আমাদের সবার চোখেমুখে বিস্ময়ের ভারি রেশ। সাজিদ বলল, তোদের একটি আয়াতের কথা বলি। সূরা তাকবীরের শুরুতেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কিয়ামতের পূর্বে ঘটবে এমন কিছু নিদর্শনের কথা বলেছেন। ওই সূরার চার নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, যখন পূর্ণকালীন গর্ভবতী উটগুলো উপেক্ষিত হবে। এই আয়াতের ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে এরকম-when full term she camels will be neglected। দেখ, বাংলায় বলা হয়েছে পূর্ণকালীন গর্ভবতী উট, আর ইংরেজিতে বলা হয়েছে Full term she camels. উটগুলো যে নারী-উট হবে এবং সেগুলো যে পূর্ণকালীন গর্ভবতী হবে, সেটি বোঝাতে বাংলায় দরকার হয়েছে তিনটি শব্দ—পূর্ণকালীন গর্ভবতী উট আর ইংরেজিতে দরকার হয়েছে চার চারটি শব্দ—Full term she camels অথচ, আরবীতে পুরো ব্যাপারটির জন্যে কয়টি শব্দ দরকার হয়েছে জানিস?
রাহাত জিজ্ঞেস করল, কয়টা?
জাস্ট ওয়ান!কুরআন কেবল Ishar শব্দ দিয়েই পুরো ব্যাপারটি ক্লিয়ারলি বুঝিয়ে দিয়েছে। আরবীতে Ishar শব্দের অর্থ হলো এমন নারী-উট, যেটি হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই বাচ্চা প্রসব করবে। চিন্তা করতে পারিস আরবী ভাষার গভীরতা কতটুকু?
সঞ্জু তৃতীয়বার সুবহানাল্লাহ বলে চিৎকার করে উঠল। সে আরও বলল, এমন সমৃদ্ধ যে-ভাষা, সে ভাষায় কুরআন নাযিল হবে না তো কোন ভাষায় হবে? সুবহানাল্লাহ! সুবহানাল্লাহ!
বাড়ির ভেতর থেকে ডাক চলে এসেছে। সাজিদের বড় কাকা চিৎকার করে বলছেন, কই রে সাজিদ! তোরা কি খাওয়া দাওয়া করবি না নাকি? ছেলেগুলো সেই কোন সন্ধ্যায় এসেছে। আরেকটু হলে তোত ফজরের আযান হবে মসজিদে।
আমরা যেন কেউই সেদিকে খেয়াল দিইনি। সাজিদের কথাগুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। এত চমৎকার কুরআন নিয়ে কখনোই আমাদের সেভাবে ভাবা হয় না। সামান্য একটি শব্দের মধ্যেও যে এরকম বিস্ময় লুকিয়ে থাকতে পারে সেটি আজ সাজিদের মুখে না শুনলে বুঝতামই না।
সাজিদ বলল, এই দেখ, আমার বাড়িতে এনে তোদের না খাইয়ে লেকচার শোনাচ্ছি। চল, এবার খাওয়া-দাওয়া করা যাক…।
ভাজা ইলিশের গন্ধ আসছে নাকে। আচ্ছা, এতক্ষণ এই গন্ধ টের পাইনি কেন? কে জানে, হয়তো পেয়েছি কিন্তু সাজিদের লেকচারে এমন ঝুঁদ হয়ে ছিলাম যে ইলিশের গন্ধ নাকে লাগছে অথচ সেটি টেরই পাইনি।
১১. সূর্য যাবে ডুবে
সাজিদদের ডিপার্টমেন্ট থেকে একটি ম্যাগাজিন বের হবে। বিজ্ঞান ম্যাগাজিন। নাম প্রণোদনা। এই ম্যাগাজিনের খবর আমি অবশ্য সাজিদের কাছ থেকে পাইনি; পেয়েছি তাদের ডিপার্টমেন্টের আরেকজনের কাছ থেকে। সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে দেখি সাজিদ তার টেবিলে সোজা হয়ে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। বাসায় যে আমার মতো আস্ত একটি মানুষ এসে ঢুকল, সেটি হয়তো সে টেরও পায়নি। হয়তো পেয়েছে; কিন্তু আমার আগমন হয়তো তার কাছে তেমন কোনো ব্যাপার না, অথবা এমনও হতে পারে যে, আমার চাইতে তার কাছে বই পড়াটাই বেশি মূল্যবান। সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মনে হলো আজকাল আমি খুব বেশিই ফেলুদা সাজার চেষ্টা করছি। অকারণ সন্দেহ আর কৌতূহলের ব্যাপারটি ইদানীং খুব প্রকট আকারে আমার মধ্যে দেখা দিয়েছে। নিজেকে বোঝালাম, বাপু তুমি ফেলুদাও নও, হ্যারি পটারও নও। তোমার কাজ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যোলকলা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা। প্রাণীর কোষের ভেতর থেকে অভূতপূর্ব তথ্য বের করে আনাই তোমার কম্ম। আর যাই হোক, সাইকোলজি তোমার সাবজেক্ট নয়!
আমি কাঁধ থেকে টেবিলে ব্যাগ রাখতে রাখতে বললাম, শুনলাম তোদের ডিপার্টমেন্ট থেকে নাকি একটি ম্যাগাজিন বের হচ্ছে?
সাজিদ ঘাড় ফিরিয়ে আমার দিকে তাকাল।অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকে আগেই বাসায় ফিরেছি। অন্য কেউ হলে হয়তো জিজ্ঞেস করত, কীরে! আজকে এত তাড়াতাড়ি ফিরলি যে?
কিন্তু সাজিদের এসব জিজ্ঞেস করার টাইম নেই। ম্যাগাজিনের কথা শুনে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যাঁ।
কী বিষয়ক ম্যাগাজিন?
বিজ্ঞান।
তুই কোনো লেখা দিচ্ছিস?
সাজিদ বইটি বন্ধ করল। এরপর বলল, লেখা দিতে পারি; কিন্তু ব্যাপার হলো, মফিজুর রহমান স্যার ওই লেখা ছাপাবেন কি না, সন্দেহ আছে।
সাজিদ যেহেতু মফিজুর রহমান স্যারের আপত্তির কথা ভাবছে, তখন আমার আর বোঝার বাকি থাকে না, লেখাটি আসলে কোন কেন্দ্রিক হতে যাচ্ছে। আমি বললাম, ছাপাবে না কেন? আলবত ছাপাবে। ভালো লেখা হলে মফিজুর রহমান স্যার অবশ্যই ছাপাতে বাধ্য।
আমার কথাগুলো শুনে সাজিদ খুব-একটা আগ্রহ পেল বলে মনে হলো না। বলল, দেখি। এইটুকু বলে সে আবার বইয়ের মাঝে ডুব দিল।
এরপর কেটে গেছে কয়েক মাস। পড়াশোনা, ল্যাব আর পরীক্ষার চাপে আমিও ম্যাগাজিনের ব্যাপারটি বেমালুম ভুলে গেলাম। একদিন রাতে বাসায় ফেরার পর দেখি সাজিদ বাসায় নেই। তার টেবিলের ওপরে নীল মলাটের একটি ম্যাগাজিন রাখা। কৌতূহল থেকে ম্যাগাজিনটি হাতে নিয়ে দেখি ওপরে মোটা মোটা বাংলায় লেখা প্রণোদনা। সাথে সাথে ম্যাগাজিনটা হাতে তুলে নিলাম। এটাই তো সাজিদদের ডিপার্টমেন্ট থেকে বের হবার কথা ছিল। শেষমেশ হলো তাহলে কিন্তু এতে কি সাজিদের লেখা আছে? সাজিদ লেখা দিলেও মফিজুর রহমান স্যার কি তা আদৌ ছেপেছে? অতশত না ভেবে ম্যাগাজিনের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে সোজা চলে গেলাম ম্যাগাজিনের সূচিপত্র অংশে। আমার চোখ দুটো খুঁজে ফিরছে সাজিদের নাম। মাঝামাঝিতে এসে আমি ঠিক ঠিক পেয়ে গেলাম। ইয়েস! ইটস দেয়ার! একটি প্রবন্ধের নাম আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। সূর্য যাবে ডুবে চুয়াত্তর পৃষ্ঠায়। আমি তড়িঘড়ি করে পৃষ্ঠা নম্বর চুয়াত্তর খুঁজে বের করে দাঁড়ানো অবস্থাতেই পড়তে শুরু করলাম।
