অন্য সব মোগল শাসকের মতোই আওরঙ্গজেব মুসলিম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, জীবনজুড়ে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ধর্মের অনুশীলন করেছেন। অনেক আগে মারা যাওয়া সম্রাটদের মনের ভাবনা সম্পর্কে জানা অসম্ভব। তবে তাদের কর্মের ওপর ভিত্তি করে মনে হতে পারে যে আওরঙ্গজেব তার পূর্বসূরিদের চেয়ে বেশি ধার্মিক ছিলেন। তিনি তার পূর্বপুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি নিয়মিত নামাজ পড়তেন। আর মদ্যপান ও আফিম থেকে বিরত ছিলেন। এই দুটি নেশায় মোগল পরিবারের অনেক পুরুষ সদস্য মারা গেছেন। ১৬৬০ এর দশকে আওরঙ্গজেব কোরআনে হাফেজ হন। শেষ বয়সে তিনি নামাজের টুপি সেলাই করতেন, নিজ হাতে পবিত্র কোরআনের অনুলিপি প্রস্তুত করতেন। এসব কাজ তিনি করতেন ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ।
তবে আওরঙ্গজেব ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনোভাবেই বিশুদ্ধবাদী ছিল না । বরং তিনি সারা জীবন প্রখ্যাত হিন্দু ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সাথে পরামর্শ করেছিলেন, যেমনটি করেছিলেন তার পূর্বসূরি মোগল সম্রাটেরা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৮০-এর দশকে আওরঙ্গজেব বৈরাগী হিন্দু শিব মঙ্গলদাস মহারাজের সাথে ধর্মীয় আলোচনা করেন, ওই সন্ন্যাসীকে বিপুল উপহার প্রদান করেন। সম্রাটের সাথে ইসলামি সুফি সম্প্রদায়ের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এটিও ছিল দীর্ঘ দিন ধরে অনুসরণ করা মোগল ঐতিহ্য। এর প্রমাণ পাওয়া যায় মহারাষ্ট্রের একটি চিশতি দরগায় তার কবর হওয়ার মধ্যে। একটি ছবিতে দুই ছেলেকে নিয়ে রাজস্থানের আজমিরে মইনুদ্দিন চিশতির (মৃত্যু ১২৩৬) দরগায় যেতে দেখা যায় আওরঙ্গজেবকে। ছবিটি সম্ভবত ১৬৮০ সালের দিকের (চিত্র ৫)। ইসলাম সম্পর্কে আওরঙ্গজেবের বিশ্বাসের মধ্যে অনেক তাবিজ-কবজের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একবার যুদ্ধের সময় তিনি দোয়া-দরুদ লিখে সেগুলো রাষ্ট্রের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া ঝান্ডা ও পতাকায় গেঁথে দিয়েছিলেন।
আওরঙ্গজেব প্রায়ই তার নিজের ও অন্যদের কল্যাণের জন্য প্রকাশ্যে তার ধর্মভক্তি প্রকাশ করতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুদ্ধ পতাকায় দোয়া দরুদ লিখে সেলাই করার কথা বলা যায়। তিনি কাজটি করতেন তার ও তার সৈন্যদের দৃষ্টিতে জয় নিশ্চিত করার জন্য। সম্রাট একবার দোয়া লিখে বন্যার পানিতে নিক্ষেপ করেছিলেন। ভীমসেন স্যাক্সেনার ভাষায় এতে পানি হ্রাস পেয়েছিল। আরেক ইতিহাসবিদ লিখেছেন, যুদ্ধের মধ্যেই তিনি তার ধর্মনুরাগ প্রকাশ করার লক্ষ্যে নামাজ পড়ার জন্য ঘোড়া থেকে নেমে গিয়েছিলেন। তিনি কাজটি করেছিলেন তার সৈন্যদের এই আত্মবিশ্বাস বাড়াতে যে আল্লাহ তাদের পক্ষে আছেন। আওরঙ্গজেব হতে চাইতেন ভালো মুসলিম এবং তা অন্যদের দেখাতেও চাইতেন ।
মুসলিম শাসক হিসেবে আওরঙ্গজেবের ধর্মীয় আদর্শ দাবি করত যে তিনি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন, তার নাগরিকদের সুরক্ষা দেবেন। তিনি তার নাতি আজিমুশ্বানের কাছে লেখা এক পত্রে লিখেছেন : ‘তুমি ইহকাল ও পরকালের সুখের উৎস হিসেবে প্রজাদের সুরক্ষা প্রদানকে বিবেচনা করতে পারো।’ তবে ইসলামের সাথে তার প্রকাশ্য সম্পর্ক নিয়ে সম্রাট বারবার সমস্যায় পড়তেন । দুটির মধ্যে সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হলে আওরঙ্গজেব সাধারণত রাষ্ট্রীয় স্বার্থের বেদীতে ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা বলি দিতেন, যদিও এ ধরনের সিদ্ধান্ত তার বুকে ভারী বোঝা হয়ে থাকত ।
—
পিতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ও তাকে অর্ধ দশকেরও বেশি সময় আটকে রেখে ইসলামি বিধান লঙ্ঘন করেছিলেন আওরঙ্গজেব। আমি আগেই বলেছি, মক্কার শরিফ এই রায় স্পষ্টভাবে দেন। তিনি আওরঙ্গজেবের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়ে দেন যে শাহ জাহান জীবিত থাকা পর্যন্ত হিন্দুস্তানের বৈধ শাসক হিসেবে তাকে স্বীকৃতি দেবেন না। মক্কার শরিফের মন পরিবর্তনের চেষ্টায় কখনো বিরাম দেননি আওরঙ্গজেব। এতে মনে হয়, মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের অনুমোদনের অভাব মোগল সম্রাটকে অস্বস্তিতে ফেলেছিল। ১৬৬৬ সালে শাহ জাহান ইন্তিকাল করলে সমস্যাটির আপনা-আপনি সমাধান হয়। তবে এর মধ্যবর্তী সাড়ে সাত বছরের ইসলামি নীতিমালার লঙ্ঘনের জন্য আওরঙ্গজেবকে অত্যন্ত চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল।
এর কয়েক দশক পর এক ইউরোপিয়ান পর্যটক অভিমত প্রকাশ করেছেন যে আওরঙ্গজেবের মদ্যপানসহ ‘কঠোর সংযম’ ছিল তার পিতার প্রতি করা তার আগেকার পাপের প্রায়শ্চিত্ত। এই সূক্ষ্ম যোগসূত্র নির্ভুল হোক বা না হোক, খুব সম্ভবত অবৈধ মুসলিম রাজা হিসেবে আওরঙ্গজেবকে চিহ্নিত করার কারণেই তিনি আরো নিবেদিতপ্রাণ মুসলিমে পরিণত হতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। ঐকান্তিকতার সাথে পবিত্র কোরআন মুখস্ত করা, পবিত্র কোরআনের অনুলিপি তৈরী করাসহ তার আরো সুস্পষ্ট ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত হওয়ার ঘটনা ঘটে তার সিংহাসনে আরোহণের পর। এখানে, আওরঙ্গজেবের ধার্মিকতা রাষ্ট্রীয় নীতিতে তেমন প্রভাব ফেলেনি যেভাবে তার রাজকীয় অভিজ্ঞতা তার ধার্মিক জীবনে পরিবর্তনকে উদ্দীপ্ত করেছিল।
তার শাসন পরিক্রমার ধারায় ইসলামি ধর্মীয় আদর্শ ও মোগল রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মধ্যে আরো নানা সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়েছিল। প্রায় সব ক্ষেত্রেই আওরঙ্গজেব রাষ্ট্রীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিতেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৬৮৬ সালের বিজাপুর অভিযানকালে বিজাপুরের ধর্মবিদদের একটি দল আওরঙ্গজেবের কাছে গিয়ে এই যুক্তিতে অবরোধ তুলে নিতে বলেন যে একই মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অন্যায়। আওরঙ্গজেব অনড় থাকেন, তিনি বিজাপুরের পতন না হওয়া পর্যন্ত তার নৃশংস কৌশল কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন। সম্রাট তারপর বিজাপুরি প্রাসাদের কিছু দেয়ালচিত্র মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন এটা বোঝাতে যে মোগল ধর্মীয় রাষ্ট্রের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ছবিগুলো পৌত্তলিকতাবিষয়ক!
