.
৬. উপলব্ধির বাস্তবায়ন
কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। মার্কিন জাতির কৃষ্টিক-ভাষিক স্বকীয়তা লাভের আন্দোলন সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রচারমাধ্যম রেডিও-সিনেমায় হামলা চালাইল। হলিউডের সিনেমা পরিচালক-প্রযোজকরা ইংরাজি সিনেমার নাম বদলাইয়া মার্কিনী নাম রাখিলেন মুভি। মুভির এ্যাকটার-একট্ৰেসরা বিশুদ্ধ ইংরাজি উচ্চারণ করিবার জন্য বিলাত হইতে প্রশিক্ষক আমদানি করা ছাড়িয়া দিলেন। কলাম্বিয়া, ন্যাশনাল ও আমেরিকান নামক তিনটা ব্রডকাসটিং কোম্পানিই তাদের সংবাদপাঠক ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জন্য ওয়েস্ট এন্ড-অক্সনিয়ার ইংরাজি উচ্চারণ প্রশিক্ষণের বিশেষ স্কুলগুলি উঠাইয়া দিলেন। মার্কিনীরা মার্কিনী ইংরাজি মার্কিন উচ্চারণ-ভঙ্গিতেই বলিতে লাগিলেন। প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অর্থনৈতিক নিউডিলের উদ্দীপনা মার্কিন জাতিকে ভাষিক নিউডিলেও উদ্দীপিত করিয়া ফেলিল। ইংলন্ডের ভাষিক কায়েমি স্বার্থীরা, মানে শিক্ষক-লেখক ও পুস্তক-প্রকাশকরা, সবাই আগে হইতেই বিপদ গনিতেছিলেন। ১৯২৭ সালে এঁদের সমবেত উদ্যোগে লন্ডনে ইংরাজি ভাষা সাহিত্য সম্পর্কে একটি আন্তর্জাতিক সম্মিলনীর অধিবেশন করিলেন। প্রধানত মার্কিন সাহিত্যিকদের উৎসাহ-উদ্যোগেই এই সম্মিলনী হইয়াছিল। কারণ মার্কিন মুল্লুকের সাহিত্যিক সনাতনীরা খোদ ইংলন্ডের সাহিত্যিকদের চেয়েও বেশি ইংরাজিপ্রীতি দেখাইতেছিলেন। এটা স্বাভাবিকও। আমাদের দেশের বাঙ্গাল’ কবি-সাহিত্যিকদের পশ্চিম বাংলাভাষা প্রীতি পশ্চিম বাঙ্গালীদের চেয়েও বেশি। যা হোক লন্ডনের এই আন্তর্জাতিক সম্মিলনীতে এই মর্মে প্রস্তাব গৃহীত হয় যে, ইংরাজি ভাষার পবিত্র কুয়া অপবিত্রকরণের মার্কিনী (ডিফাইলিং পিওর অয়েল অব ইংলিশ বাই দি আমেরিকানস) অপচেষ্টা যে কোনও উপায়ে ঠেকাইতে হইবে। নিউ স্টেটসম্যান এ সম্পর্কে ১৯২৭ সালের ২৫ জুনের সম্পাদকীয়তে লিখিয়াছিল : আমরা আমাদের মাতৃভাষা ইংরাজি সম্পর্কে আমেরিকানদের সাথে আলোচনায় বসিব না? কারণ ইংরাজি ভাষাকে যারা প্রাণ দিয়া ভালবাসে, তাদের মোকাবিলা আমেরিকানরাই সর্বাপেক্ষা ঘোরতর শত্রু। ঐ প্রস্তাবের ব্যাখ্যা করিয়া বিখ্যাত ব্যঙ্গ পত্রিকা পাঞ্চ সম্পাদকীয় লেখেন : ইংরাজি ভাষায় কুয়া পবিত্র রাখিতে হইলে আমেরিকানরা যাতে ঐ কুয়ায় কাদা না ফেলিতে পারে তার বিধান করিতে হইবে। ইয়াংকিরা যে ভাষায় কথা বলে, তাকে শুধু কাদা-মাটি বলিলেও ঠিক হইবে না। তারা কথা ত বলে না, দস্তুরমত থুথু ফেলে। অতএব তাদের ভাষা আসলে শাব্দিক নিষ্ঠীবন মাত্র।’
এ সব স্পষ্টতই রাগের কথা; কটুক্তি ও গালাগালি। লোক রাগ করে যখন তাদের আর কোনও উপায় থাকে না। গাল দেয় যখন যুক্তি থাকে না। ১৭৭৬ সালে মার্কিনীদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ঠেকাইবার জন্য ইংলন্ড অস্ত্র ধরিয়াছিল। দেড়শ বছর পরে তাদের ভাষিক-সাহিত্যিক স্বাধীনতা ঠেকাইবার কাজে অস্ত্রের বদলে ইংরাজরা জিভ ও কলম ধরিয়াছিল। কিন্তু কৃষ্টিক-ভাষিক স্বকীয়তার বাসনা রাজনৈতিক স্বরাজের বাসনার চেয়ে কম শক্তিশালী নয়।
.
৭. জনগণের জয়
ইংরাজরা নাহক ভয় পাইয়াছিল। না বুঝিয়া যুদ্ধ করিয়াছিল। ভ্রান্ত ধারণায় মার্কিনীদের ভাষিক-কৃষ্টিক স্বকীয়তায় বাধা দিয়াছিল। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা লাভ করিয়াও মার্কিনীরা আজও ইংরাজের সাথে একই আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী হইয়াই আছে। ভাষিক-সাহিত্যিক স্বকীয়তা হাসিল করিয়াও আজও তারা ইংরাজি ভাষা গোষ্ঠীর সদস্যই আছে। মিসেস জারট্রডস্টেইনের ভাষায় মার্কিনবাসী ইংরাজি ভাষা ও তার হরফ কিছুই ছাড়ে নাই। শুধু ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্যে মার্কিনী শব্দ ও বাচনভঙ্গি আমদানি করিয়া ঐ সাহিত্যে মার্কিনী প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিয়াছে। তাই অতবড় বিশ্বশক্তি হইয়াও বৃটিশ সরকার প্রায় নিরস্ত্র মার্কিনীদেরে হারাইতে পারে নাই। ইংরাজি ভাষা ও সাহিত্য অতবড় বিশ্ব সাহিত্য হইয়াও কয়েদির বুলি’ ও অশালীন শাব্দিক নিষ্ঠীবন’কে ইংরাজি সাহিত্যের পবিত্র হেঁসেল হইতে দূরে রাখিতে পারে নাই। এইভাবে ভাষা সাহিত্যের লড়াই-এ শেকসপিয়ার-স্কট-মিলটনের উত্তরাধিকারী জন বুল ভাষা-সাহিত্যের ঐতিহ্যহীন ব্রাদার জনথনের কাছে হারিয়া গিয়াছিল। ইতিহাসের তাকিদেই তেমনি বঙ্কিম, মাইকেল-রবীন্দ্রের উত্তরাধিকারী ভদ্রলোকেরা ভাষা-ঐতিহ্যহীন’ বাঙ্গালদের কাছে একদিন হারিয়া যাইবেন। কারণ বাঙ্গালরা বাংলাভাষা ও হরফ ছাড়িতে চায় না। তারা বাংলা সাহিত্যে বাংলাদেশের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিতে চায় মাত্র।
উপরে আমেরিকাবাসীর ভাষিক স্বকীয়তার সংগ্রামের অতিসংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হইল। এতে পাঠক নিশ্চয়ই দেখিতেছেন, মার্কিনীদের ভাষিক স্বকীয়তার সংগ্রাম দীর্ঘস্থায়ী হইয়াছিল। দীর্ঘস্থায়ী হইয়াছিল এইজন্য যে সংগ্রামটা ছিল কঠিন। সংগ্রামটা কঠিন ছিল এই জন্য যে সংগ্রামের অভীষ্টটা জনগণের নিকট সুস্পষ্ট ছিল না। সুস্পষ্ট ছিল না এই জন্য যে মার্কিনী ও ইংরাজরা ধর্ম-সমাজ কৃষ্টি ও ঐতিহ্যে মূলত একই ছিল। এই দিক হইতে কৃষ্টি-সাহিত্যের ব্যাপারে মার্কিনীদের স্বাতন্ত্র-স্বকীয়তা অপরিহার্য ছিল না। এই অপরিহার্যতা সৃষ্টি হইয়াছিল তাদের রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে। মানুষের রাষ্ট্রনৈতিক প্রয়োজন বিষয়ী তাকিদ; সুতরাং মস্তিষ্কের ব্যাপার। পক্ষান্তরে সৃষ্টি-ঐতিহ্যের তাকিদটা তাদের আবেগের তাকিদ; সুতরাং হৃদয়ের ব্যাপার। কৃষ্টিক-ভাষিক সাহিত্যিক স্বকীয়তা ছাড়া রাষ্ট্রীয় আর্থিক স্বকীয়তার রক্ষা বিকাশ ও বিস্তৃতি অসম্ভব। এ সত্য উপলব্ধি করার পরই কেবল এটা তাদের আবেগের মানে হৃদয়ের ব্যাপারে উন্নত হইল। এটা ঘটিতেই তাদের সময় লাগিয়াছিল।
