মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই আয়াতে পতিত হওয়া বা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া অর্থে যে-আরবী ক্রিয়া ব্যবহার করা হয়েছে সেটি হলো—ইনকাদারাত। এটার দুটো অর্থ। প্রথম অর্থ হলো—কোনো কিছু আলোহীন হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয় অর্থ হলো—ঝরে যাওয়া, বিচ্যুত হওয়া, পতিত হওয়া। আবার, কাদারাতুন অর্থ হলো—বৃহদাকৃতির পিণ্ড বস্তু। আয়াতটিতে বলা হচ্ছে, ওয়া ইযান নুজুমুন কাদারাত। অর্থাৎ যখন নক্ষত্ররাজি আলোহীন হয়ে বৃহদাকৃতির ঢেলা বা বস্তুপিণ্ডের রূপ ধারণ করবে।
ঠিক এমনটাই আমরা ওপরে জেনেছি। আমরা জেনেছি যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে সূর্যের মতো অন্যান্য উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজিও তাদের জ্যোতি হারিয়ে ফেলবে এবং তারা পরিণত হবে শ্বেতবামন আর নিউট্রন তারকায়। আলো, শক্তি-তেজ এবং তাপহীন। এই অবস্থাগুলোকে বর্ণনা করতে গিয়ে কুরআন এভাবে বলছে,
যখন সূর্য জ্যোতিহীন হয়ে পড়বে
আর, খসে পড়বে নক্ষত্ররাজি
এখানেও শেষ নয়। সূরা মুরসালাতের আট নম্বর আয়াতেও ঠিক একই কথা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন,
যখন নক্ষত্ররাজি হয়ে পড়বে আলোহীন
আজ সাম্প্রতিক বিজ্ঞান আমাদের যা জানাচ্ছে, সৃষ্টিকুলের মালিক কত আগেই-না তা আমাদের জানিয়ে রেখেছেন। তিনি মানুষকে সত্যানুসন্ধানী হতে বলেছেন। তার সৃষ্টিজগৎ থেকে খুঁজে বের করতে বলেছেন তার নিদর্শনসমূহ। আধুনিক বিজ্ঞানের জন্মের বহু আগে একজন নিরক্ষর লোকের দ্বারা এগুলো রচনা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তার পক্ষে কখনোই বলা সম্ভব নয় যে, কীভাবে সূর্যের মতো এত তেজস্বী নক্ষত্র আলোহীন হয়ে যেতে পারে। কীভাবে সুবিশাল নক্ষত্ররাজি হয়ে পড়তে পারে আলো, শক্তিহীন। বলা তো দূরের কথা, তার ভাবনাতেও এগুলো আসা স্বাভাবিক যুক্তিবিরুদ্ধ, যদি-না তিনি কোনো ঐশীবাণী দ্বারা এগুলো সম্পর্কে জ্ঞাত না হন। এই বাণীগুলো নিশ্চিতরূপে সেখান থেকেই আসা সম্ভব, যে-সত্তা এই আকাশ, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রসহ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনি সুমহান আল্লাহ।
সাজিদের প্রবন্ধটি এখানেই শেষ। পুরো লেখাটি পড়ার পরে আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমি বিমোহিত হয়ে রইলাম খানিকক্ষণ। এতটা বিস্ময়ে ভরা আল কুরআন? মানুষকে জানাচ্ছে কিয়ামতপূর্ব কিছু নিদর্শন। অথচ, তার মধ্যেই কি না বিজ্ঞানের ছোঁয়া। সুবহানাল্লাহ!
আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করে সাজিদকে ফোন করলাম। তাকে আজ টিএসসির সাতরঙা চা খাওয়াব। ওর ফোনে কল গেল না। বন্ধ দেখাচ্ছে। আমি কাপড়চোপড় পাল্টিয়ে টিএসসি যাওয়ার জন্যে রেডি হলাম। ইতোমধ্যেই দেখি একগাদা বই হাতে সাজিদ রুমে ঢুকল। তাকে বললাম, তোর ফোন বন্ধ পাচ্ছিলাম।
সে বলল, ফোন চুরি গেছে।
আমি বেশ অবাক হয়ে বললাম, কীভাবে?
এক আত্মীয়কে দেখতে গিয়েছিলাম পিজিতে। আসার পথে রিক্সায় কথা বলছিলাম ফোনে। পেছন থেকে এক ছোকরা ঝাপটা মেরে নিয়ে দৌড় দিল।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, বেচারা দৌড় দিল কেন?
সাজিদ আমার কথা শুনে বেশ অবাক হলো। সে খুব কমই অবাক হয়। সে যখন অবাক হয় তখন তার চোখের পাতা নড়ে না। একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। সে বলল, ছিনতাইকারী ছিনতাই করে দৌড় দেবে এটাই স্বাভাবিক নয় কি?
আমি বেশ বিজ্ঞসুলভ চেহারায় বললাম, তা ঠিক; কিন্তু সে যদি জানত—তুই কোনো দিনও বেচারাকে ধাওয়া করবি না, তাহলে সে কিন্তু ফোন নিয়ে দৌড়ে পালাত না।
আমি বুঝতে পারলাম সাজিদ এই মুহূর্তে বিশাল এক লেকচার শুরু করবে। সে আমাকে ক্রিমিনাল সাইকোলজির নানান ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ শুনিয়ে প্রমাণ করে ছাড়বে যে, ওই মুহূর্তে ছিনতাইকারীর কেন দৌড়টি দেওয়া যৌক্তিক ছিল। লেকচার শুরুর পূর্বেই তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, ওসব বাদ দে। আসল কথায় আসি। তোকে ফোন করেছিলাম একটি কারণে।
কী কারণ? জানতে চাইল সাজিদ।
তোকে এখন আমার সাথে টিএসসি যেতে হবে। আজ তোকে সাতরঙা চা খাওয়াব।
সাজিদ কিছুই বলল না। কিছু না বলার মানে হলো সে আমার সাথে টিএসসিতে যাবে। তাকে বললাম, তোর আর্টিকেলটি একটু আগে পড়ে শেষ করলাম। ফাটাফাটি লিখেছিস। এ জন্যেই আজকে তোকে সাত রঙা চা খাওয়াব।
এবারও সে কিছু না বলে তার চেয়ারে গিয়ে বসল। হাত থেকে বইগুলো রেখে আবার উঠে দাঁড়াল। আমি আবার বললাম, আচ্ছা, তুই না বলেছিলি এই ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ দিলে মফিজুর রহমান স্যার নাও ছাপাতে পারে?
হ্যাঁ।
তাহলে ছাপাল কীভাবে?
তা তো জানি না।
তার কোনো প্রতিক্রিয়া জানতে পেরেছিস?
সাজিদ কোনো উত্তর না দিয়ে তার ব্যাগ থেকে একটি নীলরঙা খাম বের করে আমার হাতে দিল। সম্ভবত ভেতরে একটি চিঠি আছে। আমার হাতে খামটি দিয়েই সে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। আমি খামটি খুলে পড়তে শুরু করলাম :
সাজিদ,
প্রণোদনা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত তোমার আর্টিকেলটি আমি পড়েছি। আমি বলব না—তোমার আর্টিকেলটি পড়ে আমি বিমোহিত হয়েছি। তোমার আর্টিকেল পড়ার পরের অনুভূতি বোঝানোর মতো শব্দ আমার ডিকশনারিতে মজুদ নেই। ক্লাসে এবং ক্লাসের বাইরে ইতিপূর্বে তোমার সাথে আমার বেশ কয়েকবার ঠান্ডা বিতর্ক হয়েছে। খুব তাচ্ছিল্যভরে তোমাকে আমি মি. আইনস্টাইন বলে ডাকতাম। আই অ্যাপোলোজাইয মাই সান। খুব ধার্মিক পরিবারে বেড়ে উঠলেও জীবনে আমি বেশ কড়া অবিশ্বাসীতে পরিণত হই। বারবার চেষ্টা করেছি এই হতাশাগ্রস্ত জীবন থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি; কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমার আর্টিকেলটি পড়ে আমার খুব করে আবার মন চাচ্ছে বিশ্বাসী শিবিরে ফিরে আসতে। আশা করছি আমি সফল হব। আমার জন্যে দোয়া কোরো। তোমাকে ধন্যবাদ।
