অথবা
ক্ষেপা তুই না-জেনে তোর আপন খবর যাবি কোথায়।
আপন ঘর না-বুঝে বাইরে খুঁজে পড়বি ধাঁধায়
আমি যেরূপ, দেখুনা সেরূপ দীন দয়াল।
কিংবা
ডুবে দেখ দেখি মন–তারে–কিরূপ লীলাময়
যারে আকাশ পাতাল খোঁজ এই দেহে তিনি রয়।
লামে আলিফ লুকায় যেমন মানুষে সাঁই আছে তেমন।
তা না হলে কি সব নূরের তন
আদম তনকে সেজদা জানায়।
অথবা,
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মন-বেড়ী দিতাম তাহার পায়।
বা
কারে বলব কেবা করে বা প্রত্যয় —
আছে এ মানুষে সত্য নিত্য চিদানন্দময়।
আত্মা আর পরমাত্মা ভিন্ন ভেদ জেনো না।
এই মানুষে রঙ্গে রসে বিরাজ করেন সাঁই আমার ( পাঞ্জু)
কেননা রুমীও বলেন :
I gaged into my own heart, there I saw Him. He was nowhere else.
কিংবা,
I, All in All becoming
Now clear see God in All
Ends up from union yearning
take flight the cry of Love.
রবীন্দ্রনাথও বলেন :
আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে
(আমি) তাই হেরি তায় সকল খানে।
–ও তোরা আয়রে ধেয়ে দেখরে চেয়ে আমার বুকে
ওরে দেখরে আমার দু নয়নে।
কিংবা
আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিল দেখতে আমি পাইনি
বাহির পানে চোখ মেলেছি হৃদয় পানে চাইনি।
অথবা,
আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না
এই জানারই সাথে সাথে তোমায় চেনা।
এমনি বোধেরই গাঢ়তায় জীবাত্মা-পরমাত্মার ব্যবধান ঘুচে যায়। ইরানের সূফীমত ও ভারতের বেদান্ততত্ত্ব বাঙলার মাটিতে বাউল বাণীতে প্রত্যক্ষ বিরাজ করে। সূফী বৈষ্ণবদের মতো গানের মাধ্যমেই বাউলদের সাধন ভজন চলে :
বীণার নামাজ তারে তারে, আমার নামাজ কণ্ঠে গাই।
.
চ.
বাউলেরা রাগপন্থী। কামাচার বা মিথুনাত্মক যোগসাধনাই বাউল পদ্ধতি। ইন্দ্রিয় নিরোধ, বিষয় ত্যাগ কিংবা বৈরাগ্য এদের লক্ষ্য নয়। তবু প্রাচীন ভারতিক ঐতিহ্য প্রভাবে মুনি, আজীবক, ভিক্ষু, সাধু, সন্ন্যাসী, বৈষ্ণব, বৈরাগী প্রভৃতির মতো বাউলেও ভিক্ষাজীবী বৈরাগী আছে। সে হিসেবে বাউল দুই প্রকার: গৃহী ও বৈরাগী। বর্তমানে এরা বহু উপসম্প্রদায়ে বিভক্ত। হযরতী, গোবরাই, পাগল নাথী, খুশী বিশ্বাসী, সাহেব ধনী, জিকির, ফকির, বাউল, আউল, কৰ্তর্ভজা, সাঁই, ন্যাড়া, বলরামী, শম্বুচাদী, রামবল্লভী প্রভৃতি নাম থেকে তাদের সম্প্রদায়ের প্রবর্তকের নাম ও সাধনপন্থার আভাস পাওয়া যায়। এদের সম্প্রদায়ের গুরুপরম্পরার ও ধর্ম-দর্শনের কোনো নির্ধারিত ইতিহাস বা শাস্ত্রগ্রন্থ নেই। তাই এসব মতের উন্মেষ, বিকাশ ও পরিণতির খবর পাওয়া দুষ্কর। বিশেষ করে বাউলেরা প্রায় অশিক্ষিত, তাদের শ্রুতি-স্মৃতির উপর তেমন নির্ভর করা চলে না। বাউল সাধনার মর্মকথা বাউল কবির ভাষায় এরূপ :
সখি গো জন্মমৃত্য যাহার নাই।
তাহার সঙ্গে প্রেম গো চাই।
এবং —
উপাসনা নাইগো তার
দেহের সাধন সর্বসার
তীর্থব্রত যার জন্য–
এ দেহে তার সব মিলে।
বাউল কবিদের মধ্যে : লালন শাহ, শেখ মদন, গঙ্গারাম, পাগলা কানাই, পাঞ্জু শাহ পদ্মলোচন ( পোদো) জাদু, দুদু, পাঁচু, চণ্ডী গোঁসাই, রশীদ, হাউড়ে গোঁসাই গোলাম গোঁসাই, চণ্ডীদাস গোঁসাই,ফুলবাসুদ্দিন, ঈশান, বাখেরা শাহ, এরফান শাহ, সৈয়দ শাহ নূর, মিয়া ধন, শীতলাঙ শাহ, আতর চাঁদ, তিনু, শ্রীনাথ, শেখ কিনু প্রভৃতি জনপ্রিয়।
বাউল গানের অনুরাগী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর রচনায় বাউল প্রভাবও কম নয়। তাঁর। ভাষাতেই আলোচনা শেষ করছি : বাউল গান) থেকে স্বদেশের চিত্তের একটা ঐতিহাসিক পরিচয় পাওয়া যায়। এ জিনিস হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই। একত্র হয়েছে অথচ কেউ কাউকে আঘাত করেনি। এ মিলনে গান জেগেছে। এ গানের ভাষায় ও সুরে হিন্দু-মুসলমানের কণ্ঠ মিলছে। কোরানে পুরাণে ঝগড়া বাধেনি।
বাঙলা সাহিত্যের উপক্রমণিকা
০১.
পাক-ভারত বর্ণ-সঙ্কর জাতি অধ্যুষিত দেশ। গ্রীক শক হুন কুশান তুর্কী মুঘল ও ইংরেজ জাতির আগমন ও বসবাস তো ঐতিহাসিক ব্যাপার। তারও আগে যারা এদেশে এসেছিল তাদের মধ্যে দ্রাবিড় আর্য নিগ্রো অস্ট্রিক মঙ্গোলীয়দের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়াও আরো কত জাতি এদেশে বিজয়ীর বেশে এসেছে–সে খবর কারুর জানা নেই সত্য, কিন্তু অনুমান করা যায় পাক ভারত চিরকাল বিদেশী বিজিত দেশই ছিল।
ভাগ্যের সে এক পরিহাস। এদেশে যারাই যখন এসেছে কিছুকাল পরে তারা বীর্যহীন হয়ে পড়েছে ফলে বিদেশ থেকে নতুন নতুন জাতি এসে তাদের উপর আধিপত্য করেছে। এটি হয়তো এদেশের আবহাওয়ারই প্রতিক্রিয়া।
আসল কথা, কোনো জাতির চারিত্রিক বিকৃতি না ঘটলে তার পতন হয় না। এ বিকৃতির দরুন যখন সমাজে, ধর্মে ও রাষ্ট্রে বিপর্যয় ঘটে, অর্থাৎ দেশের বেশির ভাগ লোক নীতিবোধ হারিয়ে ফেলে; ন্যায়নিষ্ঠা ও সততা প্রভৃতির প্রতি শ্রদ্ধাহীন হয়ে পড়ে; মহৎ ও বৃহতের সাধনায় পরাজুখ হয়; তখন তার পতন অনিবার্য হয়ে উঠে।
পুরাকালের কোনো খবর ইতিহাস দিতে পারে না। কিন্তু মধ্যযুগে কোনো কোনো ব্যাপারে আমরা এ বিপর্যয়ের আভাস পাচ্ছি। মধ্যযুগে বিদেশী বহু দরবেশ ও প্রচারক এদেশে ধর্মপ্রচার করতে আসেন। তাদের অনুচররূপে আসে নানা মন ও মতের বহুলোক। এদেশের সমাজ ও শাসন সম্বন্ধে কৌতূহলী লোকেরও অভাব ছিল না এদের মধ্যে। রাজনীতি সচেতন স্বদেশপ্রাণ ও স্বজাতি-বৎসল কেউ কেউ হয়তো এদেশের দণ্ডশক্তির দৌর্বল্যের খবর দিয়ে স্বজাতি-স্বদেশীকে এদেশ জয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে অন্তত আজকাল ঐতিহাসিকেরা তাই অনুমান করেন।
