এতক্ষণ হাঁ করে সব শুনছিলেন স্ত্রী। তাঁকে যে কিছু জিজ্ঞেস করা হয়েছে, তা বুঝতেই পারেননি। স্বামী দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করার পর কোনমতে শুধু বললেন, “বুঝতে পারছি না।”
“শুরুতে আমিও বুঝিনি। তবে এটুকু পরিষ্কার যে, আমার ভাগের টাকাটা দিয়ে দেবার পর আমি আর কোনভাবেই তোমার কাছে ঋণী থাকবো না। খুব ছোট্ট একটা ঘটনা খেয়াল কর–সবকিছুর মত কাজের লোকের খরচেও আমার ভাগ আছে, অথচ ওরা কিন্তু সারাদিন তোমার কাজই করে। তোমার তত্ত্ব মেনে নিয়ে, তুমি-আমি যদি সত্যিই সমান হই; কিংবা, যদি সত্যিই পুরুষ মানুষ সবকিছুতে বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকে, তাহলে কিন্তু এমন হবার কথা না। তোমার ঘরের কাজের প্রতি (সত্যিই যদি কিছু করে থাকো!) সম্মান দেখিয়েই বলছি তোমার তত্ত্ব অনুযায়ী, ঘরের কাজই যদি বেশি মূল্যবান হয়, তাহলে তোমার এটাও ভুলে যাওয়া উচিত হবে না, গৃহস্থালির খরচ বাবদ ৫০০ ডলারের বাইরেও হাত খরচ হিসেবে তুমি আরও ৫০০ ডলার পাচ্ছ; অথচ আমার কিন্তু হাত-খরচ বলতে কিছু নেই।”
এবার যেন স্ত্রীর চোয়াল ভেঙে পড়ল। অসহায়ভাবে বললেন, “আমি সত্যিই তোমার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।”
স্বামীও হাল ছাড়ার পাত্র নয়। এবার অন্যভাবে শুরু করলেন–“ঠিক আছে, ‘বোর্ডিং হাউস তত্ত্ব বাদ দেয়া যাক। তার চেয়ে বরং, ডেবিট ক্রেডিট পদ্ধতিতে হিসাব করি চল।” এবার আরও গুছিয়ে, রীতিমত ব্যাংক হিসাবের আদলে একটা হিসাবপত্র দাঁড় করালেন ব্ল্যাকউড সাহেব।
বরাবর
মিসেস ব্ল্যাকউড
বিষয় : মিসেস ব্ল্যাকউডকে ঘর-গৃহস্থালির খরচ বাবদ দেয়া অর্থের হিসাব
বাড়ি ভাড়া এবং আনুষঙ্গিক–১০০০ ডলার তাঁর
কাপড়চোপড়–৫০০ ডলার
তাঁর হাত-খরচ (নগদ প্রদান)–৫০০ ডলার
বাচ্চাদের খরচ–১২০০ ডলার
কাজের লোকের (যারা শুধু তাঁর কাজই করে) খরচ–৮৫০ ডলার
সর্বমোট–৪০৫০ ডলার
যার অর্ধেক অর্থ প্রদান করতে বাধ্য থাকবেন—
জনাব ব্ল্যাকউড, জাহাজ-জেটির কর্মচারী
……………………..
স্বাক্ষর
স্ত্রীর পক্ষে আর সহ্য করা সম্ভব হল না, “উফ! তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে বিলের হিসাব করছ, ছিঃ!”
–না না, শুধু স্ত্রীর খরচের হিসাবতো করছি না। স্ত্রীর কাছে নিজের পাওনার হিসাবও করছি।
ব্ল্যাকউডপত্নী এবারে বিলের কাগজগুলো খপ করে নিজের হাতে নিয়ে দুমড়ে-মুচড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। কোমরে হাত দিয়ে স্বামীর দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন–“তাহলে কি তোমার সন্তানদের লেখাপড়ার খরচও আমাকে দিতে হবে?”
“তাই-ই তো দেয়া উচিত। কিন্তু ঠিক আছে যাও, সন্তানদের পড়ালেখার পুরো খরচটা না-হয় আমিই দেব; তোমাকে এক পয়সাও দিতে হবে না। তবে মনে রেখ, এটা কিন্তু সমতা হল না। যাহোক, সন্তানদের পড়ালেখা আর কাজের লোকের খরচের টাকাটা আমার ভাগে নিলাম; তারপরও, তোমার কাছে আমার আরও কিছু পাওনা থেকে যায়। সেগুলো গুছিয়ে নিয়ে আরেকটা বিল তৈরি করে দেব?”
স্ত্রী আর কোন বিল চাইলেন না।
তিনি আর কখনোই কোন বিল চাননি।
পরিবর্তনের প্রচেষ্টায়
ব্যাপারটা তার মধ্যে বেশ ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। দীর্ঘদিন বিচার-বিশ্লেষণ করে আমাদের গল্পের নায়িকার মনে হয়েছে–মেয়েদের আসলে দেখাশোনা করে বড় করা হয় শুধুমাত্র তাদের ভবিষ্যৎ স্বামীদের গৃহপরিচারিকা হবার জন্য! তাই, এ-জাতীয় পরিস্থিতি এড়াতে সে এখন থেকেই একটা ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছে, যাতে যেকোন পরিস্থিতিতে নিজের পায়ে ভর করে থাকা যায়। ব্যবসাটি ছোট হলেও চমৎকার–কৃত্রিম ফুল বানিয়ে বিক্রি করা। এর যাবতীয় যোগাড়যন্ত্র সে নিজেই করে।
অন্যদিকে, আমাদের নায়কও একটা বিষয় নিয়ে বেশ হতাশ। সে লক্ষ করেছে, মেয়েরা অপেক্ষাই করে থাকে যেন স্বামীর হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা যায়। এই-নিয়ে তার আক্ষেপেরও শেষ নেই। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন মেয়েকে বিয়ে করবে যে নিজে রোজগার করে, যে স্বাধীনচেতা, আত্মমর্যাদায় বিশ্বাসী। এমন কোন মেয়েকেই সে গ্রহণ করবে জীবনসঙ্গী হিসেবে, গৃহপরিচারিকা হিসেবে নয়। অতএব, দুজনের সাক্ষাৎ হওয়াটা বোধহয় ভাগ্যই ঠিক করে রেখেছিল।
এবারে চলুন বিস্তারিত জানা যাক–আমাদের নায়ক পেশায় একজন চিত্রকর, আর নায়িকার কথাতো আগেই বলেছি। এ বিপ্লবী চিন্তাভাবনা করার সময়টা তারা দুজনেই প্যারিসে থাকতো। অর্থাৎ, একই শহরনিবাসী। শীঘ্রই ভাগ্য তাদের সাক্ষাৎ ঘটালো, এবং পরিচয় থেকে পরিণয়ে গড়াতে খুব বেশি সময় লাগলো না। তবে, তাদের বিয়ে এবং বিয়ে-পরবর্তী জীবন বেশ ভিন্নরকম হল–তিন রুমের একটা ঘর ভাড়া নিয়ে মাঝের রুমটা ঠিক। করা হল স্টুডিও হিসেবে। ডানদিকে স্বামী, আর বামদিকে স্ত্রীর রুম। অর্থাৎ, স্বামী-স্ত্রীর এক-রুমে, এক-খাটে থাকার রীতিকে ঝেটিয়ে বিদায়। করা হল–“উহ! জগতে এমন জঘন্য রীতি বোধহয় আর দ্বিতীয়টি নেই! এই একসাথে থাকার রীতি থেকেই দুনিয়ার যত পাপাচার, যত দুষ্কর্মের শুরু!” স্বামী-স্ত্রী পৃথক রুমে থাকায় আরেকটা বিশ্রী ব্যাপারের অবসান
হলো–একই রুমে জামা-কাপড় পরা কিংবা খোলার সমস্যা আর রইল না। এসব ব্যাপারে দুজনেরই অভিন্ন মত–“স্বামী-স্ত্রীর পৃথক রুম থাকাই ভালো। যার-যার মত স্বাধীনভাবে থাকা যায়। বিশেষ দরকারে দেখা করার জন্য নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে স্টুডিওতো আছেই!”
