বৌদ্ধ-ব্রাহ্মণ্য সংঘর্ষে দেদার হত্যাকাণ্ড, বহু অত্যাচার ও নানা উৎপীড়ন যে হয়েছিল, তার প্রমাণ সে-যুগের পুঁথিপত্রে নানা সূত্রে পাওয়া যাচ্ছে। যেমন শঙ্কর বিজয়ে আছে: দুষ্টমতাবলম্বিনঃ জৈনান অসংখ্যাতান অনেক বিদ্যাপ্রসঙ্গে নির্জিত্য তেষাং শীর্ষাণি পরশুভিশ্চিত্ত্ব বহু উদুখলেষু নিক্ষিপ্য কটভ্রমণে স্ফুর্ণীকৃত চৈবং দুষ্টমত ধ্বংসম আচরণ নির্ভয়ো বৰ্ততে। (অর্থাৎ: অসংখ্য দুষ্টমতাবলম্বী বৌদ্ধ ও জৈন রাজ্যমুখদিগকে অনেক বিদ্যাপ্রসঙ্গে নির্জিত করিয়া তাহাদের মাথা কুঠার দ্বারা ছিন্ন করে, অনেক উদূখল নিক্ষেপ করে, মুষল দ্বারা চুর্ণ করে, এইরূপ দুষ্টমত ধ্বংস আচরণ করে তিনি নির্ভয় থাকতেন।) এই ভয়ঙ্কর রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বে বৌদ্ধগণ নির্মূল হয়ে গেল। তাদের সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি প্রভৃতিও বৌদ্ধদ্বেষী নবজাগ্রত ব্রাহ্মণ্য সম্প্রদায় কর্তৃক হয়তো বহুলাংশে বিনষ্ট হয়েছিল।
বাঙলাদেশের কথায় আসা যাক। বাঙালিরা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করল সত্য কিন্তু ধর্মের অনুশাসনের সাথে জনগণের আন্তর যোগ ছিল না, তাই নিরীশ্বর নৈরাত্ম বৌদ্ধ চৈত্যগুলো ক্রমে বহুদেবতা ও উপদেবতার মন্দিরে পরিণত হল। হীনযান, মহাযান, সহজযান বজ্রযান, প্রভৃতি নানা মতাদর্শ ও সম্প্রদায়ের সৃষ্টি হল। কারণ সুখে-দুঃখে সুদিনে-দুর্দিনে স্বস্তি ও প্রবোধ পাবার জন্যে একটি মহাশক্তিকে অবলম্বন স্বরূপ পাওয়া চাই। নইলে ভরসা কী? বাঙলার পাল-রাজগণ বৌদ্ধ ছিলেন। তাই তাঁদের সময়ে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম নামত টিকে ছিল। সেন-রাজগণ ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তাঁদের প্রতিকূলতায় বাংলাদেশ থেকে বৌদ্ধধর্ম নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। তৎসঙ্গে বৌদ্ধযুগের সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতিও বিলুপ্ত হল। বাঙলাদেশে কোনোকালে যে বৌদ্ধ ম ও সংস্কৃতির প্রাদুর্ভাব ছিল তা অনুমান করবার সামান্য উপাদান পর্যন্ত অবশিষ্ট রইল না। এতেই বোঝা যায় কী অসামান্য উগ্রতা নিয়ে ব্রাহ্মণ্য ধর্মধ্বজীগণ বৌদ্ধদের ধর্ম, সংস্কৃতি তথা বৌদ্ধজাতিকে ধ্বংস করেছিল। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যধর্মের সঙ্গেও জনসাধারণের বিশ্বাস সংস্কারের যোগ নিবিড় ছিল না। রাজধর্ম বলে সেন বংশীয় শাসনকালে ব্রাহ্মণ্যধর্ম অনুসৃত হলেও আসলে ধর্মগ্রন্থ, মন্দির, দেবতা প্রভৃতির সঙ্গে সাধারণ মানুষের পরিচয় ও সম্পর্ক ব্রাহ্মণের মারফত হত বলে তা কখনো অকৃত্রিম হয়ে উঠেনি। তাই বাঙলাদেশে মুসলমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে (সেন রাজবংশের পতনযুগেই এর সূচনা) রাজরোষ ভয়মুক্ত জনসাধারণ স্ব স্ব বিশ্বাস সংস্কার দিয়ে নিজেদের ইষ্ট দেবতা সৃষ্টি করল। এটাই বাঙলাদেশে ও সাহিত্যে লৌকিক ধর্মান্দোলন। মনসা, চণ্ডী, ধর্মঠাকুর, নাথপন্থ প্রভৃতি দেবতার ও মতের সৃষ্টি হল। এইগুলো মূলত বৌদ্ধ-হিন্দু প্রভাবিত অনার্য ধর্ম অবশ্য। এতে ব্রাহ্মণ্যধর্মের প্রভাব প্রচুর। এ প্রভাব পড়ে প্রধানত রামায়ণ অথবা মহাভারত ও পুরাণের মাধ্যমে।
এসব লৌকিক দেবতা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন– এক কালে পুরুষ দেবতা যিনি ছিলেন তাঁর বিশেষ কোনো উদ্রব ছিল না। খামকা মেয়ে-দেবতা জোর করে এসে বায়না ধরলেন আমার পূজা চাই। অর্থাৎ যে জায়গায় আমার দখল নেই, সে জায়গা আমি দখল করবই। তোমার দলিল কী? গায়ের জোর। কী উপায়ে দখল করবে? যে উপায়ে হোক। তারপর যে সকল উপায় দেখা গেল মানুষের সদবুদ্ধিতে তাকে সদুপায় বলে না। কিন্তু পরিণামে এই সকল উপায়েরই জয় হোলো। ছলনা, অন্যায় এবং নিষ্ঠুরতা কেবল যে মন্দির দখল করল তা নয়, কবিদের দিয়ে মন্দিরা বাজিয়ে চামর দুলিয়ে আপন জয়গান গাইয়ে নিলে। রবীন্দ্রনাথের এ মন্তব্য একটু কঠোর। আসলে সমাজের যে, স্তরের লোক দ্বারা এসব লৌকিক দেবতা পরিকল্পিত, প্রতিষ্ঠিত ও পূজিত তাদের বিদ্যাবুদ্ধি ও রুচিসংস্কৃতি কোনোকালেই উঁচু ছিল না। যে পরিবেশ ও শিক্ষা পেলে মানুষের মন ও মননের বিকাশ ও প্রসার হয় তা চিরকাল এদের কাছে রুদ্ধ ছিল। তাই এদের অপরিণত মন-বুদ্ধি-বোধিরই নগ্নরূপ ধরা দিয়েছে দেবতার শক্তি ও ঐশ্বর্য পরিকল্পনায়।
মঙ্গল কাব্যের উদ্ভবের কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :… তখন সমাজের মধ্যে যে উপদ্রব-পীড়ন, আকস্মিক উৎপাত, যে অন্যায়, যে অনিশ্চয়তা ছিল মঙ্গলকাব্য তাহাকেই দেবমর্যাদা দিয়া সমস্ত দুঃখ অবমাননাকে ভীষণদেবতার অনিয়ন্ত্রিত ইচ্ছার সহিত সংযুক্ত করিয়া কথঞ্চিৎ সান্ত্বনা লাভ করিতেছিল এবং দুঃখক্লেশকে ভাঙ্গাইয়া ভক্তির স্বর্ণমুদ্রা গড়িতেছিল। এই চেষ্টা কারাগারের মধ্যে কিছু আনন্দ-কিছু সান্ত্বনা আনে বটে কিন্তু কারাগারকে প্রাসাদ করিয়া তুলিতে পারে না। এই চেষ্টা সাহিত্যকে তাহার বিশেষ দেশকালের বাহিরে লইয়া যাইতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ মুসলমান বিজয় ও তজ্জনিত অত্যাচারকেই লৌকিক দেবতা ও তাদের মাহাত্মজ্ঞাপক কাব্য সৃষ্টির জন্য দায়ী করেছেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই সিদ্ধান্ত যথার্থ নয়। কারণ খ্রস্টীয় এগারো বারো শতকে অর্থাৎ সেন-রাজত্বের শেষের দিকে রচিত সংস্কৃত পুরাণগুলোতে এসব লৌকিক দেবতার উল্লেখ দেখা যাচ্ছে। বরং বাঙলা মঙ্গল কাব্যের ইতিহাসে আশুতোষ ভট্টচার্য (১ম সংস্করণ) যা বলেছেন তা অনেকটা সমীচীন বলে মনে হয়। তিনি বলেছেন : সেন রাজাদিগের সময় হইতেই ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতি সাধারণের মধ্যে বিস্তৃত হইতেছিল সত্য কিন্তু এত কালের একটা দেশীয় ধর্ম-সংস্কৃতিও-যাহা জাতির একেবারে মজ্জাগত হইয়া পড়িয়াছিল মুখ্যত না হউক গৌণত হইলেও এই সমাজদেহেই রহিয়া গেল। সেকালের বাঙ্গালী হিন্দুর সামাজিক জীবনের এই সন্ধিযুগে, দেশীয় প্রাচীন সংস্কার ও ব্রাহ্মণ্যধর্মের নূতন আদর্শ এই উভয়ের সংঘাত মুহূর্তে বাংলা পুরাণ বা মঙ্গলকাব্যগুলি সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ করিয়াছিল।.. তাহারা (বাঙালি হিন্দুগণ) নূতনকে (ব্রাহ্মণ্যধর্মকে) যেভাবে গ্রহণ করিল তাহা পুরাতনেরই রূপান্তর মাত্র হইল; এই দেশীয় প্রচলিত ধর্ম-সংস্কারই যুগোচিত পরিমার্জনা মাত্র লাভ করিয়া সমাজের অন্তঃ স্থলে প্রচ্ছন্নভাবে বিরাজ করিতে লাগিল। মঙ্গল কাব্যগুলি এই নূতন ও পুরাতনের মধ্যে সুন্দর সামঞ্জস্য বিধান করিয়া দিয়া পরস্পর বিপরীতমুখী দুইটি সংস্কারকে এক সূত্রে গাঁথিয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছে। বাংলার জলবায়ুতে দেশীয় লৌকিক সংস্কারের সহিত ব্রাহ্মণ্য সংস্কার যে কীভাবে একদেহে লীন হইয়া আছে মঙ্গল কাব্যগুলি পাঠ করিলে তাহাই জানিতে পারা যায়। … তাহারই ফলে বর্তমান বাঙলার হিন্দুসমাজে পঞ্চোপাসক হিন্দু সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। সুতরাং ড. সুকুমার সেনের উক্তি যথার্থ বলে গৃহীত হতে পারে না। তিনি বলেছেন : মুসলমান অভিযান যে আলোড়ন ও বিক্ষোভ জাগাইয়া তুলিল কথাগুলো এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। মুসলমান বিজয় ও তারপরে কিছুকাল বাঙলার রাজনৈতিক সামাজিক অবস্থা কিরূপ ছিল তা সংক্ষেপে আলোচনা করে দেখা যাক।
