দ্বিতীয়ত এই কুরআন কোনো সাইন্সের বই নয়। অর্থাৎ এটি এমন কোনো বই নয় যে, এতে কেমিস্ট্রির বিক্রিয়া, পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্র আর জীববিজ্ঞানের মোটা মোটা থিওরি এতে গৎবাঁধা লেখা থাকবে। এতে সাইন্স থাকবে না; বরং সাইন থাকবে। অর্থাৎ এতে থাকবে বহু নিদর্শন। এই নিদর্শনগুলো কোনো স্পেশাল বিজ্ঞানী বা কোনো স্পেশাল মানুষের জন্যে দেওয়া হয়নি। এগুলো সকল মানুষের জন্যই দেওয়া। তাই এগুলো এমনভাবে দেওয়া হয়েছে যেন মাঠের কৃষক থেকে শুরু করে গবেষণাগারের বিজ্ঞানী, সবাই বুঝে নিতে পারে।
এবার তাহলে আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। কুরআন কোথায় বলেছে সূর্য একদিন তার সকল শক্তি নিঃশেষ করে আলোহীন, নিস্তেজ হয়ে পড়বে, তাই না?
আমরা প্রথমেই সূরা ইয়াসীনের আটত্রিশ নম্বর আয়াতের দিকে তাকাই। আয়াতটিতে To 260 And the Sun runs (on course) toward its stopping point. That is the determinaton of the exalted in might, the knowing.
অর্থাৎ এই আয়াতের সরল বাংলা করলে এরকম হয়, আর, সূর্য ছুটে চলছে তার জন্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া গন্তব্যের দিকে। এটি মহাপরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের সুনিরূপিত নির্ধারণ।
একটু গভীরভাবে যদি খেয়াল করি, এই আয়াতে সূর্যের জন্য নির্ধারিত গন্তব্য বোঝাতে যে-অ্যারাবিক ওয়ার্ড ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি হলো লিমুসতাকাররিন। এই আরবী শব্দের জন্য যদি আমরা ব্রিটিশ ইংরেজি ডিকশনারি খুলি, তাহলে দেখব যে, এই আয়াতের অর্থ করা আছে, The resting place, The stopping point, সরল বাংলা করলে হবে, থেমে যাওয়ার স্থান, নির্ধারিত গন্তব্য ইত্যাদি।
তাহলে কী বোঝা গেল? উক্ত আয়াতের ভাষ্যমতে, সূর্য তার জন্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়া গন্তব্যের দিকে অবিরত ছুটে চলেছে। তার জন্যে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট, একটি নির্দিষ্ট অবস্থা নির্ধারণ করা আছে, যে-সময়ে, যে-অবস্থায় এসে তাকে থেমে যেতে হবে এবং এটাই হচ্ছে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নির্ধারিত নিয়ম।
আধুনিক বিজ্ঞান কী বলছে? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে—সূর্যের সকল জ্বালানি একটি নির্দিষ্ট সময় পরে শেষ হয়ে যাবে। সেদিন সূর্য হয়ে পড়বে তেজহীন, আলোহীন তথা শক্তিহীন। সূর্যের এই জ্বালানি প্রতিনিয়ত নিঃশেষ হচ্ছেই। একটি পর্যায়ে গিয়ে ঘটবে চূড়ান্ত পতন। সেদিন সূর্যকে থেমে যেতে হবে। ঠিক এই কথাগুলোই কি আল কুরআন আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে আমাদের জানায়নি? শুধু তা-ই নয়। সূর্য যে একটি সময়ে আলো ও শক্তিহীন হয়ে পড়বে, সে ব্যাপারটি খুব স্পষ্ট করেই বলেছে কুরআন। সূরা তাকবিরের একেবারে শুরুতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলছেন, যখন সূর্য হয়ে পড়বে জ্যোতিহীন।
এই সূরায় আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কিয়ামতের আগের কিছু নিদর্শন নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে তিনি খুব স্পষ্ট করেই বলেছেন, কিয়ামতের আগে সূর্য জ্যোতিহীন হয়ে পড়বে। কিয়ামত কবে হবে সে-জ্ঞান আমাদের কারও জানা নেই। এমনকি স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও কিয়ামতের চূড়ান্ত সময়টি সম্পর্কে জানানো হয়নি। এই জ্ঞান কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার কাছেই। তো, তিনি বলছেন, কিয়ামতের আগে সূর্য জ্যোতিহীন হয়ে পড়বে। একই কথা কি আমাদের বিজ্ঞানও বলছে না? বিজ্ঞান কি বলছে না, একটি সময়ে গিয়ে সূর্য হারিয়ে ফেলবে তার তেজ, জ্যোতি ও শক্তি? বিজ্ঞান কি বলছে না, সূর্য হয়ে পড়বে আলোহীন? বিজ্ঞান কি বলছে না, সূর্য হয়ে যাবে শ্বেতবামন?
একটি দৃশ্য কল্পনা করার চেষ্টা করা যাক। মরুভূমির অঞ্চল। নিরক্ষর একজন লোক। দিনের আকাশে গনগনে সূর্য দেখে কেন তার মনে হবে এই সূর্য একদিন নেতিয়ে পড়বে? আলোহীন হবে? একজন সাধারণ মানুষ হলে তো তার ভাবা উচিত ছিল যে, এই সূর্য অবিনশ্বর। যার এত তেজ, এত শক্তি, এত তাপ, সে কীভাবে নিঃশেষ হতে পারে? আলোহীন হতে পারে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও ঠিক এরকম ভাবতেন যদি তিনি ঐশী বাণীপ্রাপ্ত না হতেন। যদি না তাকে সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, গ্যালাক্সির সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জানাতেন—সূর্য একদিন আলোহীন হয়ে পড়বে। তাকে জানানো হয়েছে কুরআনের মাধ্যমে। তবেই তিনি জেনেছেন।
আধুনিক বিজ্ঞান এই সময়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যে-সকল তথ্য আমাদের জানাচ্ছে, সেই তথ্যগুলো সম্পর্কে আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন। এটি যদি সুমহান আল্লাহর কাছ থেকেই না আসে তবে কীভাবে সম্ভব?
না। ঘটনার এখানেই শেষ নয়। শুরুতেই বলেছিলাম যে, কেবল সূর্যই নয়, সূর্যের মতো আরও অসংখ্য তারকা, নক্ষত্রের কপালেও জুটবে একই ভবিতব্য। সূর্যের মতো সেগুলোও হয়ে পড়বে আলোহীন, শক্তিহীন ও তাপহীন। তাদের কেউ হয়ে যাবে শ্বেতবামন, আবার কেউ হয়ে যাবে নিউট্রন তারকা। ঠিক এই ইঙ্গিতটাও আমরা পবিত্র কুরআন থেকে পাই। যেমন সূরা তাকবিরের দ্বিতীয় আয়াতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন, যখন নক্ষত্ররাজি পতিত হবে (বা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যাবে)।
