তোমার স্যার
মুহাম্মদ মফিজুর রহমান
চিঠি পড়া শেষ হতে খেয়াল করলাম আমার চোখ দুটো খুব ভারী হয়ে উঠেছে। টুপ করে দু-ফোটা জল নিচেও গড়িয়ে পড়ল। আমার চোখের জলে এই নীল খাম যাতে ভিজে না যায় সে জন্য তাড়াতাড়ি খামটি নিরাপদে সরিয়ে ফেললাম। চোখের জলে এই নীলরং মুছে না যাক। এই নীল শুভ্রতার প্রতীক। এই শুভ্রতা পবিত্রতার বাহক। এই পবিত্রতা ছড়িয়ে পড়ুক সব প্রাণে। জগতের সকল দ্বিধাগ্রস্ত মফিজুর রহমান স্যারেরা এই শুভ্রতায় পবিত্র হয়ে উঠুক। আমি মনে মনে বললাম, সাজিদ, আই অ্যাম প্রাউড অফ ইউ মাই ফ্রেন্ড।
১২. সমুদ্রবিজ্ঞান
আজ আমার আবৃত্তির ক্লাস আছে। নতুন একটি আবৃত্তি ক্লাবে জয়েন করেছি সেদিন। কবিতার প্রতি অন্যরকম ভালোলাগা থেকেই মূলত আবৃত্তি ক্লাবে আসা। সারা দিন গুনগুন করে কবিতা আওড়াই। যেদিন থেকে আবৃত্তি শিখতে শুরু করেছি, সেদিন থেকে আমার মধ্যে অদ্ভুত কিছু ব্যাপার দেখা দিয়েছে। কয়েকদিন আগের কথা। সাজিদসহ ফিরছিলাম সদরঘাট থেকে। দেখতে গিয়েছিলাম বুড়িগঙ্গা নদী। একটি জীবন্ত, সতেজ আর শুদ্ধ স্রোতের নদী মানুষের অত্যাচারে কীভাবে ধুকেধুকে মরে যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই বুড়িগঙ্গা।
আসার পথে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে খুব সুন্দর একটি বিলবোর্ড দেখলাম। সম্ভবত কোনো বেসরকারি এনজিওর বিলবোর্ড হবে। সাধারণত কোম্পানি আর কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলবোর্ড হয় বলে জানতাম; কিন্তু এরকম এনজিওরও বিলবোর্ড থাকে সেটি আমি ওইদিনই জানতে পারলাম। যাই হোক, ওই বিলবোর্ডে বেশ সুন্দর কিছু কথা লেখা ছিল। মানবসেবাধর্মী কথা। কথাগুলোতে চোখ পড়ে যাওয়ায় আমি থমকে দাঁড়িয়ে সেগুলোর ওপর চোখ বুলাতে লাগলাম। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। আমি ওদিকে তাকিয়েই আছি। বিলবোর্ডের দিকে তাকিয়ে আমাকে এরকম হাঁ হয়ে থাকতে দেখে সাজিদ বলল, ওটি কবিতা নয়, বিলবোর্ড। এত মনোযোগ দিয়ে পড়ার কিছু নেই।
ওর কথা শুনে আমার সংবিৎ ফিরল। খেয়াল করলাম সে আমার দিকে বেশ বিরক্ত চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে। আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, মানুষ তো বায়োস্কোপের মধ্যেও এভাবে চোখ ডুবিয়ে দেয় না, তুই বিলবোর্ডে যেভাবে ডুব দিয়েছিস।
আমার এই হয়েছে এক সমস্যা। সবখানে আমি আজকাল সাহিত্য খুঁজে বেড়াই। আমার সেই খোঁজাখুঁজি বিলবোর্ড থেকে শুরু করে ঝালমুড়ির ঠোঙা পর্যন্ত বিস্তৃত।
সকাল থেকে আমি একটি কবিতাই আবৃত্তি করে যাচ্ছি। নির্মলেন্দু গুণের স্ববিরোধী কবিতাটি।
আমি জন্মেছিলাম এক বিষণ্ণ বর্ষায়
কিন্তু আমার প্রিয় ঋতু বসন্ত।
আমি জন্মেছিলাম এক আষাঢ় সকালে
কিন্তু ভালোবাসি চৈত্রের বিকেল।
আমি জন্মেছিলাম দিনের শুরুতে
কিন্তু ভালোবাসি নিঃশব্দ নির্জন নিশি।
আমি জন্মেছিলাম ছায়াসুনিবিড় গ্রামে
ভালোবাসি বৃক্ষহীন রৌদ্রদগ্ধ ঢাকা।
জন্মের সময় আমি খুব কেঁদেছিলাম
এখন আমার সবকিছুতেই হাসি পায়।
আমি জন্মের প্রয়োজনে ছোট হয়েছিলাম
এখন মৃত্যুর প্রয়োজনে বড় হচ্ছি।
কবি নির্মলেন্দু গুণের একটি ব্যাপারের সাথে আমার বেশ মিল পাচ্ছি। কবি জন্মেছেন বর্ষায়; কিন্তু বর্ষার বদলে তার পছন্দের ঋতু হলো বসন্ত। বাবার কাছে শুনেছি, আমি নাকি জন্মেছিলাম ফাগুন মাসে। ফাগুনের আগুন লাগা সময়ে যখন গাছগুলো কৃষ্ণচূড়া ফুলে রক্তাক্ত লাল হয়ে ওঠে, ঠিক ওই সময়টাতেই নাকি আমার জন্ম। ফাগুন মাসে জন্মালেও লাল রং আমার একদম অপছন্দ। বিচ্ছিরি লাগে। নির্মলেন্দু গুণের সাথে আমার এরকম অপূর্ব মিল দেখে আমি যারপরনাই আনন্দিত।
সাজিদ তার বেডের ওপরে শুয়ে ম্যাগাজিন পড়ছে। আমি যে এত সুন্দর করে কবিতা আবৃত্তি করছি সেদিকে তার কোনো ভুক্ষেপই নেই। সবকিছুতেই তার এই নির্মোহ ভাবটি আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে।
আমি তাকে উদ্দেশ্য করে বললাম, শুনছিস?
সে মুখের ওপর থেকে ম্যাগাজিন না সরিয়েই বলল, বল।
আমার সাথে না নির্মলেন্দু গুণের একটি ব্যাপারে বেশ মিল আছে।
সাজিদ বলল, হুম। এটি বলেই সে আবার চুপ মেরে গেল। আমি আবার বললাম, কোন ব্যাপারে মিল আছে শুনবি না?
বল।
আমি তার বেডে এসে বসলাম। বললাম, মুখের ওপর এরকম ছাতা টেনে রাখলে কথা বলা যায়?
সে এবার ম্যাগাজিনটি সরিয়ে আমার দিকে তাকাল। বলল, ঠিক আছে, বল।
আমি এবার একটু নড়েচড়ে বসলাম। নিজের গল্প অন্যকে শোনাতে আমার বেশ লাগে। বললাম, কবি নির্মলেন্দু গুণের নাকি বর্ষাকাল পছন্দ না। অথচ তিনি জন্মেছেন ঘোর বর্ষায়।
সাজিদ বলল, হুম।
তার সাথে আমার একটি মিল রয়েছে। আমি জন্মেছি ফাগুন মাসে; কিন্তু লাল রং আমার একদম অপছন্দ। বিচ্ছিরি।
ফাগুনের সাথে লাল রঙের কী সম্পর্ক?, জিজ্ঞেস করল সাজিদ।
ওমা! ফাগুন মাসেই তো কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটে, তাই না?
তো? কৃষ্ণচূড়া ফুল কি তুই পছন্দ করিস না?
তা তো করি।
তাহলে?
লাল রংটি কেমন যেন অপছন্দের।
সাজিদ জোরে একটি নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, ফাগুন মাসের সাথে লাল রঙের কোনো সম্পর্ক নেই। ফাগুন মাসে অনেক অনেক ফুল ফোটে। সেই ফুলগুলোর কোনোটির রং সবুজ, কোনোটি নীল। কোনোটি আবার হলুদ। তার মধ্যে কৃষ্ণচূড়া হলো টকটকে লাল। কবির অপছন্দ হলো বর্ষাঋতু, আর তোর অপছন্দ কেবল একটি নির্দিষ্ট রং। কবির সাথে তাহলে তোর মিল কোথায়?
