সোশ্যাল মিডিয়ার লাগাম টেনে ধরতে আপনি নিজেও পালন করতে পারেন একটা Unplugigng Day. সপ্তাহে একটা নির্দিষ্ট দিন ঠিক করে নেন, যেদিন আপনি আপনার সকল সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টকে বয়কট করবেন। এটা হতে পারে। শুক্রবার, সোমবার, বৃহস্পতিবার অথবা আপনার সুবিধেমতো যেকোনো দিন। যদি অনলাইনে ওই দিন আপনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ থেকে থাকে–কোনো অনলাইন মিটিং, কোনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যাট–আপনি তা আগের দিন সেরে নিতে পারেন বা পরের দিনের জন্য জমা করে রাখতে পারেন।
আপনার Unplugging Day তে আপনি ভালো একটা বই পড়ে শেষ করতে পারেন, বন্ধুদের সাথে কিংবা পরিবার নিয়ে যেতে পারেন পাহাড়ের কোলঘেঁষা। মনোরম কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্যের কাছাকাছি অথবা সমুদ্রের সংস্পর্শে। আত্মীয়স্বজনদের বাসাতেও বেড়াতে যেতে পারেন। শখের ছাদ বাগান পরিচর্চা করতে পারেন, উঠোনে লাগাতে পারেন নতুন প্রিয় কোনো ফুল বা ফলের গাছ। সন্তানদের সাথে খেলাধুলো করা, এলাকার ছোটো আর বড়রা মিলে টিম করে ক্রিকেট বা ফুটবল খেলাসহ ভালো সময় কাটবে এমন যেকোনোকিছুতে নিজেকে যুক্ত করে নিতে পারেন।
এই অভ্যাসটা চর্চা করতে পারলে আপনার জীবনে এর বেশ ভালো রকমের প্রভাব দেখতে পাবেন। আপনি দেখবেন–নিজের কাজগুলো করার জন্য বেশ ভালো রকমের সময় পাচ্ছেন। আগে কাজ করতে গিয়ে যেখানে শেষ মুহূর্তে দৌঁড়াদৌঁড়িতে পড়তেন, এখন আর তা নেই। আপনি আরো বুঝবেন–একটা দিন আপনি ফেইসবুকে না আসাতে ফেইসবুকের তাতে কিছু যায় আসেনি। এমনকি ফেইসবুক দুনিয়ার কেউ আপনাকে মিস পর্যন্ত করেনি। একটা দিন আপনি ফেইসবুকে আসেননি বলে থেমে যায়নি পৃথিবীর অগ্রযাত্রা, স্থবির হয়ে যায়নি দুনিয়ার রাজনীতি, ভেঙে পড়েনি অর্থনীতি কিংবা কোথাও লেগে যায়নি কোনো বিশ্বযুদ্ধ। আপনি না থাকার পরেও দুনিয়া তার আপন গতিতেই চলেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার অনুপস্থিতি হয়তো দুনিয়ার কোথাও কোনো পরিবর্তন ঘটায় না, কিন্তু আপনার জীবনে এই অনুপস্থিতির অবদান কিন্তু অসামান্য!
মাত্রাতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের লাগাম টেনে ধরে যখন সেই সময়টুকুন আপনি পরিবারে দেন, যখন স্ত্রীর সাথে, শিশুদের সাথে, বাবা-মার সাথে কাটান সেই সময়গুলো, যখন ওই সময়গুলো বাঁচিয়ে আপনি সপ্তাহে ভালো দুটো বই পড়েন, একটা সুরা মুখস্থ করেন, সপ্তাহে দশ কিলোমিটার হাঁটেন, দশটা হাদিস পড়ে আমল করার চেষ্টা করেন, সোশ্যাল মিডিয়াতে কুঁদ হয়ে থাকা সময়কে বাঁচিয়ে যখন আপনি প্রতি সপ্তাহে একজন আত্মীয়কে দেখতে যান, দুজন ভালো বন্ধুর সাথে আড্ডা দেন, যখন ঘরের কাজগুলোতে স্ত্রী অথবা মাকে সাহায্য করেন, নিজের শখের কাজগুলোতে সময় দেন–আপনি কি মনে করেন, এগুলোর কোনো প্রভাব আপনার জীবনে পড়বে না? আমি শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি– ফেইসবুকে আপনি না আসলে বা কম আসলে যদিও তাতে মার্ক জুকারবার্গ কিংবা দুনিয়ার কিছু যাবে আসবে না, কিন্তু সেই সময়গুলোকে ভালো কোনো কাজে ব্যয়। করতে পারলে বদলে যাবে আপনার গোটা জীবন।
সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তির অন্যতম একটা কারণ হলো কানেক্টিভিটি। না, নতুন কোনো বন্ধুর সাথে যুক্ত হওয়াকে আমি খারাপ বলতে চাইছি না, কিন্তু নতুন বন্ধু তখনই উপকারী হয়ে ওঠে, যদি তার কাছ থেকে আপনি উপকারী কিছু জানতে বা । শিখতে পারেন। সোশ্যাল মিডিয়ার একটা কমন ট্রেন্ড হচ্ছে–এখানে মানুষ কোনো উদ্দেশ্য বা প্রয়োজনীয়তা না বুঝে যার-তার সাথে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে ভাচুয়ালে। পার করা সময়গুলো আদৌ তার নিজের উপকারে আসছে কি না, সেটা সে আর বুঝে উঠতে পারে না।
যত বেশি মানুষের সাথে আপনি কানেক্টেড থাকবেন, তত বেশি সময় ভাচুয়ালে পার করার সম্ভাবনা আপনার ক্ষেত্রে বেড়ে যাবে। আপনার ইনবক্সে তখন অনেক হাই-হ্যালো থাকবে, অনেক কুশলাদি থাকবে, অনেক প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা, অনেক তথ্য আসবে। সেগুলোর উত্তর দিতে আপনি ভালোই বোধ করবেন। নতুন কারো সাথে কানেক্টেড হওয়াটাকে আপনার কাছে একটা অর্জন বলেই মনে হবে, কিন্তু আমি আবারও বলি, এই কানেকশান তখনই অর্জন হয়ে উঠবে, যদি সেটা আপনাকে প্রোডাক্টিভ কোনো কাজে যুক্ত করার দিকে ধাবিত করে।
এই কানেক্টিভিটির আরেকটা মন্দ দিক হলো–এটা আমাদেরকে আমাদের বাস্তব জীবনের আড্ডা আর কানেকশানগুলো থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় মজবুত একটা কানেক্টিভিটি গড়তে গিয়ে আমরা আমাদের বাস্তবিক জীবনের সম্পর্কগুলো সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ি অনেকসময়। সোশ্যাল মিডিয়াতে কমিউনিটি বিল্ডআপ করতে গিয়ে আমরা আমাদের স্ত্রীদের রান্নার প্রশংসা করতে ভুলে যাই, আমাদের সংসারগুলোকে তারা যেভাবে পরম আদর-যত্নে আগলে রাখে, সেটাকে মূল্যায়ন করার সুযোগ আমরা পাই না। স্ত্রীরাও ফুরসত পায় না স্বামীদের সঠিকভাবে মূল্যায়নের। তাদের শ্রম, চেষ্টা আর ত্যাগগুলোকে যথার্থ মর্যাদা তখন দেওয়া হয়ে ওঠে না অনেকসময়।
সোশ্যাল মিডিয়ার কানেক্টিভিটি আমাদেরকে আমাদের জীবনের সত্যিকার কানেক্টিভিটি থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। বাবা-মার সাথে বসে গল্প-গুজব করার, হাসি-আনন্দ উপভোগ করার, শিশুদের সাথে মনখুলে খেলবার, ভাই-বোনদের সাথে প্রাণোচ্ছল হয়ে মিশবার সুযোগগুলো কত দ্রুতই না হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের জীবন থেকে! আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি সোশ্যাল মিডিয়া কানেক্টিভিটিকে, কিন্তু বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোকে করছি অবহেলা। জীবনের প্রতিটা লগ্নেই–সুখের কিংবা দুঃখের–বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোই আমাদের পাশে থাকে এবং থাকবে। এই সম্পর্কগুলোকে অবহেলা করা মানে রূপো খুঁজতে গিয়ে হীরাকে পায়ে ঠেলা। সোশ্যাল মিডিয়ার এই কানেক্টিভিটির লাগাম টেনে ধরার জন্য আমাদেরকে খুবই সাবধান এবং সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আমাদের ভার্চুয়াল বন্ধুতালিকায় কাকে রাখবো, কাকে ফলো করবো, কোন চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করবো–এসব ব্যাপারে আমাদের হতে হবে ভীষণ খুঁতখুঁতে। এসব নেটওয়ার্কিং যেন আমাদের দূরে সরিয়ে না দেয় বাস্তব জীবনের সুন্দর পরিসর থেকে।
