ভেদবুদ্ধিহীন মানবতার উদার পরিসরে সাম্য ও প্রেমের সুউচ্চ মিনারে বসেই বাউলেরা সাধনা করে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাধক ও দার্শনিকের কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে তারা সাম্য ও মানবতার বাণী প্রচার করে। এঁরা রুমী-হাফিজের সগোত্র সাধক। বাউল গুরুরা একাধারে কবি, দার্শনিক, ধর্মবেত্তা ও মরমী। তাদের গান লোকসাহিত্য মাত্র নয় বরং বাঙালির প্রাণের কথা, মনীষার ফসল ও সংস্কৃতির স্বাক্ষর।
বাউলের রূপক অভিব্যক্তিতে পরমাত্মা হচ্ছেন : মনের মানুষ, সহজ মানুষ, অধর মানুষ, অটল মানুষ, রসের মানুষ, সোনার মানুষ, মানুষ রতন, মনমরা, অলখ সই প্রভৃতি। চর্যাপদ, দোহা প্রভৃতি সব মরমীয়া রচনার মতো বাউলগানও সাধারণত রূপকের আবরণে আচ্ছাদিত। সে-রূপক দেহধার, বাহ্যবস্তু ও ব্যবহারিক জীবনের নানা কর্ম ও কর্মপ্রচেষ্টা থেকে গৃহীত। কারণ All creation-wonders excite the cry of Love. (foto)
বলেছি, ব্রাহ্মণ্য শৈব ও বৌদ্ধ সহজিয়া মতের সমবায়ে গড়ে উঠেছে একটি মিশ্ৰমত–যার নাম নাথপন্থ। বামাচার নয়, কায়াসাধন তথা দেহতাত্ত্বিক সাধনাই এদের লক্ষ্য। হঠযোগের মাধ্যমেই এ সাধনা চলে। একসময়ে এই নামপন্থ এবং সহজিয়া মতের প্রাদুর্ভাব ছিল বাঙলায়। এ দুটো সম্প্রদায়ের লোক একসময়ে ইসলামে ও বৈষ্ণবধর্মে দীক্ষিত হয়। কিন্তু পুরোনো বিশ্বাস সংস্কার বর্জন সম্ভব হয়নি বলেই ইসলাম ও বৈষ্ণব ধর্মের আওতায় থেকেই এরা নিজেদের পুরোনো প্রথায় ধর্মসাধনা করে চলে। তার ফলেই হিন্দু-মুসলমানদের মিলিত বাউল মতের উদ্ভব। বাউলেরা অশিক্ষিত। এজন্যেই তাদের কোনো লিখিত শাস্ত্র নেই। এবং তাদের মতবাদের কালিক কিংবা দার্শনিক পরিচয় তারা দিতে পারে না। সমাজের অজ্ঞ ও গরিব লোকের মধ্যেই এ সাধনা আবদ্ধ বলে বাউলমত শিক্ষিত লোকের শ্রদ্ধা পায়নি, সেজন্যে পণ্ডিতের আলোচনার বিষয়ও হয়নি। রবীন্দ্রনাথই প্রথম এদের প্রতি শিক্ষিত সাধারণের ঔৎসুক্য জাগান।
গুণী ও মরমী হয়েও বাউলেরা সমাজে উপেক্ষিত। বাউল সম্প্রদায়ে জাতি ও শ্ৰেণী-বৈষম্য নেই। হিন্দু-মুসলিম ভেদ নেই। হিন্দু গুরুর মুসলিম-শিষ্য, মুসলিম গুরুর হিন্দু-সাগরেদ গ্রহণে কোনো দ্বিধা-বাধা নেই। তাই বাউল মনাই শেখের শিষ্য কালাচাঁদ মিস্ত্রি, তাঁহার শিষ্য হারাই নমশূদ্র, তাহার শিষ্য দীনু জাতিতে নট, তাঁহার শিষ্য ঈশান যুগী, তাঁহার শিষ্য মদন। নিত্য নাথের শিষ্য বলা কৈবর্ত, তাহার শিষ্য বিশা ভূঁইমালী, তাঁহার শিষ্য জগা কৈবর্ত, তাঁহার শিষ্য মাধা পটিয়াল বা কাঁপালী, তাহার শিষ্য গঙ্গারাম। গঙ্গারাম ও মদন দুই বন্ধু ছিলেন। গঙ্গারামের ব্রাহ্মণ শিষ্যও ছিলেন।
অনার্য-অধ্যুষিত বাঙলা দেশে জনগণ চিরকাল অত্যধিক ভাবপ্রবণ। এই ভাবপ্রবণতা বা হৃদয়োচ্ছাস থেকেই বাঙালির গীতিকবিতার উদ্ভব। বাঙলা কেবল ধানের দেশ নয়, গানের দেশও। এখানকার মাটির ফসল ধান, মনের ফসল গান। শুধু বন্যাতেই দেশ প্লাবিত হয় না, গানেও হৃদয় প্লাবিত থাকে। লাল কাঁকরের পশ্চিমবঙ্গ শুষ্ক উত্তরবঙ্গ ও নদীবহুল পূর্ববঙ্গ-বাসীর দৃষ্টি চিরকাল আকাশের দিকে। শ্যামল সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যেমন আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতা জানায়, তেমনি প্রকৃতির নিদারুণ রুক্ষতায় কিংবা বিরূপতায় ঊর্ধ্বে দুচোখ তুলে ফরিয়াদও জানায়। মমতায় আঁকড়ে ধরা নয়, চরম ঔদাস্যে মোহ–মুষ্ঠি শিথিল করাই এদের জীবনাদর্শ। তাই চর্যাপদের দেশেই বৈষ্ণব-বাউলের উদ্ভব। মূলত সবগুলিই এক। প্রকাশভঙ্গিই ভিন্ন। সিদ্ধ-সূফী-যোগী-বৈষ্ণবেরা যেমন গুরুবাদী, বাউলেরাও তাই। বাঙালির স্বভাবেই রয়েছে মরমীয়াবাদ।
এই ভাবপ্রবণ বাঙালি-হৃদয়ে স্রষ্টা, সৃষ্টি ও রহস্যময় মানবজীবন সম্বন্ধে যে জিজ্ঞাসা জেগেছে সেই জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজতে বাঙালি কেবল কালে কালে ঘরছাড়া হয়নি আত্মহারাও হয়েছে। সেইজন্যে এদেশে যুগে যুগে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্যধর্ম লৌকিক দেবতার কাছে হার মেনেছে।
তাই স্মার্ত রঘুনন্দনের ব্রাহ্মণ্য ধর্মের ও শরিয়তী ইসলামের নিষেধের বেড়া ভেঙে, জগৎ ও জীবনের রহস্যসন্ধানী বাঙালি নিজের মনের মতো পথ তৈরি করে নিয়েছে।
এজন্যেই এক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলমান একগুরুর দীক্ষা নিয়ে মনে মনে এক হতে পেরেছে। স্রষ্টার একটা সর্বজনীন রূপ দেওয়ার জন্যেই বাউলেরা অনামক অলখসইর সন্ধানী। এজন্যেই তারা সহজে বলতে পারে :
কালী কৃষ্ণ গড খোদা
কোনো নামে নাহি বাধা।
মন, কালী কৃষ্ণ গড খোদা বলো রে।
.
ঙ.
পথের পার্থক্য মতের অনৈক্য এবং সাধন পদ্ধতির বিভিন্নতা সত্ত্বেও বাউল, বৈষ্ণব ও সূফীর মধ্যে উদ্দেশ্য লক্ষ্য ও পরিণামগত মিল বর্তমান। তাই একের বাণীতে অপরের মনের কথার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। এক চরম ক্ষণে দেহাধারস্থিত আত্মায় পরমাত্মার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। তখন পরমকে উপলব্ধির আনন্দে সবাই একই সুরে বলে আনল হক কিংবা সোহম। এই অদ্বৈতসিদ্ধি আমরা বাউলে বৈষ্ণবে সূফীতে প্রত্যক্ষ করি। রাগাত্মিকা ভক্তিতে শুনি মুই সেই সূফীরাও বলেন আনল হক বাউলও বলেন দেহের মাঝে আছেরে সোনার মানুষ ডাকলে কথা কয়। বাউল যেমন বলেন
এই মানুষে আছেরে মন
যারে বলে মানুষ রতন।
