যে- দেবতাকে নিজের সুখ-দুঃখের কথা নিজমুখে নিবেদন করা চলে না, যে, ধর্মের ক্রিয়াকাণ্ড নিজের আচরণ-সাধ্য নয়, যে-ধর্মের বাণী নিজমুখে উচ্চারণ ও নিজ কানে শ্রবণ সম্ভব নয়, তার সঙ্গে কারো আত্মিকযোগ থাকার কথা নয়। একারণে লোকেরও কোনো অন্ধসংস্কারের বন্ধন ছিল না। তাই ভারতময় বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম সহজেই প্রচারিত হতে পেরেছিল।
আর্য-অনার্যের বিভেদ যখন ঘুচে গেল, তখন দেশ বা মানুষ অবিশেষের কাছে বুদ্ধ-মহাবীরের বাণী পৌঁছিয়ে দেবার পক্ষে কোনো বাধা রইল না। এ সময়েই প্রথম জৈন ওবৌদ্ধ ভিক্ষুগণ মগধের সীমা অতিক্রম করে রাঢ়ে-পুণ্ডে তথা আধুনিক বাঙলাদেশে নবধর্ম প্রচারের জন্যে উপস্থিত হলেন। এদেশের বর্বর-প্রায় জনগণের মধ্যে আর্যভাষা ও সংস্কৃতির আবরণে এই দ্রোহী-ধর্ম অর্থাৎ জৈন বৌদ্ধ মতবাদ প্রচারিত হল। এদের লিপি ছিল না, সাহিত্যের শালীন ভাষা ছিল না, উঁচুমানের সংস্কৃতি ছিল না; তাই আর্যধর্মের (নামত অবশ্য) সঙ্গে আর্যভাষা আর সংস্কৃতিও তাদের বরণ করে নিতে হল। এভাবে বাঙলাদেশে অল্পকালের মধ্যে আর্যধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি প্রসার লাভ করল এবং এসঙ্গে কিছুসংখ্যক তথাকথিত আর্যও এদেশে প্রচার উপলক্ষে বসবাস করতে শুরু করেছিল বলে অনুমান করতে বাধা নেই।
.
০৫.
বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মান্দোলনকে আমরা অনার্য অভ্যুত্থানও যে বলতে পারি তার পক্ষে কিছু তথ্য আছে। মেঘাস্থিনিসের বিবরণে দস্যু সর্দারের রাজ্যলাভ এবং নাপিতপুত্ররূপে ঘৃণিত নৃপতির কথা আছে। রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন–শূদ্রগণ অনার্য বংশ সম্ভুত।… .. শিশুনাগ বংশীয় মহানন্দের শূদ্ৰাপত্নীর গর্ভজাত পুত্র ভারতের সমস্ত ক্ষত্রিয়কুল নির্মূল করিয়া একচ্ছত্র সম্রাট হইয়াছিলেন। … … মগধে শূদ্রবংশের অভ্যুত্থান ও আর্যাবর্ত পুনর্বার নিঃক্ষত্রিয় করণের প্রকৃত অর্থ বোধহয় যে, এই সময়ে বিজিত অনার্যগণ অবসর পাইয়া পুনরায় মস্তকোত্তোলন করিয়াছিলেন এবং মহাপদ্মনন্দের সাহায্যে ক্ষত্রিয় রাজকুল নির্মূল করিয়ছিলেন। মহাপদ্মনন্দের পূর্বে ভারতবর্ষে কোনো কোনো রাজা সমগ্র আর্যাবর্ত অধিকার করিয়া একরাট পদবী লাভ করিতে পারেন নাই।
রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্তে যদি ত্রুটিও থাকে, তবু আমরা বলতে পারি মহানন্দ, চন্দ্রগুপ্ত কিংবা অশোক–এ তিনজনের যে-কোনো একজনের নেতৃত্বে অনার্য অভ্যুত্থান সফল হয়েছিল। রাজবংশী প্রভৃতি কৈবর্ত শূদ্রগণও একসময় আর্য শাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। গৌতমবুদ্ধের দেব-দ্বিজ ও বেদদ্রোহিতা এতই তীব্র ছিল যে নির্বাণকালে তিনি নাকি সংস্কৃত-চর্চা করতে নিষেধ করে যান। মহাভারতে আর্য-অনার্যের যুদ্ধ-বিগ্রহের বহু কাহিনী আছে। বাসুকীর বিদ্রোহ, বৃত্রের দেবতাতাড়ন, রাবণের সীতাহরণ প্রহাদের আর্যধর্ম গ্রহণ, রামের হরধনু ভঙ্গকরণ, রামের পাদস্পর্শে অহল্যার প্রাণলাভ-অগস্ত্যের দাক্ষিণাত্য যাত্রা প্রভৃতি আর্য-অনার্যের সংঘর্ষ ও মিলনের কাহিনী। ব্যাস, বশিষ্ট, নারদ, সত্যকাম, শুকদেব প্রভৃতির জন্ম অনার্যার গর্ভে। আর্যেরা যে অনার্য সুন্দরীদের ধর্ষণ করত এগুলো তারও নজির।
.
০৬.
মনে করা যাক, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্ম প্রচারিত হওয়ার আগে বাঙলাদেশে আর্য-প্রভাব পড়েনি। কিন্তু দেশে মানুষ ছিল অথচ তাদের ভাষা ছিল না, সুখ-দুঃখের গান বা গাথা ছিল না, ছড়া ছিল না, বচন ছিল না কিংবা ধর্মসঞ্জাত সংস্কার ছিল না–এমন হতেই পারে না। কাজেই মেনে নিতে হয় যে, আর্যপূর্ব যুগে এদেশে কোনো একটি সর্বজনীন ভাষা কিংবা গোত্রীয় ভাষাগুলো চালু ছিল। জৈন-বৌদ্ধ ধর্ম বরণ করে নিয়ে তারা নিজেদের ভাষা ত্যাগ করে উন্নত আর্যভাষা গ্রহণ করে। এর সঙ্গে তাদের বিশিষ্ট সংস্কৃতির ও বস্তুর নির্দেশক কিছু কিছু শব্দ ও বাগ্বিধি আর্যভাষার (সম্ভবত মাগধী প্রাকৃত) সঙ্গে মিশে গেল। কোনো জাতির ভাষা ও সংস্কৃতি অপরিণত থাকলে সেগুলোকে উন্নততর ভাষা ও সংস্কৃতির চাপে পড়ে অপমৃত্যু বরণ করতে হয়। সবক্ষেত্রে না হলেও কোনো কোনো অবস্থায় এ বিপদ এড়ানো যায় না। বাঙলা সেদিন এই শেষোক্ত অবস্থায় পড়েছিল। কোনো ভাষা সেকালে কোনো ধর্মবিপ্লবের বাহন হলে তার বিকাশ দ্রুততর হত একালে যেমন হয় রাষ্ট্রভাষা কিংবা কোনো মতবাদের বাহন হলে। এর প্রসারও হত কারণ কোনো ভাষা কোনো ধর্মবিপ্লবের বাহন হলে তার প্রভাব এড়ানো সে-ধর্মে দীক্ষিত জাতির পক্ষে অসম্ভব। এবং যে, কোনো ভাষার প্রসার নতুন ভাব-চিন্তা ও নতুন বস্তু ভিত্তিক। জৈন ধর্ম নয়–বৌদ্ধমতবাদই বাঙলাদেশে বিশেষভাবে গৃহীত হয়েছিল। যারা এ মতবাদ গ্রহণ করতে পারেনি, তারা আত্মরক্ষা কিংবা স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবার জন্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলে তথা বনে-জঙ্গলে পালিয়ে যায়। এজন্যেই আজো কোল, ভীল, মুণ্ডা, কুকী, লেপচা, ভুটিয়া প্রভৃতি নিজেদের ভাষা ও বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেছে দেখতে পাই। এসব ভাষাকেই সম্ভবত আর্য-মঞ্জুশ্রীমূলকল্পে (৮ম শতক খৃ.) অসুরভাষা বলে উল্লেখ করা হয়েছে : অসুরানাং ভবেৎ বাঁচা গৌড়-পুন্ড্রোদ্ভবা সদা। কিংবা ঐতরেয় আরণ্যকে বায়াংসির বুলি বলে নিন্দিত হয়েছে।
.
০৭.
ব্রাহ্মণ্য-উৎপীড়ন থেকে নিষ্কৃতির উপায়রূপে জনগণ বৌদ্ধ ও জৈনমত উৎসাহের সাথে গ্রহণ করলেও প্রথম উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে উভয় ধর্মে নানা বিকৃতি দেখা দিল। কারণ এ দুটো ধর্মের শিক্ষা ও অনুশাসন জৈব ধর্মের এতই প্রতিকূল যে তা প্রাত্যহিক জীবনে আচরণসাধ্য নয়। সাধারণভাবে মানুষের জীবনে সাধনা হচ্ছে ধন- জন-মানের সাধনা। অন্তরের অভাব ও অতৃপ্তিবোধই আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং কর্ম প্রেরণারূপে প্রকাশিত হয়, ভোগেচ্ছাবিহীন জীবন সাধারণ মানুষের কল্পনাতীত। অথচ বৌদ্ধ ও জৈনধর্মের মূল কথা বৈরাগ্য–তৃষ্ণাবিহীন জীবন সাধনা অর্থাৎ ব্যবহারিক জীবনকে পঙ্গু ও অথর্ব করে তোলা। তাই বৌদ্ধধর্মের বিকৃতি ও বৌদ্ধদের নৈতিক চারিত্রিক দৌর্বল্যের সুযোগে শঙ্করাচার্য প্রমুখের নেতৃত্বে ব্রাহ্মণ্য শক্তি আবার সুপ্রতিষ্ঠিত হল।
