লঞ্চে আমরা তিনজন মাত্র মানুষ। আমি, সাজিদ এবং একজন চালক। মধ্যবয়স্ক এই লোকটার নাম মহব্বত আলী। যারা নৌকা চালায় তাদের মাঝি বলা হয়, যারা জাহাজ চালায় তাদের বলে নাবিক। যারা লঞ্চ চালায় তাদের কি বলে? আমি জানিনা। মহব্বত আলীর নামের এই লোক লঞ্চের এক মাথায় জড়সড় হয়ে বসে বসে ঝিমুচ্ছে। মাঝিদের মতো তার বৈঠা চালানোর চিন্তা নেই। তেলের ইঞ্জিন।
আমি আর সাজিদ মঞ্চের একেবারে মাঝখানে বসে আছি। একটি চাদর পাতা হয়েছে। সাথে আছে পানির বোতল, চিনা বাদাম, ভাজা মুড়ি।
মাথার উপরে আকাশ।
হঠাৎ করে আমার তখন মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসটির কথা মনে পড়ে গেল। আমি সাজিদ কে প্রশ্ন করলাম, -‘তুই কি মানিক দার ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ পড়েছিস?’
সাজিদ বলল, -‘হু’
আমিও কতবার পড়েছি এই উপন্যাস। সব চরিত্র গুলোর নাম আমার ঠিক মনে নেই। তবে উপন্যাসের নায়কের বউটা লেংড়া ছিল এবং নায়কের সাথে তার শালিকার প্রেম ছিল। এই ঘটনা গুলো আবছা আবছা মনে করতে পারি।
সাজিদ আমাকে বলল, -‘হঠাৎ উপন্যাসে চলে গেলি কেন?’
-‘না, এমনি।’
এইটুকু বলে দুজনে খানিকক্ষণ চুপচাপ ছিলাম। এরপর আমি জিজ্ঞেস করলাম, – ‘আচ্ছা ঐ উপন্যাসের কোন চরিত্রটি তোর কাছে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং লেগেছে?’
আমি ভাবলাম, সাজিদ হয় উপন্যাসের নায়ক কিংবা নায়কের শ্যালিকার কথাই বলবে। কিন্তু সাজিদ বলল, -‘ওই উপন্যাসে ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার আছে কেবল একটাই। সেটি হল হোসেন মিয়া।’
আমি খানিকটা অবাক হলাম। অবাক হলাম কারণ সাজিদ এই প্রশ্নের উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও ভাবেনি। আগে পড়া একটি উপন্যাস থেকে সে এমন একটি ক্যারেক্টার নাম বলছে যেটি উপন্যাসটির কোন মূল চরিত্রের মধ্যেই পড়ে না। হোসেন মিয়া নামে এই উপন্যাসে কোন চরিত্র আছে, সেটি আমি ভুলেই গিয়েছিলাম।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, -‘হোসেন মিয়া? নায়কটা নয় কেন?’
সাজিদ বলল, -‘কুবের মাঝির মতো কত কত শত মাঝি পদ্মা পারে অহরহ দেখা যায়, যাদের ঘরে মালার মতো একটি খোঁড়া পা ওয়ালা কিংবা অন্ধ স্ত্রী আছে, আছে তিন-চারটে করে পেটুক সন্তান, আছে কপিলার মত সুন্দরী শালীকা। তাদের মাঝেও পরকীয়া আছে, দৈহিক সম্পর্ক আছে। কিন্তু হোসেন মিয়া হোসেন মিয়ার মতো কোন চরিত্রে আছে এই পদ্মা পারে? যে কিনা নিজের মত করে একটি দ্বীপ সাজিয়ে তুলে সেখানে মানুষকে বিনা পয়সায় থাকতে দেয়। আছে?কি বাস্তবে, কি সাহিত্যে………’
আমি আরো একবার সাজিদের সাহিত্য জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হলাম। সে এমনভাবে চরিত্রগুলোর নাম বলে গেল যেন, সে এইমাত্র উপন্যাসটি পড়ে শেষ করেছে।
আমরা রসুলপুরে পৌঁছাযই সাড়ে চারটেতে তখন কিছু কিছু জায়গার ফজরের আজান পড়েছে। যেখানে নেমেছি সেখান থেকে বেশ কিছু পথ হাঁটতে হবে।
খানিকটা হেঁটে একটা মাটির ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালাম। বুঝতে পারলাম এটা মসজিদ। ভেতরে একটি কুপিবাতি মিটমিট করে জ্বলছে।
ব্যগপত্র রেখে দু’জন ওজু করে নিলাম। মসজিদে মানুষও আমরা তিনজন। আজব ! তিন সংখ্যাটা দেখি একদম পিছু ছাড়ছে না। লঞ্চেও ছিলাম আমরা তিনজন মসজিদে এসেও দেখি আমরা তিনজন।
নামাজ শেষ হয়েছে একটু আগে। আমরা বসে আছি মসজিদের বারান্দায়। একটু আলো ফুটলে বেরিয়ে পড়বো। ইমাম সাহেব আমাদের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করছেন। মাঝারি বয়স। দাড়িতে মেহেদি লাগিয়েছেন বলে দাড়িগুলো লালচে দেখাচ্ছে। উনি সূরা আর-রহমান তিলাওয়াত করছেন। ‘ফাবি আইয়্যি আলা-য়্যি রাব্বিকুমা তুকাজ্জিবান’ অংশ টিতে এসে খুব সুন্দর করে টান দিচ্ছেন। পরান জুরানিয়া।
আর রহমান তেলাওয়াত করে উনি কোরআন শরীফ বন্ধ করলেন। বন্ধ করে কোরআন শরীফের দুটি চুমু খেলেন। এরপর সেটাকে একবার কপালে আর একবার মুখে লাগিয়ে কি কাপড় দিয়ে পেঁচিয়ে একটা কাঠের তাকে তুলে রাখলেন।
আমরা লোকটার দিকে তাকিয়ে আছি। লোকটা আমার দিকে ফিরে বললেন, -‘আমনেরা কি শহর হইতে আইছেন?’
সাজিদ বলল, ‘জি।’
-‘আমনেরা কি লেখাপড়া করেন?’
সার্জিল আবার বলল, -‘জি।’
-‘মাশাল্লাহ মাশাল্লাহ। আমনেরা শহরের পইড়্যাও বিগড়াইয়া যান নাই। শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।’
লোকটার কথা আমি ঠিক বুঝিনি। সাজিদ বুঝেছে। সে জিজ্ঞেস করল, -‘চাচা, শহরে পড়াশোনা করলে বিগড়িয়ে যায়, আপনাকে কে বলল?’
লোকটা হঠাৎ গম্ভীর মুখ করে বলল, -‘হেইয়া আবার কেডায় কইবে বাপ ! মোর ঘরেই তো জন্মাইছে একখান সাক্ষাৎ ইবলিশ।’
-‘কি রকম?’ সাজিদের প্রশ্ন।
-‘মোর এক্কুয়াই পোলা। পড়ালেখা করতে পাডাইলাম ঢাকা শহরে। হেইনে যাইয়া কি যে পড়ালেহা করছে ! এহন কয়, আল্লা-বিল্লা কইয়া বোলে কিস্যু নাই। এই যে, এহন তো বাড়িতে আইছে। আইয়া কইতেছে কি বোঝঝেন, কয় বলে কোরবানি দিয়া মোরা পশু হত্যা করি। এইগুলা বোলে ধর্মের নাম ভাইঙ্গা খাওনেন ধান্দা হরি মোরা। কিরপ্যিকা যে এইডারে ঢাকায় পড়তে পাডাইলাম বাপ ! হালুডি হরাইলে আজ এই দিন দেহা লাগতে না। !’
লোকটা সব কথা আমি বুঝতে পারিনি। তবে এইটুকু বুঝেছি যে, লোকটার ছেলে ঢাকায় পড়ালেখা করতে এসে নাস্তিক হয়ে গেছে।
সাজিদ বলল, -‘আপনার ছেলে এখন বাড়িতে আছে?’
-‘হ’
