তিনি যখন মনে করতেন, কোনো কাজ সাম্রাজ্যের স্বার্থ পূরণ করবে তখন আওরঙ্গজেব এমনকি আগে অনুমোদিত ইসলামি নীতিমালার সাথেও আপস করতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৭০০ সালে মারাঠা শক্ত ঘাঁটি সাতারা দুর্গ অবরোধের সময় মোগল সৈন্যরা ৯ হিন্দু ও চার মুসলিমকে আটক করে। আওরঙ্গজেবের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রণীত আইনি গ্রন্থ ফতোয়া-ই-আলমগিরি অনুযায়ী এক মোগল বিচারক চার মুসলিমকে তিন বছর করে কারাদণ্ড ও ইসলাম গ্রহণ করার শর্তে হিন্দুদেরকে মুক্তির রায় দেন। এই সাজা ছিল বেশ নমনীয়। এতে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ায় আওরঙ্গজেব ওই বিচারককে ‘অন্যভাবে রায় দিতে বলেন, যাতে রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া না হয়।’ সূর্যোদয়ের আগেই বিদ্রোহী সবার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
—
ইসলামের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ তথা আলেম সমাজ আওরঙ্গজেবের প্রয়োজন অনুযায়ী ধর্মীয় বিবেকজনিত দ্বিধা ত্যাগ করার আগ্রহের ব্যাপার নিয়ে অন্ধ হয়ে থাকেনি পূর্ববর্তী মোগল শাসকদের মতো আওরঙ্গজেবও তার পুরো রাজত্বকালে আলেমদের, বিশেষ করে কাজি হিসেবে তাদের ভূমিকার সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়েছেন। সিংহাসন দখল করেই তিনি প্রধান কাজি হিসেবে আবদুল ওয়াহাবের নাম ঘোষণা করেন। এর কারণ হলো, তার পূর্ববর্তী প্রধান কাজি পিতাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আওরঙ্গজেবের পাপ এড়িয়ে যাননি। কয়েক দশক পর আবদুল ওয়াহাবের ছেলে (তিনিও ছিলেন কাজি) শায়খুল ইসলামের সাথে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। এই কাজি ইসলামি দেশ বিজাপুর ও গোলকুন্ডা দখল ও অনেক মুসলিমকে হত্যার বিষয়টি অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। শায়খুল ইসলাম অল্প সময়ের মধ্যেই পদত্যাগ করে হজে চলে যান। রাজকীয় নিয়মের সাথে সামঞ্জস্য নিয়ে চলতে অস্বীকৃতিকারী ব্যক্তিকে অপসারণ করার জন্য এটি ছিল মোগলদের দীর্ঘ দিন ধরে অনুসরণ করা ব্যবস্থা।
আকবরের আমল থেকেই মোগল শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বিধানে অন্যতম উপাদান ছিল আলেম সমাজ। আকবর এই সম্প্রদায়ের অধিকতর কঠোর সদস্যদের বিদ্রূপ করতেন, কয়েকজন সোচ্চার ব্যক্তিকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন। আকবরের অনুকরণে আওরঙ্গজেবও তার সিংহাসন আরোহণের বিরোধিতাকারী শাহ জাহানের প্রধান কাজির মতো আলেম সমাজের সমস্যা সৃষ্টিকারী সদস্যদের অসন্তুষ্ট করার ঊর্ধ্বে ছিলেন না। তবে সম্ভব হলে আলেমদের প্রশান্ত রাখার জন্য আওরঙ্গজেব তাদের সাথে নমনীয় আচরণ করতেন, বিশেষ করে তাদের জন্য আয়ের ব্যবস্থা করে দিতেন ।
আওরঙ্গজেব ফতোয়া-ই-আলমগিরি লেখার জন্য অনেক জ্ঞানী মুসলিমকে অর্থ প্রদান করেছিলেন। ১৬৬৭ থেকে ১৬৭৯ সালের সময়কালে এটি রচনা করা হয়েছিল। আওরঙ্গজেবের আমলে আলেমরা জনসাধারণের নৈতিক চরিত্র সংশোধনের দায়িত্বেও ছিলেন, জিজিয়ার কর তারাই আদায় করতেন । ১৬৭৯ সালের শুরুতে আওরঙ্গজেব তার সাম্রাজ্যে সামরিক সেবা না দেওয়ার বিপরীতে জিজিয়া কর আরোপ করেন। রাজপুত ও মারাঠা রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, ব্রাহ্মণ ধর্মীয় নেতাদের এই কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সাধারণ জৈন, শিখ ও অন্যান্য অমুসলিমের জন্য তা প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়। জিজিয়া কর মোগল সাম্রাজ্যে প্রায় ১০০ বছর বাতিল ছিল। আওরঙ্গজেবের এটি পুনঃজীবিত করার একটি কারণ ছিল এর সংগ্রহের দায়িত্বে আলেমদের নিয়োজিত করার জন্য। তাত্ত্বিকভাবে জিজিয়ার ফলে আলেমদের মধ্যে বিশেষ করে যারা যথার্থ ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে মোগল সাম্রাজ্যকে চিহ্নিত করে সম্রাটদের ধর্মীয় আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহে ভুগতেন তাদের মধ্যে আওরঙ্গজেবের খ্যাতি বাড়াতেও সহায়ক হয়েছিল।
আওরঙ্গজেবের অনেক অভিজাত (এদের মধ্যে ছিলেন অনেক প্রখ্যাত মুসলিম ও রাজপরিবারের সদস্য, যেমন আওরঙ্গজেবের বড় বোন জাহানারা ) দুর্বল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে জিজিয়া নিয়ে তীব্র বিদ্রূপ করেছিলেন। এই কর অনেক হিন্দুকেও কষ্ট দেয়। আওরঙ্গজেবকে লেখা এক কঠোর সমালোচনামূলক পত্রে (এটি হয় শিবাজি কিংবা ১৬৫২-১৬৮২ সাল পর্যন্ত মেবার শাসনকারী রাজপুত শাসক রানা রাজ সিং লিখেছিলেন) জিজিয়াকে ফালতু হিসেবে অভিহিত করেছিলেন এই যুক্তিতে যে এটি আকবরের আমল থেকে মোগল নীতির ভিত্তি হিসেবে বিরাজমান সুলেহ কুল (সবার জন্য শান্তি) ধারণার পরিপন্থী।
বাস্তবে, জিজিয়া পুনঃবহাল শক্তিশালী আলেমদের ওপর আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায়নি। সমসাময়িক অনেক ঘটনায় জিজিয়া সংগ্রহে অনিয়মের চিত্র পাওয়া যায়। সংগৃহীত অর্থের একটি বড় অংশই লোভী সংগ্রহকারীদের পকেট থেকে বের হয়নি। এ ধরনের চুরি বন্ধ করতে অক্ষম ছিলেন আওরঙ্গজেব।
নৈতিক তদারকি
রাজা হলেন গরিবের রাখাল, এমনকি যদি তিনি তার মহিমা দিয়ে তাদের ভীতও করেন।
রাখালের জন্য ভেড়া থাকে না। ভেড়ার সেবা করার জন্যই রাখালের অস্তিত্ব থাকে ।
–সাদি, গুলিস্তাঁ
আওরঙ্গজেবের তার আদর্শের সাথে আপস করতে ইচ্ছুক থাকলেও বাদশাহ তার প্রজাদের প্রতি পিতৃমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গির বাধ্যবাধকতাকে সমর্থন করতেন । তিনি মনে করতেন যে তার সাম্রাজ্যে বসবাসকারী সবার কেবল দৈহিকই নয়, তাদের নৈতিক কল্যাণের দায়িত্বও তার। সে অনুযায়ী তিনি তার সাম্রাজ্যে বসবাসকারীদের নৈতিক জীবনযাপন করতে তাদেরকে উৎসাহিত, এবং এমনকি জবরদস্তিও করতেন ।
