১৩. মহীয়সী
[এক]
কোনোভাবেই ঘুম আসছে না চোখে। ঘরময় পায়চারি করতে করতে হোসেন যখন শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দিতে এলো, তখন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। গোটা তল্লাট মরণ-ঘুমে আচ্ছন্ন। হেমন্তের দীর্ঘ রাত, দৃষ্টির অনুকূলে কুয়াশার ঘন আবরণ ব্যতীত আর কোনোকিছুই দৃশ্যমান নয়। নিবিড় নিস্তব্ধতার এই নৈশপ্রহরে বহুদূর থেকে ভেসে আসা কয়েকটা খাকি শেয়ালের অস্পষ্ট হাঁকডাক ছাড়া তামাম ধরণিই থমথমে হয়ে আছে যেন।
খাটের সাথে লাগোয়া জানলাটা খুলে দেয় হোসেন। জানলা খুলবার সাথে সাথে বরফ-জমা বাতাস হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে তার বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। বাইরে নিশ্চপ অন্ধকার। সেই অন্ধকারে দৃষ্টি ফেললে দৃষ্টি ফেরত আসে–এমন নিবিড় আর ঘন তার আস্তরণ। হোসেন ধপ করে জানলাটা আটকে দিয়ে খাটের ওপর এসে বসে। চোখে তার একফোঁটা ঘুম নেই। আগামীকাল যে ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, তার আনন্দের আতিশয্যে হোসেন আত্মহারা প্রায়।
এবারে মনে হচ্ছে কিছু একটা হবে। ঢাকা শহরের নামকরা এক সাপ্তাহিক পত্রিকা থেকে তার ডাক এসেছে। এমন একটা জায়গায় যদি কাজ জুটে যায়, হোসেনের জীবন থেকে দীর্ঘদিনের বেকারত্বের অভিশাপ বিদায় নেবে। আর তা ছাড়া, মিডিয়ায় কাজ করাটাও হোসেনের বহুদিনের লালিত স্বপ্ন। স্বপ্ন আর সামথ্যের সম্মিলিত যোগসাজশ হোসেনের জীবনে খুব একটা ঘটেনি।
দিন কয়েক আগে এক অদ্ভুত মানুষের সাথে দেখা হয় হোসেনের। মানুষটাকে আশেপাশের কোনো এলাকার বলে চিহ্নিত করা গেলো না। হতে পারে দূরের কোনো এক জেলা থেকে নিতান্তই পথ ভুল করে এদিকে চলে এসেছেন। কিন্তু মানুষটার ধারণা সে এই পৃথিবীর কোনো জীব নয়, অন্য কোনো গ্রহ থেকে দুর্ঘটনাক্রমে এই গ্রহে ছিটকে আসা কোনো এক হতভাগা! সবাই তাকে পাগল ভেবে হাসি-তামাশা করে বিদেয় হলেও, ঘটনাটায় হোসেনের ভারি আগ্রহ জন্মালো। লোকজন সরে গেলে সে মানুষটার আরও কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার হাবভাব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। লোকটাকে দেখে তার দাবির সত্যতা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ করবার অবকাশ থাকে। মুখে চাপা দাড়ি, গায়ে পাঞ্জাবি-পায়জামা, উস্কোখুস্কো চুল এবং পথভারে ক্লান্ত চেহারা–এসবের কোনোটাই ভিনগ্রহী বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। তবুও হোসেন সরে যায় না, লোকটার প্রতি তার একটা অন্যরকম মায়া জন্মায়।
লোকটা বিড়বিড় করে বলে, ‘উহ, এই সূর্যের আলো এমন কটকটে কেন? আমাদের দুনিয়ার সূর্যের আলো কতো মোলায়েম আর স্নিগ্ধ! আজলা ভরে নিয়ে ওই আলো পান করা যায়, ওই আলোতে ডুব দেওয়া যায়। আমাদের সূর্যটা কতো সুন্দর, কিন্তু এই সূর্যটা এতো বিতিকিচ্ছিরি কেন?’
হোসেন হাসলো। হাসার মতোই ব্যাপার! এমন ভারি অদ্ভুত কথা হোসেন আগে। কোনোদিন শোনেনি। একবার মনে হলো, লোকটার কাছে কিছু জানতে চাইলে কেমন হয়? কিন্তু সে খেয়াল করেছিলো লোকটা কারও সাথে কথা বলে না, কারও কথার কোনো উত্তর দেয় না, কেবল নিজে নিজে বিড়বিড় করে।
বিকেল গড়াতেই পৌরসভা থেকে একটা গাড়ি এসে লোকটাকে তুলে নিয়ে গেলো। লোকটার ঠিকানা পাওয়া গেছে বলে জানা যায় এবং আরও জানা যায়, লোকটা একইসাথে মানসিক ভারসাম্যহীন, ইনসমনিয়ার রোগী। সারারাত জেগে থাকে, আবোল-তাবোল বকে আর সারাদিন মোষের মতো ঘুমায়।
ঘটনাটা দাগ কেটেছিল হোসেনের মনে, বিশেষ করে লোকটার অদ্ভুত কথাগুলো। আগে থেকে তার টুকটাক লেখাজোখার অভ্যেশ ছিলো, অদ্ভুত লোকটার অদ্ভুত ঘটনাকে নিয়ে একটা গল্প লিখে ফেলবার ঝোঁক তার মনে প্রবল হয়ে উঠলো তাই।
সে রাতে ফিরেই হোসেন খাতা নিয়ে বসে পড়লো। ধীরে ধীরে লিখে চললো এক অতি অলৌকিক গল্প। বাস্তবের লোকটা যদিও মানসিক এবং ইনসমোনিয়ার রোগী বলে জানা গিয়েছিলো, কিন্তু হোসেন গল্পটাকে চিত্রায়িত করলো একেবারে ভিন্নভাবে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে লোকটা নিজেকে অন্যগ্রহের বলে দাবি করছিলো বারবার। হোসেনও গল্পের কাহিনিকে সেদিকে প্রবাহিত করলো। গল্পের উপজীব্য একটা প্রাণী যে দেখতে হুবহু মানুষের মতো হলেও, সে আদতে মনুষ্য-গ্রহের কোনো জীব নয়। তার আবাসস্থল মহাশূন্যের নীহারিকা, গ্রহপঞ্জি, তারকালোক ছাড়িয়ে ভিনগ্রহের কোনো এক ভূতুড়ে জগতে। সেখানকার বাস-পদ্ধতির কোনো এক ত্রুটির কারণে তাকে ছিটকে পড়তে হয় দোপেয়ে মানুষদের এই গ্রহে। কিন্তু সেই ভূতুড়ে গ্রহের প্রাণীটা কীভাবে মানুষের মতো কথা বলছে, কীভাবে মানুষের মতোই তার হাবভাব, গড়ন-গাড়ন সে এক বিরাট রহস্য! সেই রহস্যের মায়াজাল ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলে হোসেনের গল্প।
ভিনগ্রহী আগন্তুক শিরোনামের যে গল্পটা হোসেন লিখলো, তার সকলরব প্রশংসা
করলো বন্ধুমহল। আলমগীর বললো, ‘তুই একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছিস বন্ধু! দীর্ঘদিন পর এতো ভালো একটা গল্প পড়লাম। ইমপ্রেসিভ!’
শাওনের মুখে লাগামের বালাই থাকে না। কথা বলতে দিলেই ওর মুখে খই ফোটে। হোসেনের গল্প পড়ে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে অসংযত শাওনও নিজেকে বেশ সংযত করে বললো, ‘তুই শালা তো রাতারাতি তারকা বনে যাবি রে হোসেন! কী গল্পটাই না লিখেছিস তুই! সত্যি বলছি।’
মুখরা সমালোচক হিশেবে পরিচিত আড্ডার সাহিত্য-বান্ধব বন্ধু মিজানের মুখেও হোসেনের প্রশংসা-কীর্তন! মিজান বললো, ‘হোসেন, দারুণ একটা গল্প হয়েছে। এটা। আমি একটা পরামর্শ দিই, এটাকে তুই ঢাকার সাপ্তাহিক কোনো কাগজে পাঠিয়ে দে। আমি নিশ্চিত ওরা অনায়েশে ছাপিয়ে দেবে। ভাগ্য ভালো থাকলে সেলামিও পেতে পারিস।’
