আওরঙ্গজেব নিজেকে নীতিপরায়ণ নেতা হিসেবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে ন্যায়বিচার ও নৈতিকতাবিষয়ক ইসলামি আদর্শ সামনে আনতেন। তার পিতৃসুলভ প্রবণতা গড়ে ওঠেছিল সাদির গুলিস্তাঁর (গোলাপ উদ্যান) মতো ফারসি নীতিবাদী গ্রন্থাবলীতে পাওয়া রাজাদের দুঃখদায়ক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। এসব সতর্ক রাজা শাসন করতেন ভালোই, তবে ধারণা করা হতো, তাদের বেশির ভাগই ছিলেন সবচেয়ে পাপাচারপূর্ণ স্বৈরাচার। উল্লেখ্য, আওরঙ্গজেব হিন্দু ও মুসলিম সবারই কার্যক্রমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সব প্রজার জন্য একই ধরনের আচরণবিধি প্রণয়ন করেছিলেন। কিছু ঘটনায় দেখা যায়, তিনি একটি ধর্মীয় গ্রুপের নির্দিষ্ট ইস্যুগুলোর সমাধান করছেন, যদিও তিনি কার্যত সবার জন্য প্রযোজ্য নীতিই তাতে প্রয়োগ করছেন।
মোগল ভারতে বসবাসকারীদের মধ্যে নীতিপরায়ণতা প্রচারের জন্য আওরঙ্গজেব যেসব সবচেয়ে সাধারণ ধরনের রাষ্ট্রীয় নীতি প্রয়োগ করেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল নানা নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ! আওরঙ্গজেব তার রাজত্বের বিভিন্ন পর্যায়ে অ্যালকোহল, আফিম, পতিতাবৃত্তি, জুয়া, উস্কানি সৃষ্টিকারী ধর্মীয় লেখালেখি, ধর্মীয় উৎসব সার্বজনীনভাবে উদযাপনসহ বিভিন্ন পাপাচার সীমিত বা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। মুহতাসিবদের (সেন্সর) দায়িত্ব ছিল নৈতিক বিধিমালা প্রয়োগ করা, প্রতিটি নগরীতে আলেমদের অনেকে এই কাজে নিয়োজিত ছিলেন। এ ধরনের বিধিনিষেধের যৌক্তিকতা ও লক্ষ্য ছিল অভিন্ন : জনসাধারণ ও ব্যক্তির জীবনবিধান। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট মৌলিক উদ্বেগগুলোও অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্দীপনা সৃষ্টি করত। এগুলোই তাত্ত্বিকভাবে নীতিপরায়ণ ও নিরাপদ রাজ্য হিসেবে মোগল ভারতকে তৈরীতে হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। আওরঙ্গজেব দৃঢ়ভাবে এই মনোভাব পোষণ করতেন যে নৈতিকতা হলো রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও শাসিতদের কল্যাণ সুরক্ষিত রাখার শাসকের বৃহত্তর কর্তব্যের আওতাভুক্ত বিষয়।
—
আওরঙ্গজেব তার পুরো সাম্রাজ্যে অ্যালকোহল পান হ্রাস করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তার আমলে যেসব উল্লেখযোগ্য নীতি ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে, তার মধ্যে এটি একটি। অ্যালকোহলকে ব্যাপকভাবে অনৈস্লামিক হিসেবে নিন্দা করা হতো, মোগল সম্রাটেরা অ্যালকোহল পানে নিরুৎসাহিত করার জন্য ধর্মীয় নীতির আলোকে সোচ্চার ছিলেন। উদাহরণ হিসেবে জৈন সন্ন্যাসী শান্তিচন্দ্রের কথা বলা যায়। তিনি ১৫৯০ সালের দিকে আকবরের ‘অ্যালকোহল নিষিদ্ধ করা’ নিয়ে আলোচনা করে বলেছিলেন যে ‘এটি সার্বজনীনভাবে নিষিদ্ধ হওয়া উচিত।’ জাহাঙ্গীরও অ্যালকোহল নিষিদ্ধ করেছিলেন (যদিও তিনি ছিলেন পুরো মাত্রায় মদ্যপ)। এই নিষেধাজ্ঞা বারবার আরোপ করায় মনে হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা ছিল অকার্যকর।
বিফল হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও আওরঙ্গজেব তার পূর্বপুরুষদের অনুকরণ করে মদ ও তাড়ি বিক্রি সীমিত করার চেষ্টা করেন। ফরাসি পর্যটক ফ্রাসোয়া বার্নিয়ারের সাক্ষ্য অনুযায়ী মদ ছিল ‘জেন্টিল ও মোহামেতান [হিন্দু ও মুসলিম] উভয় আইনেই নিষিদ্ধ,’ এবং দিল্লিতে তা সহজলভ্য ছিল না। তবে সাধারণভাবে, আওরঙ্গজেবের ভারতবর্ষে অ্যালকোহল গলধঃকরণ ছিল ব্যাপক অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকে আওরঙ্গজেবের দরবারে ইংরেজ রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম নরিস সাক্ষ্য দিয়েছেন, আসাদ খান (১৬৭৬ থেকে ১৭০৭ সময়কালে প্রধান উজিড়) ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তার কাছে ‘কড়া মদের চেয়ে প্রিয় আর কিছু নেই এবং হাতের কাছে পেলে তারা প্রতিদিন তা পান করেন। সে অনুযায়ী, আসাদ খানের কাছে কিছু মদ ও পছন্দের পানপাত্র (যা দিয়ে কড়া পানি’ গলধঃকরণ করা যাবে) পাঠিয়ে তাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন ।
আওরঙ্গজেব ব্যক্তিগতভাবে অ্যালকোহল পান করতে অস্বীকৃতি জানালেও তিনি জানতেন, তার কর্মকর্তাদের মধ্যে খুব কম লোকই তার উদাহরণ অনুসরণ করেন। গালগল্প ও অতিরঞ্জনের প্রকট দুর্বলতাসম্পন্ন নিকোলি মানুচি লিখেছেন যে আওরঙ্গজেব একবার উত্তেজিতভাবে অভিমত প্রকাশ করেন যে হিন্দুস্তানে মাত্র দুজন মদ পান করেন না। এদের একজন হলেন তিনি ও অন্যজন হলেন প্রধান কাজি আবদুল ওয়াহাব। তবে মানুচি গোপনীয়তা ফাঁস করে তার পাঠকদের জানিয়েছেন : ‘কিন্তু আবদুল ওয়াহাবের ব্যাপারে [আওরঙ্গজেব] ভুল ছিলেন। কারণ আমি তাকে প্রতিদিন এক বোতল করে স্পিরিট (ভিনো) পাঠাতাম। তিনি তা পান করতেন গোপনে, যাতে সম্রাট তা বুঝতে না পারেন। ‘
আওরঙ্গজেবের জারি করা অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ছিল আফিম উৎপাদন ও ব্যবহারের হ্রাস করা । এগুলোও একই ধরনের ব্যর্থ পরিণতি বরণ করে।
—
আওরঙ্গজেব অনেক ধর্মীয় ছুটির সার্বজনীন উদযাপন সীমিত করেন। এসব বিধিনিষেধ সব ধর্মের লোকজনকেই প্রভাবিত করেছিল। কারণ আওঙ্গজেব তার সাম্রাজ্যের সব প্রধান ধর্মের উৎসব নিয়ন্ত্রিত করেছিলেন এবং আজকের দিনের অনেক ভারতীয়ের মতো তখনও ভারতীয়রা একের পবিত্র দিনগুলো অন্যরাও পালন করত।
আওরঙ্গজেব তার শাসনকালের অষ্টম বছরে ফারসি নববর্ষ নওরোজ, মুসলিমদের ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আজহা ‘বড় ধরনের জাঁকজমকভাবে পালনের’ ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন। একই সময় তিনি হিন্দুদের হলি ও দিওয়ালি এবং মুসলিমদের মোহররম উদযাপনের সাথে সম্পৃক্ত হইচই হ্রাস করার চেষ্টা করেন। আওরঙ্গজেবের এসব হুকুম জারি করার আংশিক কারণ ছিল এই যে তার কাছে হইচয়ের বাড়াবাড়ি বিতৃষ্ণাকর মনে হয়েছিল । জননিরাপত্তার বিষয়গুলোও সম্ভবত তার এই উদ্যোগ গ্রহণের পেছনে কাজ করেছিল।
