সাজিদ আমার দিকে ফিরে বললো, -‘দেখছিস, মেঘনার এত বড় বুকেও কিন্তু নাস্তিকদের বসবাস আছে। হা হা হা।
সিদ্ধান্ত হলো ছেলেটার সাথে দেখা করে যাব।
সকাল ন’টায় ছেলেটার সাথে আমরা দেখা হল। বয়সে আমাদের চেয়ে ছোট হবে। জিজ্ঞেস করে জানলাম, ছেলেটা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয় নিয়ে পড়ছে। ফার্স্ট ইয়ারে। নাম মোঃ রফিক।
সাজিদ রফিক নামের ছেলেটির কাছে জিজ্ঞেস করল, -‘কোরবানি নিয়ে তোমার প্রশ্ন কি?’
ছেলেটা বলল, -‘এইটা একটা কুপ্রথা। এভাবে পশু হত্যা করে উৎসব করার কোন মানে হয়?’
সাজিদ বলল, -‘তুমি কি বিজ্ঞান সম্পর্কে কিছু জানো?’
ছেলেটি চোখ বড় বড় করে বলল, -‘আপনি কি আমাকে বিজ্ঞান শিখেচ্ছেন নাকি? ইন্টারমিডিয়েট লেবেল পর্যন্ত আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম।’
-‘তা বেশ। খাদ্য শৃংখল সম্পর্কে নিশ্চয়ই জানো?’
-‘জানি। জানবো না কেন?’
-‘খাদ্য শৃংখল হলো, প্রকৃতিতে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মধ্যকার একটি খাদ্য জাল। যেসব উদ্ভিদ সূর্যের আলো ব্যবহার করে নিজের খাদ্য নিজে তৈরি করে নেয় তাদের বলা হয় উৎপাদক। এই উৎপাদককে বা উদ্ভিদকে যারা খায়, তারা হচ্ছে প্রথম শ্রেণীর খাদক…..’
ছেলেটা বলল, -‘মশাই, এসব আমি জানি। আপনার আসল কথা বলুন।’
ছেলেটার কথার মধ্যে কোন রকম আঞ্চলিকতার টান নেই। তাই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।
পাশ থেকে ছেলেটার বাবা বলে উঠলেন, -‘এ, হেরা বয়সে কোলাং তোর চাইয়া বড় অইবে। মান ইজ্জত দিয়া কথা কইতে পারো না?’
ছেলেটা তার বাবার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। সে দৃষ্টিতে পড়াশোনা জানা ছেলেদের মূর্খ বাবার প্রতি অবজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট।
সাজিদ বলল, -‘ বেশ ! তোমাদের গরু আছে?’
-‘আছে’
-‘কয়টা?’
ছেলেটার বাবা বললেন, -‘হ বাপ। মোগো গরু আছে পাচ খান। দুইডা গাই, এক্কুয়া ষাঁড় গরু। লগে আবার বাছুরও আছে দুইডা।
-‘আচ্ছা রফিক, ধরো-তোমাদের যে দুটি গাভী আছে, তাদের এই দুটি করে বাচ্চা দিল। তাহলে তোমাদের মোট গরুর সংখ্যা হবে নয়টি। ধরো, তোমরা পশু হত্যায় বিশ্বাসী নও। তাই তোমরা গরুগুলো বিক্রিও করো না। কারণ, তোমরা জানো বিক্রি হলে গরুগুলো কোথাও না কোথাও কুরবানী হবেই। ধরো, এরপরের বছর গরু গুলো আরো দুটি করে বাচ্চা দিল। মোট গুরু তখন ১৩ টি। এর পরের বছর দেখা গেল, বাছুরগুলোর মধ্যে থেকে দুটি গাভী হয়ে উঠল, যারা বাচ্চা দিবে। এখন মোট গাভীর সংখ্যা চারটি। ধরো, চারটি গাভী এর পরের বছর আরো দুটি করে বাচ্চা দিবে। তাহলে সে বছর তোমাদের মোট গরুর সংখ্যা কত দাড়ালো?’
ছেলেটির বাবা আঙুল হিসাব কষে বললেন, -‘হ, ১৯ টা অইবে।’
সাজিদ বলল, -‘বলতো রফিক, ১৯ টা গরু রাখার মত জায়গা তোমাদের আছে কিনা? ১৯ টা গরুকে খাওয়ানোর মতো সামর্থ্য, পর্যাপ্ত ভুসি, খই, ঘাস আছে কি না তোমাদের?’
-‘না’ -ছেলেটা বলল।
-‘তাহলে আলটিমেটলি তোমাদের কিছু গরু বিক্রি করে দিতে হবে। এদের যারা কিনবে, তারা তো গরু কিনে গুদামে ভরবে না। তাই না? তারা গরু গুলোকে জবাই করে মাংস বিক্রি করবে। গরুর মাংস আমিষের চাহিদা পূরণ করবে আর চামড়াগুলো শিল্পের জন্য কাজে লাগবে। তাই না?’
-‘হুম’
-‘এটা হল প্রকৃতির ব্যালেন্স। তাহলে, প্রকৃতির ব্যালেন্স ঠিক রাখার জন্য পশুগুলোকে জবাই করতেই হচ্ছে। সেটা এমনি হোক অথবা কোরবানে।’
ছেলেটা বলল, -‘সেটা নিয়ে তো আপত্তি নেই। আপত্তি হচ্ছে, এটাকে ঘিরে উৎসব হবে কেন?’
সাজিদ বলল, -‘বেশ ! উৎসব বলতে তুমি হয়তো মীন করছো, যেখানে নাচ গান হয়, ফুর্তি হয়, আড্ডা, ড্রিঙ্কস হয়। মিছিল হয়, শোভাযাত্রা হয়, তাই না? কিন্তু দেখো, মুসলমানদের এই উৎসব সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে নাচ গান নেই, আড্ডা মাস্তি নেই। ড্রিঙ্কস নেই, মিছিল শোভাযাত্রা নেই। আছে ত্যাগ আর তাকওয়ার পরীক্ষা। আছে, অসহায়ের মুখে হাসি ফোটানো প্রাণান্তকর চেষ্টা। শ্রেণি বৈষম্য দূর করে, সবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়। এরকম উৎসবে সম্ভবত কারো দ্বিমত থাকার কথা না। কার্ল মাক্সকে চেনো?’
ছেলেটা এরপর কিছুক্ষন চুপ করেছিল। তারপর বলল, -‘আরজ আলী মাতুব্বরকে চিনেনে আপনি?’
সাজিদ বলল, -‘হ্যাঁ, চিনি তো’
-‘কোরবানি নিয়ে উনার কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন আছে।’
-‘কি প্রশ্ন বলো।’
ছেলেটা প্রথম প্রশ্নটি বলল। সেটি ছিল –
‘আল্লাহ ইব্রাহিম এর কাছে তার সব চাইতে প্রিয় বস্তুর উৎসর্গের আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু ইব্রাহিম এর কাছে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু তার ছেলে ইসমাইল না হয়ে, তার নিজ প্রান কেন হল না?’
সাজিদ মুচকি হেসে বললো, -‘খুবই লজিক্যাল প্রশ্ন বটে।’
-‘আমি যদি আরজ আলী মাতব্বরের সাক্ষাৎ পেতাম, তাহলে জিজ্ঞেস করতাম বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছে, তাদের কাছে তাদের নিজের প্রানের চেয়ে দেশটা কেন বেশি প্রিয় হলো? কেন দেশরক্ষার জন্য নিজেদের প্রাণটাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল?
দুটো জিনিসই সেইম ব্যাপার। ইব্রাহীমের কাছে নিজের চেয়েও প্রিয় ছিল পুত্রের প্রাণ, আর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে নিজের প্রানের চেয়ে প্রিয় ছিল নিজের মাতৃভূমি।
কিন্তু পরীক্ষার ধরন ছিল আলাদা। ইব্রাহিমকে বলা হলো, প্রিয় জিনিস কোরবানি করতে, আর মুক্তিযোদ্ধাদের বলা হলো প্রিয় জিনিস রক্ষা করতে। কিন্তু, আমরা দেখতে পেলাম দুজনের কারো কাছেই প্রিয় বস্তু নিজের প্রান নয়। সুতরাং আরজ আলী মাতব্বরের মাতব্বরিটা এখানে ভুল প্রমাণিত হলো।’
