সাজিদ বলল, আয়াতের অর্থগুলোর দিকে খেয়াল করলেই বুঝতে পারবি। প্রথম তিনটি আয়াতে কী বলা হচ্ছে দেখে নিই। প্রথম আয়াতে বলা হচ্ছে, যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি জগৎসমূহের অধিপতি।
দ্বিতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে, যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু।
তৃতীয় আয়াতে বলা হচ্ছে, যিনি বিচারদিনের মালিক।
এই তিন আয়াত প্রথম ভাগে। চতুর্থ আয়াতে বলা হচ্ছে, আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। এটি কিন্তু মাঝের আয়াত। এটি কোনো ভাগেই পড়বে না। এটিকে কেন্দ্রবিন্দু বলা যেতে পারে। এই আয়াত দিয়েই আমরা প্রথম ভাগ আর পরের ভাগকে যাচাই করব।
আমাদের মাঝে পিনপতন নীরবতা। সেই নীরবতা ভেঙে সাজিদ আবার বলতে লাগল, পরের ভাগের আয়াতগুলোতে কী বলা হচ্ছে দেখ।
পঞ্চম আয়াতে বলা হচ্ছে, আমাদের সরলপথে পরিচালিত করুন।
ষষ্ঠ আয়াতে বলা হচ্ছে, ওই সব লোকদের পথে, যাদের আপনি নিয়ামত দান করেছেন।
সপ্তম আয়াতে বলা হচ্ছে, তাদের পথ নয়, যাদের ওপর আপনার অভিশাপ নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট।
এবার আমরা সিকোয়েন্সটি মিলাতে পারি। প্রথম ভাগের আয়াতগুলো এক জায়গায় নিয়ে আসা যাক। প্রথম অংশের আয়াতগুলো হলো—
যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি জগৎসমূহের অধিপতি।
যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু।
যিনি বিচারদিনের মালিক।
মাঝখানে আছে আমরা তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি। আর, পরের অংশে আছে :
আমাদের সরলপথে পরিচালিত করুন।
ওই সব লোকদের পথে, যাদের আপনি নিয়ামত দান করেছেন।
তাদের পথ নয়, যাদের ওপর আপনার অভিশাপ নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট।
আমরা সকলে গভীর মনোযোগের সাথে সাজিদের কথাগুলো শুনছি। সে বলতে লাগল, মাঝখানের, অর্থাৎ চার নম্বর আয়াতে দুটো অংশ আছে। আমরা তোমারই ইবাদত করি এতটুকু একটি অংশ, এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি এতটুকু একটি অংশ। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, এই আয়াতের প্রথম অংশ সূরার প্রথম তিন আয়াতের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং পরের অংশ প্রতিনিধিত্ব করছে সূরার পরের তিন আয়াতের। এই আয়াতের প্রথম অংশ দিয়ে ওপরের তিন আয়াতকে যাচাই করা যাক :
আমরা তোমারই ইবাদত করি।
আমরা কার ইবাদত করি?
সকল প্রশংসা যার এবং যিনিই সৃষ্টিজগতের অধিপতি। [সূরা ফাতিহার ১ম আয়াত]
আমরা কার ইবাদত করি?
যিনি পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু [সূরা ফাতিহার ২য় আয়াত]
আমরা কার ইবাদত করি?
যিনি বিচারদিনের মালিক।[সূরা ফাতিহার ৩য় আয়াত]
দারুণ তো!, বলে উঠল জোবায়ের।
এবার আসা যাক ওই আয়াতের পরের অংশে। যেখানে বলা হচ্ছে—
তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি।
আমরা কীসের জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করি?
যাতে আমরা সরল পথে চলতে পারি।[সূরা ফাতিহার ৫ম আয়াত]
আমরা কীসের জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করি?
যাতে আমরা নিয়ামতপ্রাপ্তদের দলে ভিড়তে পারি। [সূরা ফাতিহার ৬ষ্ঠ আয়াত]
আমরা কীসের জন্যে সাহায্য প্রার্থনা করি?
যাতে আমরা অভিশপ্ত এবং পথভ্রষ্টদের দলের অন্তর্ভুনাই। [সূরা ফাতিহার৭মআয়াত]
চিন্তা কর, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই ছোট্ট সূরাটার মধ্যেও কীরকম ভাষার মান, সাহিত্য মান দিয়ে দিয়েছেন। প্রথমে কিছু কথা, মাঝখানে একটি বাক্য, শেষে আরও কিছু কথা; কিন্তু মাঝখানের সেই বাক্যটিকে এমনভাবে সাজিয়েছেন এবং এমনভাবে বলেছেন, যেটি প্রথম এবং শেষ—দুটো অংশের সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, যারা বলে কুরআন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বানিয়ে লিখেছেন, তারাও স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, এতটা সূক্ষ্মভাবে, এতটা সাহিত্যমান দিয়ে কোনোকিছু লেখা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। আরও ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এই আয়াতগুলো একই সাথে নাযিল হওয়া। একটির পর একটি, বিরতিহীন। পৃথিবীর কোনো মানুষ যদি ইনসট্যান্ট কিছু রচনা করে, তার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয় যে, কুরআনের মতো এরকম সিস্টেম্যাটিক পদ্ধতিতে কোনো কিছু লিখবে।
ওয়াও! দ্যাটস অ্যামেইজিং!, চিৎকার করে বলে উঠল রাহাত। সহজে কোনো কিছু বুঝতে না পারা সঞ্জুও এবার ব্যাপারটি বুঝে গেছে। সেও বলে উঠল, সত্যিই দারুণ! এরকমভাবে কখনো ভেবে দেখিনি। জোবায়ের বলল, সিম্পলি গ্রেট! এটি নিশ্চিত মিরাকল।
আমি একটি ব্যাপার ভাবতে লাগলাম। সূরা ফাতিহা এর-আগে অনেকবার আমি পড়েছি; কিন্তু এত সহজ অথচ আশ্চর্যজনক এই ব্যাপারটি কখনো আমার মাথায় আসেনি কেন!
আমাদের ভাবনায় ছেদ ঘটিয়ে রাহাত বলল, এটি কেবল আরবী ভাষাতেই সম্ভব। এ জন্যেই বোধকরি কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে, তাই নারে সাজিদ?
সাজিদ বলল, কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হওয়ার এটি একটি কারণ। তবে এর পেছনে আরও অনেক কারণ আছে।
যেমন?, প্রশ্ন করল রাহাত।
এবার সামান্য গলা খাঁকারি দিল সাজিদ। এরপর যখনই সে তার পরবর্তী লেকচার শুরু করতে যাবে, অমনি আমি হাত তুলে বললাম, আমার একটি কোয়েশ্চান আছে।
এতক্ষণ ধরে সাজিদের দিকে চেয়ে থাকা বড় বড় চোখগুলো এবার সম্মিলিতভাবে আমার ওপরে এসে পড়ল। আমি কী প্রশ্ন করব সেটি শোনার জন্যে সবাই যেন ব্যাকুল হয়ে উঠেছে।
