*** *** ***
বাড়িতে কোন কাজের লোক ছিল না। বেশিরভাগ কাজ দুজন মিলেমিশে করে ফেলত। সকাল-সন্ধ্যায় এক বুড়ি ঠিকা-ঝি এসে টুকিটাকি কাজগুলো করে দিয়ে যেত। সবমিলিয়ে বেশ ভালোই সময় কাটছিল ওদের।
নিন্দুকেরা বলে,”কিন্তু ছেলেপুলে হলে কী করবে, বাছাধন?”
–আহাম্মক! ছেলেপুলে কখনো হবেই না!
স্বামী-স্ত্রী এভাবেই দিন গুজরান করছিলো। স্বামী সকালবেলা বাজারে গিয়ে সদাইপাতি করে, ঘরে ফিরে কফি বানায়। স্ত্রী ঘরদোর গোছগাছ করে রাখে। তারপর বেলা হলে যে-যার কাজে লেগে পড়ে। কাজ করতে-করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে নিজেদের মধ্যে খানিক গল্পগুজব করে নেয়। কোনও আজেবাজে বিষয় নিয়ে তারা কখনোই গল্প করে না; বরং, বেশ উচ্চমার্গীয় আলাপ চলে তাদের মধ্যে, একে-অন্যকে নানা উপদেশ দেয়। মাঝে হয়তো কিঞ্চিৎ হাসি বিনিময়। দুপুরে স্বামী গিয়ে চুলা জ্বালায়, স্ত্রী শাকসবজি কাটে। যেদিন গরুর গোশত থাকে, সেদিন স্বামী রান্না করে, আর স্ত্রী মুদি দোকানে গিয়ে টুকিটাকি জিনিস কিনে আনে। ঘরে ফিরে স্ত্রী খাবার টেবিল গোছায়, স্বামী খাবার পরিবেশন করে।
নিন্দুকেরা যা-ই বলুক, ওদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীসুলভ ভালোবাসাও কিন্তু আছে–রাত্রিবেলায় ওরা একে-অন্যকে ‘শুভরাত্রি জানিয়ে যে-যার রুমে চলে যায়! দরজায় তালা দেয়ার কোন বন্দোবস্ত নেই। ফলে, স্বামীকে মাঝে মাঝেই রাত্রিবেলায় স্ত্রীর রুমে যেতে দেখা যায়। তবে, খাটগুলো দুজন থাকার অনুপযুক্ত হওয়ায়, ভোরবেলায় স্বামীকে আবার তার নিজের রুমেই পাওয়া যায়! সকালে স্ত্রীর রুমের দরজায় স্বামীর মৃদু কড়াঘাত–“ওগো! শুভ সকাল। আজ কেমন লাগছে গো?”
–বেশ ভাল গো! তোমার কেমন লাগছে?
সকালে নাস্তার টেবিলে দেখলে মনে হয়, যেন আজই ওদের প্রথম দেখা হল!
সন্ধ্যাবেলায় সাধারণত ওরা বেড়াতে বের হয়। আশেপাশের মানুষজনের বাসায় যায়, গল্প করে। দুজনের বোঝাপড়াটা চমৎকার। একজন-অন্যজনের জন্য ছোটখাটো অনেক কিছুই ছাড় দেয়। যেমন, স্বামী যেদিকেই বেড়াতে নিয়ে যাক স্ত্রী তাতে সায় দেয়, সিগারেটের গন্ধ নিয়ে কোন অভিযোগ করে না। আবার, স্বামীও স্ত্রীর অনেক ছোটখাটো বদ অভ্যাসকে মেনে নেয়। এভাবে, সবার কাছে ওরা ‘আদর্শ দম্পতি’ বলে স্বীকৃত হল। এমন সোনায়-সোহাগা জুটি খুঁজে পাওয়া ভার! তবে, স্ত্রীর বাবা-মা কিন্তু এসব নিয়ে বেশ নাখোশ। তারা শহরের অদূরে গ্রামে থাকেন, মাঝে মাঝে মেয়েকে চিঠি লিখেন। চিঠিগুলোর বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে খানিকটা অশোভন বলেই মনে হয় তারা নাতি-নাতনীর মুখ দেখতে চান প্রতিটি চিঠিতেই তারা লুইসাকে মনে করিয়ে দেন, বিয়ে নামক সামাজিক প্রথাটি টিকে থাকে সন্তান জন্মদানের কারণেই; সন্তানের সুখই বাবা-মায়ের সুখ, সন্তানাদি না-থাকলে বাবা-মা কিছুতেই সুখী হতে পারেন না। কিন্তু লুইসার এতে ভীষণ আপত্তি। তার মতে, এসব ধ্যানধারণা এখন সেকেলে হয়ে গেছে। তবে মা-ও দমবার পাত্রী নন। তিনি উল্টো বলে বসেন, “তোমাদের নতুন ধ্যানধারণাতো বাপু মানব প্রজাতিটিকেই বিলুপ্ত করে দেবে!” এসব কথায় লুইসার বিশেষ কোন ভাবান্তর হয় না। সে এগুলোকে পাত্তাই দেয় না। সে আর তার স্বামী সুখে আছে, এই প্রথম জগৎ কোন সুখী দম্পতি দেখল–এ নিয়ে জগতের তো হিংসা হবেই।
জীবন বয়ে চলে মসৃণভাবে। কেউ কারো প্রভু নয়, দাসও নয়; তারা সমান-সমান। সংসারের খরচাপাতি দুজনে সমানভাবে বহন করে। আজ হয়ত স্বামী বেশি রোজগার করল, তো কাল স্ত্রী বেশি করে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সংসার খরচে তাদের অবদান ঐ সমান-সমান।
*** *** ***
লুইসার জন্মদিন!
সকালবেলা ঠিকা-ঝি এসে এক হোড়া ফুল, আর নানান আঁকিবুকি করা নকশাদার একটা চিঠি হাতে দিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তুলল। চিঠিতে লেখা–
“আমার ভালোবাসার ফুলকুঁড়িকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। অনাবিল আনন্দের এই দিনটি প্রতি বছর বয়ে আনুক আরও বেশি প্রশান্তি। আশা করি, আমার ফুলকুঁড়ি তার আনাড়ি আঁকিয়েকে চমৎকার একটা ব্রেকফাস্টে সঙ্গ দিয়ে ধন্য করবে–এখনই।”
চিঠি পেয়ে খুশিতে ডগমগ হয়ে স্বামীর রুমের দরোজায় কড়া নাড়ল লুইসা।
–কাম ইন…
খাটের ওপর নাস্তা সাজিয়ে দুজন একসাথে নাস্তা করল। ঠিকা-ঝিকে আজ সারাদিনের জন্য বাসায় রেখে দিয়ে নিজেদের মত করে দিনটা কাটাবে ওরা। “আহ! কী চমৎকার একটা দিন!”
এভাবেই দুটি বছর কেটে গেল। তবে, ওদের দেখে কিন্তু তা বোঝার উপায় নেই। এই দু’বছরে ওদের সংসারে কখনোই সুখের কমতি হয়নি। কে বলেছে বিবাহিত জীবন সুখের হয় না? আগের প্রজন্মের সবাই ভুল কথা বলেছে! মনীষীদের বাণী সব বানোয়াট! ওদের বিয়েই হচ্ছে আসল বিয়ে।
*** *** ***
দু’বছরেরর মাথায় স্ত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। বারবার বমি করতে থাকল। তার ধারনা, হয় কোন খাবার, না-হয় কোন জিনিসপত্র থেকে জীবাণু সংক্রমণ হয়েছে। স্বামীও সায় দিল,”হ্যাঁ, হ্যাঁ জীবাণুই হবে।” কিন্তু তারপরেও কী যেন কী ঠিক নেই বলে মনে হচ্ছে। তাহলে কি ঠান্ডা লাগল? সর্দিগর্মি? নানান সন্দেহে স্বামী-স্ত্রীর দিনাতিপাত। এদিকে, স্ত্রীর পেটটা দিনদিন একটু-একটু ফুলে যাচ্ছে যেন মনে হচ্ছে! তবে কি? …
–তবে কি পেটে টিউমার হলো?
