সেদিন নাকি জাফর স্যার মিষ্টি হেসে বলেছিলেন, -‘পাবে’
নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই ঠাই পেয়েছে সাজিদের ডাইরিতে ।
সাজিদের ডায়েরির আদ্যোপান্ত আমার পড়া ছিল । কিন্তু, সেমিস্টার ফাইনাল সামনে চলে গত বেশ কিছুদিন তার ডায়েরিটা আমার আর পড়া হয়নি । অবশ্য ডায়েরিটা আমি লুকিয়ে লুকিয়েই পড়ি ।
সেদিন থার্ড সেমিস্টারের শেষ পরিক্ষাটি দিয়ে রুমে আসলাম । এসে দেখি সাজিদ ঘরে নেই । তার টেবিলের উপর তার ডায়েরিটা পড়ে আছে খোলা অবস্থায় ।
ঘর্মাক্ত শরীর । কাঠ ফাটা রোদের মধ্যে ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে বাসায় ফিরেছি । এই মুহূর্তে বসে ডায়েরিটা উলটবো, সে শক্তি বাঁ ইচ্ছা কোনটাই নেই । কিন্তু ডায়েরিটা বন্ধ করতে গিয়ে একটি শিরোনাম আমার চোখে আটকে যায় । আমি সাজিদের টেবিলেই বসে পড়ি । লেখাটির শিরোনাম ছিল –
‘ভাগ্য বনাম স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি –স্রষ্টা কি এখানে বিতর্কিত ?’
বেশ লোভনীয় শিরোনাম । শারিরিক ক্লান্ত ভুলেই আমি ঘটনাটির প্রথম থেকে পড়া শুরু করলাম । ঘটনাটি সাজিদের ডায়েরিতে যেভাবে লেখা, ঠিক সেভাবেই আমি পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি, –
‘কয়েকদিন আগে ক্লাসের থার্ড পিরিয়ডের মফিজুর রহমান স্যার এসে আমাকে দাড় করালেন । বললেন, -‘তুমি ভাগ্যে, আই মিন তাকদিরে বিশ্বাস কর ?’
আমি আচমকা অবাক হলাম । আসলে এই আলাপগুলো হল ধর্মীয় আলাপ । মাইক্রোবায়োলজির একজন শিক্ষক যখন ক্লাসে এসে এসব জিজ্ঞস করে, তখন খানিকটা বিব্রতবোধ করাটাই স্বাভাবিক । স্যার আমার উত্তরের আশায় আমার মুখের দিকে চেয়ে আছেন । আমি বললাম,’জি স্যার । এজ এ মুসলিম আমি তকদিরে বিশ্বাস করি । এটি আমার ইমানের মূল সাতটি বিষয়ের মধ্যে একটি । ‘
স্যার বললেন,’তুমি কি বিশ্বাস করো যে, মানুষ জিবনে যা যা করবে তার সবকিছুই তার জম্মের অনেক অনেক বছর আগে তার তাকদিরে লিখে দেওয়া হয়েছে ?’
-‘জি, স্যার’ আমি উত্তর দিলাম ।
–’বলা হয়, স্রষ্টার ইচ্ছা শক্তি ছাড়া গাছের একটি ক্ষুদ্র পাতাও নড়ে না, তাই না ?’
-‘জি, স্যার’
-‘ধরো, আজ সকালে আমি একজন লোককে খুন করলাম । এটা কি আমার তকদিরে পূর্বে নির্ধারিত ছিল না ?’
-‘জি, ছিল’
-‘আমার তাকদির যখন লেখা হচ্ছিলো, তখন কি আমি জীবিত ছিলাম ?’
-‘না, ছিলেন না । ‘
-‘আমার তাকদির কে লিখেছে ? বাঁ কার নির্দেশে লিখিত হয়েছে ?’
-‘স্রষ্টার । ‘
-‘তাহলে, সোজা এবং সরল লজিক এটাই বলে –’আজ সকালে যে খুনটি আমি করেছি, সেটি মূলত আমি করি নি । আমি এখানে একটি রোবটমাত্র । আমার ভেতরে একটা প্রোগ্রাম সেট করে দিয়েছেন স্রষ্টা । সেই প্রোগ্রামে লেখা ছিল যে, আজ সকালে আমি একজন লোককে খুন করবো । সুতরাং, আমি ঠিক তাই করেছি, যা আমার স্রষ্টা পূর্বে ঠিক করে রেখেছেন । এতে আমার কোন হাত নেই । ডু ইউ এগ্রি, সাজিদ ?’
-‘কিছুটা’ -আমি উত্তর দিলাম ।
স্যার এবার হাসলেন । হেসে বললেন, -‘আমি জানতাম তুমি কিছুটাই একমত হবে, পুরোটা নয় । এখন তুমি আমাকে নিশ্চয়ই যুক্তি দেখিয়ে বলবে, -স্যার, স্রষ্টা আমাদের একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন । আমরা এটা দিয়ে ভাল মন্দ বিচার করে চলি, রাইট ?’
-‘জি, স্যার’
-‘কিন্তু, সাজিদ, এটা খুব লেইম লজিক, ইউ নো ? ধরো, আমি তোমার হাতে একটি বাজারের লিস্ট দিলাম । লিস্টে যা যা কিনতে হবে, তার সব কিছু লেখা আছে । এখন তুমি বাজার করে ফিরলে । তুমি ঠিক তাই কিনলে যা আমি লিস্টে লিখে দিয়েছে । এবং এটা করতে বাধ্য । ‘
এতটুকু বলে স্যার আমার কাছে জানতে চাইলেন,’বুঝতে পারছ ?’
আমি বললাম,’জি, স্যার’
-‘ভেরি গুড । ধরো, তুমি বাজার করে আসার পর, একজন জিজ্ঞেস করলো, সাজিদ কি কি বাজার করেছ ? তখন আমি উত্তর দিলাম, -‘ওর যা যা খেতে মন চেয়েছে, তা-ই তা-ই কিনেছে’, তাহলে এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা, না ?’
-‘জি, স্যার’
-‘ঠিক স্রষ্টাও এভাবে মিথ্যা বলেছেন । দুই নাম্বারি করেছেন । তিনি অনেক আগে আমাদের তাকদির লিখে তা আমাদের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন । এখন আমরা সেটাই করি, যা স্রষ্টা সেখানে লিখে রেখেছেন । আবার, এট দ্যা এন্ড অফ দ্যা ডে, এই কাজের জন্য কেউ জান্নাতে যাচ্ছে, কেউ জাহান্নামে । কিন্তু কেন ? এখানে মানুষের তো কোন হাত নেই । ম্যানুয়ালটা স্রষ্টার তৈরি । আমরা তো জাস্ট পারফর্মার । স্ক্রিপ্ট রাইটার তো স্রষ্টা । স্রষ্টা এর জন্য আমাদের কাউকে জান্নাত, কাউকে জাহান্নাম দিতে পারেন না । যুক্তি তাই বলে, ঠিক ?’
আমি চুপ রইলাম । পুরো ক্লাসে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে তখন । স্যার বললেন,’হ্যাভ ইউ এনি প্রপার লজিক অন দ্যাট ক্রিটিক্যাল কোয়েশ্চান, ডিয়ার ?’
আমি কিছুক্ষন চুপ করে থাকলাম ।
স্যার মুচকি হাসলেন । মনে হল – উনি ধরেই নিয়েছেন যে, উনি সত্যি সত্যিই আমাকে কুপকাত করে দিয়েছেন । বিজয়ের হাসি।
আমাকে যারা চিনে তারা জানে, আমি কখন কারো প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় নিই না। আজকে যেহেতু তার ব্যাতিক্রম ঘটলো, আমার বন্ধুরা আমার দিকে ড্যাব ড্যাব চোখ করে তাকালো । তাদের চাহনি দেখে মনে হচ্ছিলো, এই সাজিদকে তারা চিনেই না । কোন দিন দেখেই নি ।
আর, ক্লাসে আমার বিরুদ্ধ মতের যারা আছে, তাদের চেহারা তখন মুহূর্তেই উজ্জ্বল বর্ণ ধারন করলো । তারা হয়তো মনে মনে বলতে লাগলো, -‘মৌল্লার দৌড় ওই মসজিদ পর্যন্তই । হা – হা –হা’
