আমি বললাম, সাজিদ, তোর ব্যাপারে আমার কমন একটি অবজার্ভেশন হলো এই, তুই যখনই কোনো লম্বা বক্তৃতা শুরু করতে যাস, তখনই একবার গলা খাঁকারি দিয়ে এরপর শুরু করিস; কিন্তু আজকে আলাপের শুরুর দিকে তুই এরকম করিসনি। কেন করিসনি?
আমার প্রশ্ন শুনে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে জোবায়ের। সে মুখ হা করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে কমবোঝা লোক সঞ্জু সম্ভবত খুব মজা পেয়ে গেল। সে হো হো করে হেসে উঠল। হাসার সময় তার ফোকলা দাঁতগুলো দেখলে তাকে চকলেটে আসক্ত বাচ্চার মতো দেখায়। সাজিদ কিছু একটি বলতে যাচ্ছিল, তাকে থামিয়ে দিয়ে রাহাত বলল, দাঁড়া দাঁড়া। এটি তো ডাক্তারি ইস্যু। আমাকে কথা বলতে দে।
এরপর রাহাত আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আরিফ ভাই, সাজিদ কি এরকম সবসময়ই করে, নাকি শুধু কথা বলার সময়ই এমনটি করে?
সবসময় করে না। কথা বলার সময়েও করে না। তখনই করে, যখন ও বড় কোনো বক্তব্য দিতে যায়।
রাহাত বলল, হুম। বুঝতে পেরেছি। ও যদি এই জিনিসটি নিয়মিত করত তাহলে ধরে নেওয়া যেত—তার শুচিবায়ু রোগ আছে। যেহেতু নিয়মিত করে না, তাই এটি কোনো রোগ নয়; বরং এটি অভ্যাসের রোগ।
অভ্যাসের রোগ?, আমি প্রশ্ন করলাম।
সেটি আবার কীরকম?, প্রশ্ন সঞ্জুর।
রাহাত বলল, ব্যাপারটি সাইকোলজির। বিশেষ বিশেষ সময়ে কোনো কিছু করতে করতে একটি সময় জিনিসটি ওই ব্যক্তির সাইকোলজিতে এমনভাবে সেট হয়ে যায় যে, সে পরবর্তী সময়ে মনের অজান্তেই ওই জিনিস করে চলে। যেমন ধরা যাক, দাঁত দিয়ে হাতের নখ কাটা। এই ব্যাপারটি বেশির ভাগ লোকই মনের অজান্তেই করে। কারণ, কোনোকিছু নিয়ে গভীর চিন্তার সময়ে দাঁত দিয়ে নখ কাটতে কাটতে একটি সময়ে গিয়ে ব্যাপারটি তার অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়।
আমি বললাম, বাহ রাহাত ভাই। তোমার কাছ থেকে তো দারুণ দারুণ সব টার্মিনোলোজি শিখলাম। অভ্যাসের রোগ, অনিয়ন্ত্রিত অভ্যাস…হা…হা…হা…।
এবার মুখে ভেংচি কেটে জোবায়ের বলল, ফালতু কথাবার্তা। হাতুড়ি ডাক্তার হলে যা হয় আরকি।
জোবায়েরের কথা শুনে এবার আমি, সাজিদ আর সঞ্জু তিনজনই হেসে উঠলাম। বেচারা ইলুমিনাতির গল্প চালিয়ে যেতে না পারার শোধ কী সুন্দরভাবেই না তুলে নিল।
রাহাত ওর দিকে খটমটে চেহারায় তাকিয়ে আছে। সাজিদ বলল, বেশ ঝগড়া হয়েছে। এবার থামা যাক।
সাজিদের কথা শুনে সবাই আবার নড়েচড়ে বসল। রাহাত বলল, তো বল, কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হওয়ার পেছনে আর কী কী কারণ থাকতে পারে?
সাজিদ আবারও বলতে শুরু করল, ব্যাপারটি সহজে বোঝার জন্য আমাদের প্রথম যা বুঝতে হবে তা হলো, আরবী ভাষার অনন্যতা। যে-ভাষায় সৃষ্টিকর্তার বাণী প্রেরিত হবে, সেই ভাষা যদি যত্নের সাথে সংরক্ষণ করা না-হয়, তাহলে নিশ্চিতভাবে সেই ভাষার বিলুপ্তির সাথে সাথে সৃষ্টিকর্তার বাণীও বিলুপ্ত হয়ে যাবে অথবা বিকৃত হয়ে যাবে।
ভাষা বিলুপ্ত বা বিকৃত হতে পারে?, প্রশ্ন করল জোবায়ের।
অবশ্যই। হিব্রু ভাষার কথাই ধর। তাওরাতের মতো বিখ্যাত আসমানী কিতাব এই ভাষাতেই নাযিল হয়েছিল। অথচ কালের বিবর্তনে আজ হিব্রু ভাষা মৃত। মুসা আলাইহিস সালামের ওপরে তাওরাত নাযিল হয়েছিল আজ থেকে আরও তিন হাজার বছর আগে। অথচ ইতিহাস থেকে জানা যায়, হিব্রু ভাষার প্রথম শব্দকোষ তথা ডিকশনারিই লিখিত হয় মাত্র সেদিন। দশম শতাব্দীতে। চিন্তা করে দেখ, আজ থেকে তিন হাজার বছর আগে নাযিল হওয়া একটি কিতাবের ভাষা বোঝার ডিকশনারিই তৈরি হয়েছে মাত্র সেদিন। তাহলে মাঝখানের লম্বা টাইম-গ্যাপে যে-শব্দগুলো হারিয়ে গেছে, যে-শব্দগুলো কালের বিবর্তনে অর্থ বদলে ফেলেছে, সেগুলোর প্রকৃত অর্থ বের করার উপায় কী?
আমরা সবাই চুপ করে আছি। রাহাত বলল, শব্দ অর্থ বদলাতে পারে?
অবশ্যই পারে। যেমন ধর ইংরেজি ভাষার কথা। ইংরেজিতে Nice মানে কী বল।
জোবায়ের বলল, সুন্দর।
সাজিদ বলল, কিন্তু চতুর্দশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে এই Nice শব্দ দিয়ে কী অর্থ করা হতো জানিস?
কী?, সঞ্জু জানতে চাইল।
এই Nice শব্দটি লাতিন Nescius শব্দ থেকে এসেছে। চতুর্দশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে এই Nice শব্দের অর্থ করা হতো Ignorant বা মূর্খ বোঝাতে।
কালক্রমে Shyness, Resreve অর্থেও ব্যবহার করা হয় এই Nice শব্দটি।
সঞ্জু অবাক হয়ে বলল, বলিস কী!
হুম। এরপর অষ্টাদশ শতাব্দীর দিকে এসেই এই Nice শব্দ আজকের সুন্দর সুশ্রী অর্থ লাভ করে। চিন্তা করে দেখ, ভাষা কীভাবে পাল্টে যেতে পারে। কুরআন যদি হিব্রু ভাষাতে নাযিল হতো, তাহলে কী অবস্থা হতে আর যদি ইংরেজিতে হতো তাহলে কী হতো ভেবে দেখ।
রাহাত বলল, সত্যিই!
কিন্তু আরবী ভাষার ক্ষেত্রে কি এরকমটি হয়েছে সাজিদ?, জানতে চাইল জোবায়ের।
না। আরবী ভাষার ক্ষেত্রে এরকমটি হয়নি মোটেও। বলা চলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন একটি জাতির কাছে এবং এমন একটি ভাষায় কুরআন দেওয়া হয়েছে, যারা তৎকালীন সময়ে সাহিত্যে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। সে সময়ে পৃথিবীতে সাহিত্যের জীবন্ত ভাষাই ছিল আরবী। আরবরা কবিতা, সাহিত্যে এত বেশিই দক্ষ আর মুন্সিয়ানার অধিকারী ছিল যে, সমসাময়িক কোনো জাতিই সাহিত্যে এতটি অগ্রগতি লাভ করেনি। কুরআনকে সর্বোচ্চ এবং শ্রেষ্ঠ সাহিত্যমান দিয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপরে একটি মিরাকল হিশেবে পাঠিয়েছিলেন। এর প্রমাণ আমরা কুরআন থেকেই পাই।
