.
০৮.
১২০২-৪ খ্রীস্টাব্দের কোনো সময়ে বখতিয়ার খলজী নদীয়া অধিকার করেছিলেন সত্য কিন্তু গোটা বাঙলাদেশ জয় করা বহুঁকালাবধি তুর্কীদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। লক্ষ্মণ সেনের বংশধরগণ এবং অপরাপর সামন্তগণ মধ্য ও পূর্ব বাঙলায় অনেককাল স্বাধিকার বজায় রেখেছিলেন। সুতরাং ড. দীনেশ সেন ড. সুকুমার সেন বা অন্যান্য হিন্দু ঐতিহাসিকগণ দুশ আড়াইশ বছর যাবৎ বাঙলাদেশে মুসলমানগণ অত্যাচার ও ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে বলে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা সত্য নয়।
লক্ষ্মণ সেনের আমলে বাঙালির নৈতিক দৌর্বল্য, চারিত্রিক বিকৃতি ও সামাজিক শৈথিল্য দেখা দিয়েছিল। এর বহু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। হলায়ুধ মিশ্রের শেখ শুভোদয়া জয়দেবের গীতগোবিন্দ শূন্য পুরাণ বা ধর্ম পূজাবিধানের নিরঞ্জনের রম্মা প্রভৃতিতে এর আভাস আছে। গীতগোবিন্দে আধ্যাত্মিকতা সন্ধান করা বাতুলতা মাত্র কারণ এতে তা নেই। বৌদ্ধদের উপর ব্রাহ্মণ্য উৎপীড়নের রেশ তখনো ছিল। রাজধর্মে ও ক্ষাত্রশক্তিতেও শিথিলতা এসেছিল। মন্ত্রতন্ত্র প্রভৃতি আধিদৈবিক শক্তির উপর একান্ত নির্ভরতা এ যুগের প্রাসাদ ও কুটিরবাসীর চিত্তদৌর্বল্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
সেন আমলের রণনীতির একটু নমুনা :
তুকতাকের উপর বিশ্বাস সেকালে রাজশক্তিরও যে কতটা দৃঢ় ছিল তার একটু নিদর্শন দিচ্ছি সেকালের একটি তথাকথিত রণনীতির বই থেকে। শত্রুসৈন্য যদি চারিদিক থেকে ঘিরে দাঁড়ায় তখন কী কৰ্তব্য সে সম্বন্ধে বইটিতে অনেক রকম বিধান আছে। তার মধ্যে একটি বলছি। শ্মশানের ছাই কয়েকটি বিশেষবিশেষ গাছের ছাল ও মূলের সঙ্গে বেটে ভূর্যের গায়ে ভালো করে মাখিয়ে এই মন্ত্র পড়ে বাজাতে হবে,
ওং অং হং হালিয়া হে মহেলি বিহঞ্জহি সাহিনেহি।
মশানেহি খাহি লুঞ্চহি কিলি কিলি কালি হুংকট স্বাহা।
আর শ্বেত অপরাজিতার মূল ধুতুরাপাতার রসে বেটে নিজের কপালে তিলক এঁকে সর্বঞ্জোদয় মন্ত্রজপ করতে হবে। তাহলে সেই সূর্যের শব্দ শুনে ভবতি পরচক্রভঙ্গঃ স্বসৈন্য বিজয়। (ড. সুকুমার সেন–মধ্যযুগের বাংলা ও বাঙালি)
দেশের দণ্ডশক্তির যখন এমনি অবস্থা তখন মুসলিমশক্তি দেশ শাসন ব্যাপারে বিশেষ বাধা পেয়েছিল বলে মনে হয় না। কাজেই ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা চালাবার কারণ ঘটেনি। বরং ড. সুকুমার সেনের অপর একটি উক্তি যথার্থ বলে মনে হয়। তিনি বলেছেন : আমাদের দেশের চিন্তাধারার একটা সাধারণ সূত্র হচ্ছে সুখের মতো দুঃখকেও ঈশ্বরের অলঙ্ঘ্যবিধান বলে মেনে নেওয়া।…. তাই কিছুকাল পরে জনসাধারণ সহজেই মুসলমান বিজয়কে ঈশ্বরের মার বলে মেনে নিয়ে মনে সান্ত্বনা আনতে চেষ্টা করলে। (মধ্যযুগের বাংলা ও বাঙালি)
.
০৯.
মুসলমান অভিযানের সময় বিজেতা-বিজিতের দ্বন্দ্ব স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যমান ছিল। বিজেতাগণ প্রয়োজনের তাগিদে দেউলদেহারা ও দেশীয় সামন্তশক্তির উপর হামলা করতে যে বাধ্য হয়েছে তা অস্বীকার করবারও কারণ দেখি না। বিজেতাগণের উত্তম্মন্যতা ও বিজিতদের হীনমন্যতার দরুন পারস্পরিক সম্পর্ক যে কিছুকাল অবজ্ঞা ও বিদ্বেষদুষ্ট ছিল তাও সত্য। তুর্কী অভিযান তথা ভারতে মুসলমান বিজয় যে ধর্ম-সম্পৃক্ত নয় তা সবাই স্বীকার করেছে। সুতরাং শাসক বিশেষের অত্যাচার উৎপীড়ন জাতীয় কলঙ্করূপে চিত্রিত হওয়াও উচিত নয়। যেমন গণেশের পুত্র জালালউদ্দীন যে কয়জন ব্রাহ্মণকে জোর করে ইসলামে দীক্ষিত করিয়েছিলেন, তা একান্তভাবেই তার ব্যক্তিগত আক্রোশবশে। ইসলাম বা মুসলমানের এর সঙ্গে কোনো যোগ ছিল না। ভারতে ইসলাম প্রচারে কোনো কোনো রাজশক্তির সহানুভূতি ছিল হয়তো। কিন্তু সহযোগিতা যে ছিল না তা অস্বীকার, করবার উপায় নেই। তুর্কী মুসলমানেরা রাজত্ব করতে এসেছিল ধর্ম প্রচার করতে নয়। অবশ্য মুসলমান বিজয়ের আনুষঙ্গিক ফল পরোক্ষভাবে ইসলাম প্রচারের সহায়ক হয়েছিল। বিদ্যাপতির কীর্তিলতায় এবং বৈষ্ণব গ্রন্থগুলোতে মুসলমান অত্যাচারের যেসব কথা বর্ণিত হয়েছে, তাদের সত্যতা স্বীকার করেও বলা যায় এসব অত্যাচার-উৎপীড়ন অহেতুক ছিল বলে বিশ্বাস করা উচিত নয়। আধুনিক গণতান্ত্রিক যুগেও স্বদেশী সরকার প্রতিদ্বন্দ্বী স্বজাতির উপর রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে রূঢ় ও কঠোর হতে বাধ্য হয়। বিরোধীদল একে অকারণ অত্যাচার-উৎপীড়ন বলে রটিয়ে থাকে। কে না জানে সকারণ শাস্তি চিরকালই শাস্তিভোগীর দ্বারা অকারণ উৎপীড়ন বলে বর্ণিত হয়? আত্মপক্ষ সমর্থন মানুষের সহজাত বৃত্তি। আবার কোনো কোনো মুসলমানের কাফেরদের প্রতি অবজ্ঞা, কাফের সম্বন্ধে ব্যক্তিগত দায়িত্বহীন উক্তি ও কার্য পুঁথিপত্রে বিস্তৃত থেকে গোটা মুসলমান জাতিরও কলঙ্কবাদী ঘোষণা করছে। বস্তুত ব্রাহ্মণ্য ও বৌদ্ধদের মধ্যে যেভাবে ধর্মীয় সংঘর্ষ হয়েছে এবং হবার কারণ ছিল, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে সে কারণ থাকার কথা নয়। ওটাতে প্রতিবেশীসুলভ বহুকাল পোষিত আক্রাশের রেশ ছিল, এটাতে ছিল না। কেননা দীক্ষিত মুসলমানের বিরলতার দরুন মুসলমান তখনো হিন্দুর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী হয়ে উঠেনি। তখন কেবল বিদেশী প্রশাসক মুসলমান ও দেশী হিন্দুই ছিল–অনেকটা ইংরেজ শাসক ও ভারতীয় প্রজার মতো।
