আমরা সবাই শেক্সপিয়ারের গল্প শুনছি। কারো মুখে কোন কথা নেই।
সাজিদ আবার শুরু করলো, –
‘চিন্তা কর, শেক্সপিয়ারের আমলেও মানুষজনের বিশ্বাস ছিল যে, মৌমাছি দুই প্রকার। পুরুষ মৌমাছি আর স্ত্রী মৌমাছি। স্ত্রী মৌমাছি খালি সন্তান উৎপাদন করে, আর বাদ বাকি কাজকর্ম করে পুরুষ মৌমাছি।
সাকিব বলল, -‘তেমনটা তো আমরাও বিশ্বাস করি। এবং, এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?’
-‘হা হা হা। এরকমটাই হওয়া স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু মৌমাছির জীবন চক্র অন্যান্য কীট-প্রত্যঙ্গের তুলনায় একদম আলাদা।’
-‘কি রকম?’ -রাকিবের প্রশ্ন।
সাজিদ বলল, -‘১৯৭৩ সালে অস্ট্রিয়ান বিজ্ঞানী Karl Von Frisch ‘Physiology of Medicine’ বিষয়ে সকল গবেষণার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘মৌমাছির জীবন চক্র’। অর্থাৎ, মৌমাছিরা কিভাবে তাদের জীবন নির্বাহ করে।
এই গবেষণা চালাতে গিয়ে তিনি এমন সব আশ্চর্যজনক জিনিস সামনে নিয়ে এলেন, যা শেক্সপিয়ারের সময়কার পুরো বিশ্বাসকে পাল্টে দিলো। তিনি ফটোগ্রাফি এবং অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে দেখিয়েছিলেন যে, মৌমাছি দুই প্রকার নয়, মৌমাছি আসলে তিন প্রকার।
প্রথমটা হল, পুরুষ মৌমাছি।
দ্বিতীয়টা হল, স্ত্রী মৌমাছি। এই মৌমাছিদের বলা হয়, Queen Bee. এরা শুধু সন্তান উৎপাদন করা ছাড়া আর কোন কাজ করে না। এই দুই প্রকার ছাড়াও আরো এক প্রকার মৌমাছি আছে। লিঙ্গভেদে এরাও স্ত্রী মৌমাছি তবে একটু ভিন্ন।’
-‘কি রকম?’ দেবাশীষ প্রশ্ন করল।
-‘আমরা জানি পুরুষ মৌমাছিরাই মৌচাক নির্মাণ থেকে শুরু করে মধু সংগ্রহ সব করে থাকে কিন্তু এই ধারণা ভুল। পুরুষ মৌমাছি শুধু একটি কাজই করে, আর তা হলো কেবল রানী মৌমাছিদের প্রজনন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করা। মানে, সন্তান উৎপাদনে সহায়তা করা। এই কাজ ছাড়া আর কোন কাজ নেই।’
-‘তাহলে মৌচাক নির্মাণ করে শুরু করে বাকি কাজ কারা করে?’ –রাকিব জিজ্ঞাসা করল।
-‘হ্যাঁ। তৃতীয় প্রকারের মৌমাছিরাই বাদ বাকি সব কাজ করে থাকে। লিঙ্গভেদে এরাও স্ত্রী মৌমাছি। কিন্তু প্রকৃতিগতভাবে এর সন্তান জন্মদানে অক্ষম। সোজা কথায়, এদের বন্ধ্যা বলা যায়।’
আমি বললাম, -‘ও আচ্ছা।’
সাজিদ আবার বলতে লাগল, -‘বিজ্ঞানী Karl Von Frisch এই বিশেষ শ্রেণীর স্ত্রী মৌমাছিদের নাম দিয়েছেন Worker Bee বা কর্মী মৌমাছি। এরা Queen Bee তথা রানি মৌমাছি থেকে আলাদা একটি দিকেই। সেটা হলো রানী মৌমাছির কাজ হলো সন্তান উৎপাদন, আর কর্মীদের কাজ সন্তান জন্ম দেওয়া ছাড়া অন্যসব।’
সাকিব বলল, -‘বাহ, দারুন তো। এরা কি প্রকৃতিগতভাবেই সন্তান জন্মদানে অক্ষম হয়ে থাকে?’
-‘হ্যাঁ’
-‘আরও, মজার ব্যাপার আছে। বিজ্ঞানী Karl Von Frisch প্রমাণ করেছেন যে, ওইসব কর্মীরা যখন ফুল থেকে রস সংগ্রহ করতে বের হয়, তখন তারা খুব অদ্ভুত একটি কাজ করে। সেটা হল, ধর, কোন কর্মী মৌমাছি কোন এক জায়গায় ফুলের উদ্যানের সন্ধান পেল যেখান থেকে রস সংগ্রহ করা যাবে। তখন ওই মৌমাছিটি তার অন্যান্য সঙ্গীদের এই ফুলের উদ্যান সম্পর্কে খবর দেয়।’
মৌমাছিটি ঠিক সেভাবেই বলে, যেভাবে যে পথ দিয়ে সে ওই উদ্যানে গিয়েছিল। মানে, এক্স্যাক্ট, যে পথে সে সন্ধান পায়, সে পথের কথাই অন্যদের বলে। আর, অন্য মৌমাছিরাও ঠিক তার বাতলে দেওয়া পথ অনুসরণ করেই সে উদ্যানে পৌঁছে। একটুও হেরফের করে না। Karl Von Frisch এই ভারী অদ্ভুত জিনিসটার নাম রেখেছেন ‘Waggle dance’..
আমি বললাম, -‘ভেরি ইন্টারেস্টিং…..’
সাজিদ বলল, -‘মোদ্দাকথা, Karl Von Frisch প্রমাণ করেছেন যে, স্ত্রী মৌমাছি দু প্রকারের। রানি মৌমাছি আর কর্মী মৌমাছি। দুই প্রকারের কাজ সম্পূর্ণ আলাদা। আর, পুরুষ মৌমাছি মৌচাক নির্মাণ, মধু সংগ্রহ এসব করে না। এসব করে কর্মী স্ত্রী মৌমাছিরাই।’
এই পুরো জিনিসটার ওপর Karl Von Frisch একটি বইও লিখেছেন। বইটির নাম ‘the Dancing Bees’। এই জিনিসগুলো প্রমাণ করে তিনি ১৯৭৩ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
এতটুকু বলে সাজিদ থামল। দেবাশীষ বলল, -‘এত কিছু বলার উদ্দেশ্য কি?’
সাজিদ তার দিকে তাকাল। আর বলল, -‘যে জিনিসটা ১৯৭৩ সালে বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, সেই জিনিসটা ১৫০০ বছর আগে কোরআন বলে রেখেছে।’
দেবাশীষ সাজিদের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকালো।
সাজিদ বললো, -‘কোরআন যেহেতু আরবী ভাষায় নাজিল হয়েছে, আমাদের আরবী ব্যাকরণ অনুসারে তার অর্থ বুঝতে হবে। বাংলা থেকে ইংরেজি কোনটাতেই পুংলিঙ্গ এবং স্ত্রীলিঙ্গের জন্য আলাদা আলাদা ক্রিয়া ব্যবহৃত হয় না।
যেমন ইংলিশে পুংলিঙ্গের জন্য আমরা বলি, He does the work, আবার স্ত্রী লিঙ্গের জন্যও বলি, She does the work
খেয়াল করো, দুটো বাক্যে জেন্ডার পাল্টে গেলেও ক্রিয়া পাল্টেনি। পুংলিঙ্গের জন্য যেমন does, স্ত্রীলিঙ্গের জন্যও does। কিন্তু আরবিতে সেরকম নয়। আরবিতে জেন্ডারভেদে ক্রিয়ার রূপ পাল্টে যায়।’
আমরা মনোযোগী শ্রোতার মত শুনেছি।
সে বলে যাচ্ছে-
‘কুরআনে মৌমাছির নামেই একটি সূরা আছে। নাম সূরা আল নাহল। এই সুরার ৬৮ নাম্বার আয়াতে আছে, – ‘(হে মোহাম্মদ) আপনার রব মৌমাছিকে আদেশ দিয়েছেন যে, মৌচক বানিয়ে নাও পাহাড়ে, বৃক্ষে এবং মানুষ যে গৃহ নির্মাণ করে, তাতে।’
