যেমন?, প্রশ্ন করল রাহাত।
যেমন, মূসা আলাইহিস সালামের সময়ে জাদুবিদ্যা ছিল পৃথিবীব্যাপী বিখ্যাত ব্যাপার। চারদিকে তখন জাদুকরদের জয়জয়কার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মূসা আলাইহিস সালামকে সমসাময়িক বিষয় জাদুবিদ্যার মতোই মোজের জ্ঞান দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। এটাই ছিল মূসা আলাইহিস সালামের জন্যে মিরাকল। ফেরাউনের সামনে তিনি যখন হাত থেকে লাঠি রাখলেন, তখন সেটি সাপ হয়ে গেল। তার সময়কার বাঘা বাঘা জাদুকরেরা এটি দেখে তো অবাক হয়ে গেল। বলে উঠল, এত এত জাদু দেখলাম, জাদু শিখলাম; কিন্তু এরকম জাদু তো কখনো দেখলাম না। ব্যস, তারা মূসা আলাইহিস সালামের রবের ওপরে ঈমান নিয়ে এলো। আবার ঈসা আলাইহিস সালামের সময়ে চিকিৎসাবিদ্যার ছিল জগৎজোড়া খ্যাতি। তাই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঈসা আলাইহিস সালামকে এমন বিদ্যা দিয়ে পাঠালেন, যা দেখে তখনকার ডাউস ডাউস চিকিৎসকরা অবাক হয়ে গেল। কী ছিল সেই বিদ্যা? সেটি হলো তিনি মৃত মানুষকে জীবিত করতে পারতেন। এটি দেখে তো সবার চক্ষু ছানাবড়া। এটি কীভাবে সম্ভব? যে-যুগে যে-জিনিসের কদর সবচেয়ে বেশি, প্রচলন সবচেয়ে বেশি সেই যুগের রাসূলদের আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ঠিক সেই জিনিসের শ্রেষ্ঠ জ্ঞান বা সেই জিনিস দিয়েই পাঠাতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগ ছিল সাহিত্যের যুগ। তখন সাহিত্যকে ধর্মের মতো পূজা করা হতো। চারদিকে যখন আরবী সাহিত্য ও সাহিত্যিকদের জয়জয়কার, তখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন সাহিত্যমান-সমৃদ্ধ কুরআন দিয়ে পাঠালেন, যা এ যাবৎকালের সব সাহিত্যকর্মকে ছাপিয়ে একেবারে শীর্ষে আরোহণ করে বসল। সাহিত্যের জন্যে বিখ্যাত আরবরাই অবাক হতে বাধ্য হলো। কুরআনের শব্দচয়ন, সুর ও তাল-লহরি এতই চমৎকার যে, রাতের অন্ধকারে কাফিররা লুকিয়ে কুরআন শুনতে আসত।
সাজিদের কথা শুনে সঞ্জু সুবহানাল্লাহ বলে চিৎকার করে উঠল। বলল, সত্যিই চমৎকার!
সাজিদ বলতে লাগল, কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হওয়ার পেছনে আরেকটি অন্যতম কারণ হলো আরবী ভাষার সহজবোধ্যতা। আরবী ভাষার চমৎকারিত্ব, শব্দ এবং বাক্যগঠনই এমন যে, এই ভাষাটি সহজেই বোঝা যায়, মুখস্থ করে ফেলা যায়। সহজ ও সুন্দর আরবী ভাষায় কুরআন নাযিল করে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যুগের পর যুগ ধরে এই কুরআনকে যেকোনো প্রকার বিকৃতি ও বিনষ্টের হাত থেকে রক্ষা করে চলেছেন।
কীভাবে সেটি?, সঞ্জু আবার জানতে চাইল।
এই যে, পৃথিবীজুড়ে যে-লক্ষ-লক্ষ কুরআনের হাফেজ, এদের মাধ্যমে। এরা কুরআনের প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আগাগোড়া মুখস্থ করে রাখে। যদি কোনো দুর্যোগে কুরআনসহ পৃথিবীর সকল বই নষ্ট হয়ে যায় বা পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তবুও কুরআনকে হুবহু, ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড লিখে ফেলা সম্ভব। কারণ, পৃথিবীজুড়ে লক্ষ লক্ষ কুরআনের হাফেজ রয়েছে।
সঞ্জু আরেকবার সুবহানাল্লাহ বলে উঠল।
সাজিদ এবার থামল কিছুক্ষণ। রাত আরও গভীর হয়ে উঠেছে। সাদা মেঘের ছুটোছুটি বেড়ে গেছে আকাশে। দূর থেকে কিছু শিয়ালের আওয়াজ ভেসে আসছে কানে। হালকা শীত লাগছে গায়ে। দ্বিতীয়বারের মতো গলা খাঁকারি দিল সাজিদ। গলা খাঁকারি দিয়ে সে এবার আমার দিকে তাকাল। ভাবল আমি হয়তো এবারও অবজেকশান জানাব। আমাকে চুপচাপ দেখে সে আবার বলতে শুরু করল, আরবী ভাষার আরও অনেক চমৎকারিত্ব আছে, যা অন্য ভাষায় নেই।
যেমন?, জানতে চাইল রাহাত।
যেমন ধরা যাক, বাংলায় যদি আমরা বলি তারা যাচ্ছে, অথবা They are going, তখন আমরা বুঝতে পারি না যে—এই তারা বা They বলতে আসলে নারীকে বোঝানো হচ্ছে না পুরুষকে। কারণ, বাংলা বা ইংরেজিতে এই সর্বনামের জন্য কোনো আলাদা শব্দ নেই, যা দিয়ে এক শব্দেই বোঝানো যাবে যে, তারা বলতে আসলে নারীদের বোঝানো হচ্ছে না পুরুষকে; কিন্তু আরবীতে এই সমস্যা নেই। যেমন আরবীতে They শব্দটি যদি পুরুষের ক্ষেত্রে হয়, তখন শুধু Hum(৯) লিখলেই চলে। এই শব্দ থেকেই বুঝে ফেলা যায় যে, এখানে আসলে পুরুষদের বোঝানো হচ্ছে। আবার, They দিয়ে যদি নারীদের বোঝানো লাগে, তখন শুধু Hunna (2) বললেই হয়ে যায়। এখানে সহজেই বোঝা যায়—তারা বলতে নারীদের বোঝানো হচ্ছে।
জোবায়ের বলল, অ্যামেইজিং ফিচারস!
সাজিদ বলল, আরও চমৎকার জিনিস আছে। যেমন ধর Camel বা উট শব্দটি। নারী-উট বা পুরুষ-উট বোঝানোর জন্য ইংরেজিতে কিন্তু একক কোনো শব্দ নেই। যদি নারী-উট বোঝাতে হয় ইংরেজিতে কী বলতে হবে? বলতে হবে Female Camels, পুরুষ-উট বোঝাতে গেলে বলতে হবে Male Camels। কিন্তু আরবীতে পুরুষ-উট বোঝানোর জন্যে আলাদা শব্দ, নারী-উট বোঝানোর জন্যে আলাদা শব্দ রয়েছে। ইংরেজিতে Camel বলতে ইন জেনারেল সব ধরনের উটকেই বোঝানো হয়ে থাকে। আরবীতে ইন জেনারেল সব উটকে বোঝানোর জন্যেও শব্দ আছে। যেমন : Ibil (V) এই শব্দ ইংরেজি Camel শব্দের মতোই। এটার মধ্যে সব ক্যাটাগরির উটই অন্তর্ভুক্ত। আবার যদি ইংরেজিতে পুরুষ-উট বোঝাতে যাই, তখন কী বলতে হবে? তখন বলতে হবে Male Camels; কিন্তু আমি যদি আরবীতে পুরুষ-উট বোঝাতে চাই, আমাকে কিন্তু ইংরেজির মতো এত ঝামেলা পোহাতে হবে না। আমি স্রেফ একটি শব্দ দিয়েই কাজ সেরে ফেলতে পারব। যেমন-আমি যদি পুরুষ উটের কথা বলি, তখন খালি আরবী Jamal (641) শব্দটি বললেই হবে, ব্যস। এই শব্দ দিয়েই বোঝানো হয়ে গেছে—আমি পুরুষ উটের কথা বলছি।
