ছেলেটা কাচুমাচু করে দ্বিতীয় প্রশ্ন করল ।
আরজ আলী মাতব্বর বলেছেন, -‘আল্লাহ পরীক্ষাটা করেছেন ইব্রাহিমকে। ইব্রাহিম এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেই পরীক্ষাটা কেন তার অনুসারীদের দিতে হবে?’
সাজিদ বললো, -‘এইটা খুব ভালো প্রশ্ন। আমরা মুহাম্মদ সা. কে অনুসরন করি। তাহলে আমরা কি বলতে পারি যে, -কই আমাদের উপর তো জিবরাঈল আঃ ওহী নিয়ে কখনো আসে নাই। তাহলে মোহাম্মদের উপর আসা ওহী আমরা কেন মানতে যাবো? বলো প্রশ্নটা কি আমরা করতে পারি?’
ছেলেটা চুপ করে আছে। সাজিদ বলল, -‘আরজ আলী মাতুব্বরের Leader & Leadership আদতে কোন জ্ঞানই ছিল না। তাই তিনি এরকম প্রশ্ন করে নিজেকে সক্রেটিস বানাতে চেয়েছিলেন।
ছেলেটা তার তৃতীয় প্রশ্ন করল-
‘আরজ আলী মাতুব্বর বলেছেন, -নবী ইব্রাহিমকে তো কেবল ইসমাইলকে কুরবানী করা সংক্রান্ত পরীক্ষাই দিতে হয়নি, অগ্নিকুন্ডে নিক্ষিপ্ত হবার মতো কঠিন পরীক্ষাও তাকে দিতে হয়েছিল। তাহলে মুসলমানরা ইব্রাহিমের স্মৃতি ধরে রাখতে পশু কোরবানি করলেও ইব্রাহিমের আর একটি পরীক্ষা মতে -মুসলমানরা নিজেদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে না কেন?’
আরজ আলী মাতুব্বরের আগের প্রশ্নগুলো আমার কাছে শিশুসুলভ মনে হলেও, এই প্রশ্নটিকে অনেক ম্যাচিউর মনে হল। আসলেই তো। দুটোই ইব্রাহিম আঃ এর জন্য পরীক্ষা ছিল। তাহলে, একটি পরীক্ষা স্মৃতি ধরে রাখতে আমরা যদি পশু কুরবানী করি, তাহলে নিজেদের অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করি না কেন?
পদ্মা থেকে সাঁ সাঁ শব্দে বাতাস আসতে শুরু করেছে।
সাজিদ বলল, -‘রফিক, তার আগে তুমি আমার একটি প্রশ্ন উত্তর দাও। তুমি কি শেখ মুজিবকে ভালোবাসো? তার আদর্শকে?’
ছেলেটা বলল, -‘অবশ্যই। তিনি না হলে তো বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকত না। তিনি আমাদের জাতির পিতা।’
-‘তুমি ঠিক বলেছ। শেখ মুজিব না হলে বাংলাদেশে হয়তো কোনদিনই স্বাধীন হত না । সে যাহোক, শেখ মুজিবকে জীবনের দুটি বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
প্রথমে, একটা দেশকে স্বাধীন করার লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া।
দ্বিতীয়ত, সপরিবারে খুন হওয়া। আমি কি ঠিক বললাম না রফিক?’
-‘হু’
-‘এখন, তুমি শেখ মুজিবের আদর্শ বুকে ধারণ কর। তুমি একাত্তরের চেতনায় নিজেকে বুলিয়ান ভাবো। তুমি ৭ ই মার্চের বিশাল মিছিলে যোগদান করো। ১৬ ই ডিসেম্বর সভা-সমাবেশে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে স্লোগান দাও। কিন্তু, ১৫ই আগস্টে রাস্তায় বেরিয়ে কোনদিন বলেছ, হে মেজর ডালিম এর বংশধর, হে খন্দকার মোশতাকের বংশধর, তোমরা কে কোথায় আছো, এসে আমাকেও মুজিবের মত সপরিবারে খুন করো। বলো কি?’
আমি সাজিদের কথা শুনে হো হো হো করে হাসা শুরু করলাম। ছেলেতার২ মুখ তখন একেবারে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সাজিদ আবার বলতে শুরু করল, -‘তুমি এটা বলো না। শেখ মুজিবের আদর্শ বুকে ধারণ করে এরকম কেউই এটা বলবে না। যদি কেউ এরকম বলে, তাহলে তাকে মানুষ বলবে, -কি ব্যাপার? লোকটাকে কি ভাদ্র মাসের কুকুরে কামড়িয়েছে নাকি?’
সাজিদের কথা শুনে রফিকের বাবাও হা হা হা করে হাসতে লাগলো। ছেলেকে পরাজিত হতে দেখে পৃথিবীর কোন বাবা এত খুশি হতে পারে, এই দৃশ্য না দেখলে বুঝতামই না।
আমরা রসুলপুরের দিকে হাটা ধরলাম। পদ্মা পাড়ের জনবসতিগুলো দেখতে একেবারে ছবির মতো। নিজেকে তখন হোসেন মিয়ার ময়না দ্বীপের বাসিন্দা মনে হচ্ছিলো। আর সাজিদ? তাকে আপাতত হোসেন মিয়া রূপেই ভাবতে পারেন।
তাকদির বনাম স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি – স্রষ্টা কি এখানে বিতর্কিত?
সাজিদের ব্যাগে ইয়া মোটা ডায়েরি থাকে সবসময় ডায়েরিটা প্রাগঐতিহাসিক আমলের কোন নিদর্শনের মত । জায়গায় জায়গায় ছেড়া । ছেড়া জায়গার কোনটাতে সুতো দিয়ে সেলাই করা, কোন জায়গায় আটা দিয়ে প্রলেপ লাগান, কোন জায়গায় ট্যাপ করা ।
এই ডায়েরিতে সে তার জীবনের নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো লিখে রাখে । এই ডায়েরির কোন এক মাঝামাঝি জায়গায় সাজিদ আমার সাথে প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটিও লিখে রেখেছে । তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় টি.এস.সি তে ।
সে আমার সম্পর্কে লিখে রেখেছে, –
‘ভ্যাবলা টাইপের একটা ছেলের সাথে সাক্ষাৎ হল আজ । দেখলেই মনে হবে, জগতের কঠিন বিষয়ের কোন কিছুই সে বুঝে না । কথা বলার পর বুঝলাম, এই ছেলে অত্যন্ত বুদ্ধিমান, কিন্তু বোকা । ছেলেটির নাম- আরিফ । ‘
নিচে তারিখ দেওয়া –’০৫/০৩/০৯
এই ডায়েরিতে নানান বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথাও লেখা আছে ।
একবার কানাডার টরেন্টোতে সাজিদ তার বাবার সাথে একটি অফিসিয়াল ট্যুরে গিয়েছিল । সেখানে অনেক সেলেব্রিটির সাথে বিল গেটসও আমন্ত্রিত ছিলেন । বিল গেটস সেখানে দশ মিনিটের জন্য বক্তৃতা রেখেছিলেন । সে ঘটনাটি লেখা । জাফর ইকবালের সাথে সাজিদের একবার বইমেলায় দেখা হয়ে যায় । সেবারের বই মেলায় জাফর স্যারের বই’একটুখানি বিজ্ঞান’ এর দ্বিতীয় কিস্তি’আরো একটুখানি বিজ্ঞান’ প্রকাশিত হয় । সাজিদ জাফর স্যারের বই কিনে বের হওয়ার পথে জাফর স্যারের সাথে তার দেখা হয়ে যায় । সাজিদ স্যারের একটি অটোগ্রাফ নিয়ে, স্যারের কাছে হেসে জানতে চাইলো,’স্যার,’একটুখানি বিজ্ঞান’ পাইলাম । এরপর পাইলাম’আরো একটুখানি বিজ্ঞান’ । এটার পরে’আরো আরো একটুখানি বিজ্ঞান’ কবে পাচ্ছি ?’
