরের কাগজ শুধু পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ। খবরের কাগজ বাহির করার জ্ঞান ছাপার কৌশল দেখা পর্যন্ত। স্কুল-জীবনে ময়মনসিংহ শহর হইতে প্রকাশিত একমাত্র সাপ্তাহিক চারু-মিহির ছাপা হইতে দেখিয়াছি। বিস্মিত হইয়াছি। কিন্তু আকৃষ্ট হই নাই। কারণ লেখা সম্পাদনের কাজটা কারা করেন, কোথায় করেন, তা দেখার সৌভাগ্য হয় নাই। সাংবাদিক হওয়ার সাধ জন্মানোর জন্য ঐটুকু অভিজ্ঞতা যথেষ্ট নয়। তার উপর, ঐ সময় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বিবিধ প্রবন্ধে’, নবীন লেখকদের প্রতি উপদেশ’ পড়িয়াছিলাম। তাতে তিনি নবীন লেখকদের উপদেশ দিয়াছেন : ‘যদি প্রকৃত সাহিত্যিক হইতে চাও, তবে সাময়িক পত্রিকায় লিখিও না। সাহিত্যিক হওয়ার বাসনাটা প্রবল থাকায় বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশটা মানিয়া চলার একটা অস্পষ্ট সংকল্প আমার নিশ্চয়ই হইয়াছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের ঐ উপদেশাবলিতে আরো একটা উপদেশ ছিল এই : যা লিখিবে তাই ছাপাইবার জন্য ব্যস্ত হইও না। তার এ উপদেশটা মানিতে পারি নাই। আল এসলাম নামক মাসিকে প্রবন্ধ ও সওগাত-এ গল্প লিখিতে শুরু করি। বঙ্গ দর্শন-এর সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্র নিশ্চয়ই মাসিক কাগজকে সাময়িক পত্রিকা বলেন নাই। তিনি সাপ্তাহিক দৈনিক খবরের কাগজই মিন করিয়াছেন। কাজেই বঙ্কিমচন্দ্রের উপদেশ অমান্য করার দরকার হইল না।
কিন্তু শিক্ষাজীবন শেষ করিয়াই বুঝিলাম, রোযগারের জন্য চাকরি করিতেই হইবে। রোযগারের জন্য চাকরি ও সাহিত্য সেবার মত এক ঢিলে দুই পাখি মারা যায় শুধু খবরের কাগজেই। খবরের কাগজের কেন্দ্র কলিকাতা। কাজেই একদিন এই উদ্দেশ্যে কলিকাতা গেলাম।
.
২. ‘ছোলতান’
আমার সাংবাদিক জীবন শুরু হয় ১৯২৩ সালে। আবুল কালাম শামসুদ্দীন। তখন মুসলিম জগত নামক সাপ্তাহিকের সম্পাদক। খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ সাহেবের ছোট ভাই মখদুমী লাইব্রেরির পরিচালক মো. মোবারক আলী সাহেব। (পরে খান বাহাদুর) এই কাগজের মালিক। আমি একটা কিছু চাকরি জোগাড়ের মতলবেই কলিকাতা গিয়াছিলাম। সাংবাদিকতার দাবি সবার আগে। চা-নাশতা হইতে খাওয়া-থাকা সবই শামসুদ্দীনের ঘাড়ে। কাজেই তার সম্পাদকতায় যথাসাধ্য সাহায্য করা কর্তব্য মনে করিলাম। এই কর্তব্যই শেষ পর্যন্ত সুযোগে পরিণত হইল। আস্তে আস্তে ছোট-ছোট সম্পাদকীয় মন্তব্য হইতে বড় প্রবন্ধ লিখিতে শুরু করিলাম। এরই মধ্যে ছহি বড় তৈয়ব নামা নামে পুঁথির ভাষায় একটি রাজনৈতিক প্যারডি স্যাটারার ও সভ্যতায় দ্বৈতশাসন’ নামক একটি দীর্ঘ দার্শনিক রাজনৈতিক প্রবন্ধ লিখি। তাতে মুসলিম সাংবাদিকদের নজরে পড়ি। কতকটা এই কারণে, কতকটা আবুল কালামের চেষ্টায় আমি ত্রিশ টাকা বেতনে মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী সাহেবের ছোলতান-এ সহ সম্পাদকের চাকুরি পাই।
ছোলতান-এ আমি প্রায় দেড় বছর কাজ করি। মাওলানা ইসলামাবাদী সাহেবের স্নেহ ও প্রশংসা অর্জন করি। তিনি আমার বেতন ত্রিশ টাকা হইতে চল্লিশ টাকা করিয়া দেন এবং বলেন সাধ্য থাকিলে আরো বেশি দিতেন। ছোলতান-এ কিছু দিন কাজ করিয়াই জানিতে পারি, মৌ. ইসমাইল হোসেন সিরাজী সাহেবও ছোলতান-এর একজন মালিক। তাঁর সাথেও পরিচয় হয়। তিনি আমার লেখার উদ্দীপনা ও ভাষার তেজস্বিতার বহুৎ প্রশংসা করেন। মওলানা সাহেব কিন্তু আমার লেখার তেজস্বিতার চেয়ে যুক্তিবত্তা ও বিষয়বস্তুর প্রশংসা করেন বেশি। যা হোক দুই মুনিবের মন রাখার চেষ্টায় আমার ভালই হইল। আমার লেখায় ওজস্বিতা ও যুক্তিপূর্ণতা সমানভাবে উন্নতি লাভ করিল। আমি মওলানা সাহেবের স্নেহ ও আস্থাভাজন হইয়া বেশ সুখেই দেড় বছর ছোলতান-এ কাটাইলাম। ১৯২৪ সালের জুন-জুলাই মাসে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের নেতৃত্ব ও মওলানা আকরম খাঁ সাহেবের সভাপতিত্বে সিরাজগঞ্জে প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মিলনী হয়। এই কনফারেন্স উপলক্ষে আমি মওলানা আকরম খাঁ সাহেবেরও আস্থা অর্জন করি। তিনি ছোলতান-এ আমার লেখায় আগেই সন্তুষ্ট ছিলেন। কাজেই সিরাজগঞ্জ কনফারেন্সের পর পরই তিনি মওলানা ইসলামাবাদী সাহেবের নিকট চাহিয়া নিয়া আমাকে তার সাপ্তাহিক মোহাম্মদীতে চাকুরি দেন। চল্লিশ টাকার জায়গায় পঞ্চাশ টাকা বেতন পাইতেছি দেখিয়া মওলানা ইসলামাবাদী সাহেব সম্মতি দেন।
