ম্যাগাজিনটির ইনার-ডিজাইন খুব সুন্দর করে সাজানো। প্রতিটি লেখার সাথে কিছু স্থির চিত্র দেওয়া আছে যাতে বিষয়বস্তু সম্পর্কে পাঠক সহজে অনুমান করতে পারে। সূর্য যাবে ডুবে এই লেখাটার সাথেও দেওয়া হয়েছে খুব সুন্দর একটি চিত্র। ডুবুডুবু অবস্থায় একটি সূর্য। আমি আর লোভ সামলাতে পারছি না। সরাসরি পাঠে মনোযোগ দিলাম।
সূর্য যাবে ডুবে
আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের প্রতিনিয়ত নানা বিস্ময়কর সব তথ্য জানিয়ে হতবাক করে ছাড়ছে। পাল্টে দিচ্ছে আমাদের রোজকার জীবন। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের পদে পদে বিজ্ঞানের অবদান অবশ্যই অনস্বীকার্য। বিজ্ঞানের হাত ধরেই মানুষ যাত্রা করেছে চাঁদ থেকে মঙ্গলে। বিজ্ঞানের রূপরেখা ধরেই মানুষ গভীর সমুদ্র চষে বেড়াচ্ছে। জয় করে নিচ্ছে অজেয় সব ব্যাপার। প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসা আমাদের জন্য বিজ্ঞান সহজলভ্য করে দিয়েছে। আধুনিক জীবনে বিজ্ঞান যেন আমাদের জীবনের প্রতিশব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক অনেক সুখকর তথ্য, আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের সাথে সাথে বিজ্ঞান আমাদের প্রায়ই বেশ কিছু দুঃসংবাদও শুনিয়ে থাকে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম যে-দুঃসংবাদ বিজ্ঞান আমাদের সম্প্রতি জানিয়েছে তা হলো, আমাদের সূর্য একদিন তার সব তেজ-শক্তি আর আলো হারিয়ে নিঃশেষ হয়ে পড়বে।
অবাক করা ব্যাপার হলেও সত্য যে, একদিন আমাদের পৃথিবী আর সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে না। সকালের সোনা রোদের আশায় অপ্রস্ফুটিত ফুলের কলিটি আর কখনোই প্রস্ফুটিত হবার সুযোগ পাবে না। পৃথিবী ছেয়ে যাবে অন্ধকারে। ঘোর অন্ধকার…।
বিজ্ঞান ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছে এভাবে, একটি পর্যায়ে গিয়ে মহাকাশের তারাগুলো তাদের সব শক্তিমত্তা, তেজ হারিয়ে ফেলবে। যেসব তারকার ভর সৌর ভরের আট গুণের কম থাকে, অন্তিম দশায় পৌঁছালে তাদের কেন্দ্রের ভর চন্দ্রশেখরের সীমা, অর্থাৎ ১.৪ গুণ সৌর ভরের নিচে থাকবে। এরকম অবস্থায় যারা পতিত হবে তাদের বলা হয় শ্বেতবামন। এর বিপরীতে, অর্থাৎ যেসব তারকার ভর সৌর ভরের আট গুণের বেশি থাকে, অন্তিম দশায় পৌঁছালে তাদের কেন্দ্রের ভর চন্দ্রশেখরের সীমা, অর্থাৎ ১.৪ গুণের মধ্যে থাকলে সেই তারকাগুলো নিউট্রন তারকায় পরিণত হবে। তবে এদের ভর যদি ৩ গুণ সৌরভর অপেক্ষা বেশি হয় তাহলে তারা আর নিজেদের ধরে রাখতে পারে না। সংকুচিত হতে হতে এরা একটি ব্ল্যাকহোলে পরিণত হয়ে যায়।
আমাদের অতি প্রিয়, অতি পরিচিত সূর্যের বেলাতেও এই কথাগুলো প্রযোজ্য। সাম্প্রতিক বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে যে, সূর্যের জ্বালানি ক্রমশ ফুরিয়ে যাচ্ছে। সূর্যের জ্বালানি হলো Hydrogen Fuel. নাসার বিজ্ঞানীরা বলছেন, সূর্য তার ভেতরে যে-তাপ ধারণ করে আছে, গত ৪.৫ বিলিয়ন বছরে সেই তাপের প্রায় অর্ধেকটাই শেষ হয়ে গেছে। প্রতিনিয়ত সূর্যের এই জ্বালানি খরচ হচ্ছে এবং কমছে নিজের তেজস্ক্রিয়তাও; কিন্তু সূর্যের তাপের মাত্রা এতই বেশি যে, তার ক্ষয়ে যাওয়া শক্তির ঘাটতি সাধারণত আমাদের চোখে পড়ে না। খুব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক গবেষণা ছাড়া এই ব্যাপারগুলো বোঝা যায় না। এভাবে নিজের শক্তি ক্ষয় হতে হতে এমন একটি সময় উপস্থিত হবে, যেদিন সূর্য একেবারেই আলোহীন এবং নিস্তেজ হয়ে পড়বে। আমাদের পরিচিত সূর্য পরিণত হবে শ্বেতবামনে।
তবে খুব শীঘ্রই যে এমনটি ঘটবে, তা নয়। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন যে, সূর্যের মধ্যে এখনো যে-পরিমাণ জ্বালানি মজুদ আছে, সেই জ্বালানি দিয়ে আগামী আরও ৫ বিলিয়ন বছর সূর্য এভাবে বহাল তবিয়তে থাকতে পারবে।
নাসার বক্তব্য এবং তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে যে-সারমর্ম পাওয়া যায় তা হলো, সূর্যের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করছে যখন সূর্য আলোহীন, শক্তিহীন হয়ে পড়বে। শুধু সূর্যই নয়, সূর্যের মতো আরও অসংখ্য, অগণিত এরকম নক্ষত্রের ভাগ্যেও যে এই পরিস্থিতি জুটবে, সেটাও বিজ্ঞান আমাদের জানাচ্ছে খুব স্পষ্ট করে। ইতোমধ্যেই অসংখ্য নক্ষত্র নিজেদের শক্তি, জ্যোতি হারিয়ে শ্বেতবামন আর নিউট্রন তারকায় পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও হবে।
খুব মজার ব্যাপার হলো, আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশো বছর আগে, মরুভূমিতে একজন নিরক্ষর লোকের ওপর নাযিল হওয়া পবিত্র কুরআনুল কারীমে ঠিক এই কথাগুলো খুব সুন্দর, খুব গোছালো এবং সুস্পষ্ট করে বলা আছে।
প্রণোদনা ম্যাগাজিনের এতটুকু পড়ে এবার আমি নড়েচড়ে বসলাম। আমি আসলে এতক্ষণ এই টুইস্টটির জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম; কিন্তু ঘটনা যে—এতটা কাহিনির রূপ নেবে, সেটি বুঝতে পারিনি। সূর্যের অন্তিম পরিণতি, সূর্যের জ্বালানির নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, শ্বেতবামন আর নিউট্রন তারকা সম্পর্কিত তথ্যাবলি আমাকে পুরোটাই চমকে দিয়েছে; কিন্তু এই ব্যাপারগুলো কুরআনে কীভাবে আছে সেই কৌতূহলটাই এখন বেশি। আর অপেক্ষা করতে পারছি না। পরের অংশটুকু পড়ার জন্যে মনটি ব্যাকুল হয়ে আছে। ধপাস করে গিয়ে বসলাম সাজিদের খাটে। চোখজোড়া প্রণোদনা ম্যাগাজিনের ওই পাতাগুলোতেই আটকে আছে। আমি আবার পড়তে শুরু করলাম :
এখন যে-কেউ প্রশ্ন করতে পারে, সাম্প্রতিক বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত তথ্য চৌদ্দশো বছর আগের একটি বইতে কীভাবে থাকতে পারে? এই প্রশ্নটি আসা স্বাভাবিক। প্রথমত, আমাদের যে-জিনিসটি বুঝতে হবে তা হলো, এই কুরআন কোনো মানুষের লেখা বই নয়। এটি এমন এক সত্তার বাণী, যিনি সৃষ্টি করেছেন পৃথিবী এবং পৃথিবীর বাইরের সবকিছু। তিনিই সৃষ্টি করেছেন চাঁদ, তারা, সূর্য, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি। তিনিই সৃষ্টি করেছেন পাহাড়-পর্বত, নদী, সমুদ্র, বন—সবকিছুর ওপর তিনিই একচ্ছত্র অধিপতি। তিনি সময়ের বাঁধনে আবদ্ধ নন; বরং তিনিই সময়ের সৃষ্টিকর্তা। মহাকাশের ক্ষুদ্র তারকা থেকে গভীর সমুদ্রতলের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বালুকণা—এমন কোনো পদার্থ, এমন কোনো জিনিস নেই, যা সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল নন। এদের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবই তার জানা। সূর্য এবং নক্ষত্ররাজির সৃষ্টিকর্তাই তো জানবেন—এদের ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হতে পারে। সুতরাং, সূর্যের সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে আসা বাণীর মধ্যে সূর্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা থাকবে, এটি খুব আশ্চর্যের কিছু নয়। বিশ্বাসী মানুষমাত্রই এটি সহজে বুঝতে পারবে।
