এ অনুমানের সপক্ষে অন্তত কিছু তথ্যের আকস্মিক যোগাযোগও রয়েছে। হযরত খাজা মঈন উদ্দীন চিশতির আগমনের পর মুসলমানদের দিল্লী রাজ্য দখল বাবা আদমের আগমনে সোনারগাঁ জয়, শাহজালাল ও বদর আল্লামাহর খানকা করার পরে যথাক্রমে শ্রীহট্ট ও চট্টগ্রাম বিজয় প্রভৃতি ঐতিহাসিকের অনুমানের পরিপোষক। এভাবেই ইংরেজ ফরাসির রাজ্যলাভ তো একরকম চোখে দেখা সত্য। অবশ্য দরবেশ- প্রচারকদের উপর এসব রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কেউ আরোপ করে না।
ইতিহাস-আশ্রয়ী ঘটনার কথাই বলি। য়ুরোপীয় বেনেরা এল বাণিজ্য করতে। এদেশের আদর্শচ্যুত নির্বোধ দণ্ডধরদের দুর্বলতা টের পেয়ে শুরু করল লুটপাট আর জনগণের উপর উৎপীড়ন। বাধা না পেয়ে বেড়ে গেল তাদের সাহস ও লোভ। আর বেনেবৃত্তি একসময় রাজশক্তিতে রূপান্তরিত হল। ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পলাশী আর অর্ধভারতের ভাগ্যবিধাতা দুর্ধর্ষ মারাঠাগণ। কিন্তু তাদের সঙ্-শক্তি ছিল না। তাই ছিদ্রপথ নদী হয়ে দেখা দিল, সাতসাগরের ওপারের কুমির এসে জুড়ে বসল। এমনি-ই হয়।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে এদেশে ক্ষাত্রধর্মের অনুকূল পরিবেশ নেই। তাই শক হুন দল পাঠান মুঘল শক্তি একই পথে লোপ পেল।
.
০২.
এজন্যেই পাক-ভারত সঙ্কর জাতির দেশ। বাঙলা দেশের পক্ষে এ-কথা আরো খাঁটি। আদিকাল থেকে এদেশে নানা বর্ণের ও গোত্রের লোকের বাস। পুণ্ড সুহ্ম বঙ্গ গৌড় রাঢ় প্রভৃতি যে গোত্রবাচক শব্দ তা বিশ্বাস করবার কারণ রয়েছে। এগারো-বারো শতকের সংস্কৃত পুরাণগুলোতে এদের বহুবচনের রূপ পাওয়া যাচ্ছে : গৌড়াঃ বঙ্গাঃ রাঢ়াঃ প্রভৃতি। এতে বোঝা যায় এক-একগোষ্ঠী বা গোত্রের বসতি-অঞ্চল বাসেন্দাদেরই গোত্রীয় নামে পরিচিত হত। *
অস্ট্রিক আলপাইন পামিরীয় দ্রাবিড় আর্য নিগ্রো মঙ্গোলীয় প্রভৃতি জাতির সমবায়ে আধুনিক বাঙালি জাতির উদ্ভব। সাত শতকের গোড়ার দিকে বোধহয় শশাঙ্কের নেতৃত্বে প্রথম বঙ্গ-গৌড় রাজ্য গড়ে ওঠে। চর্যাপদে বঙ্গ–এর সঙ্গে আল ও আলী প্রত্যয় যোগে বঙ্গাল ও বঙ্গালী শব্দ চালু হয় দেশ ও জাতি অর্থে। ঐতরেয় আরণ্যকেও ( আ. ৫ম শতক) বঙ্গ শব্দ দেশ বা জাতি অর্থে পাওয়া যায়। চর্যাপদে আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী বা অদঅ বঙ্গাল দেশ লুড়িউ আর সর্বানন্দের অমর কোষে (১১৫৯ খৃ.) বঙ্গাল বচ্চার শব্দ পাচ্ছি। নিত্যাহ্নিকতিলকে (লিপিকাল ১৩৯৫ খৃ.) বঙ্গিদেশ ব্যবহৃত হয়েছে। মুঘল আমলেই কেবল গৌড়- বঙ্গাদি অঞ্চল সুবা-ই বঙ্গাল নামে আখ্যাত হয়। ফলে কয়েকশ বছরের অব্যবহারে অন্য নামগুলো অপরিচিত হয়ে উঠল, আর বঙ্গ নামটি গোটা সুবার জন্য ব্যবহৃত হতে থাকল। কাজেই বঙ্গ নামের প্রাচীনতা চর্যাপদ ও ঐতরেয় আরণ্যকের প্রাচীনতার ও প্রামাণিকতার উপর নির্ভর করে।
কোল ভীল ওরাও মুণ্ডা সাঁওতাল দ্রাবিড় চাকমা নাগা কুকী আর্য শক হুন তুর্কী মুঘল আরবি ইরানি হাবসী প্রভৃতি দুনিয়ার নানা গোষ্ঠী, গোত্র ও জাতির সমবায়ে উদ্ভূত আধুনিক বাঙালি জাতির মধ্যে তাই বিচিত্র আচার-সংস্কার, মননধারা, চারিত্রিক বৃত্তি প্রবৃত্তি ও রুচি-সংস্কৃতির আভাস আজো দুর্লভ নয়। দেহাকৃতিগত বৈচিত্র্যও কি কম!
[*মহাভারতেও আমাদের অনুমানের সমর্থন রয়েছে। মহাভারতোক্ত কাহিনী এরূপ : বলিরাজার মহিষী সুদেষ্ণা নিঃসন্তান ছিলেন। স্ত্রী-পুত্র কর্তৃক বিতাড়িত জন্মান্ধ মহর্ষি দীর্ঘতমাকে রাজা স্বীয় মহিষী সুদেষ্ণার গর্ভে ধর্মার্থকুশল পুত্র উৎপাদন করিতে অনুরোধ করিলেন তদনুসারে মহর্ষি দীর্ঘতমার ঔরসে বলিরাজ-মহিষী সুদেষ্ণার গর্ভে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ, পুণ্ড ও সুহ্ম নামে পাঁচ পুত্র জন্মে। দীর্ঘতমা সুদেষ্ণাকে বর দিয়াছিলেন তোমার পুত্রগণের অধিকৃতরাজ্যসমূহ তাহাদের নামে খ্যাত হইবে।]
.
০৩.
আমাদের দেশে আর্য ছাড়া আর সব গোত্রীয় মানুষই অনার্য–এই সাধারণ নামে পরিচিত। সংস্কারবশত আমরা অনার্য বলতে অসভ্যই বুঝে থাকি, যেন অনার্য অসভ্য–এর প্রতিশব্দ। দেশের পুরোনো ইতিহাসের যেসব উপাদান পাওয়া যাচ্ছে তাদের সবগুলোই আর্য ভাষায় ও আর্য প্রভাবে লিখিত বা উক্ত। তাই ঋগ্বেদের আমল থেকে আজ পর্যন্ত অনার্যদের সম্বন্ধে যা-কিছু বলা হয়েছে তা নিন্দা ও অবজ্ঞাসূচক। অনার্যেরা বিজেতার গৌরব-গর্বী আর্যদের কাছে মানুষ নামের যোগ্যও ছিল না। এজন্যই বিভিন্ন গোত্রের অনার্যেরা আর্যসমাজে দস্যু, রাক্ষস, যক্ষ, নাগ, পক্ষী, কুকুর, দৈত্য প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। অবশ্য আদিতে এগুলো ছিল টোটেম নামে। কিন্তু আর্যেরা ব্যবহার করেছে অবজ্ঞার্থে। দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ, রাক্ষসকুলে রাবণ, নাগকুলে বাসুকী জরকারু, যক্ষকুলে কুবের প্রভৃতির কাহিনী আমরা পাচ্ছি। মহাভারত ও পুরাণাদিতে অনার্যদের সম্বন্ধে নানা উদ্ভট কাহিনী বর্ণিত রয়েছে। অথচ এই যুগে আমরা জানতে পারছি কোনো কোনো অনার্য গোত্র বিশেষত দ্রাবিড়েরা আর্যদের চেয়েও সভ্য ও উন্নত ছিল। তার প্রমাণ কেবল ময়েঞ্জোদারো, হরপ্পা ও কোটদিজির আবিক্রিয়ায় নয়–আর্য ধর্ম ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও প্রত্যক্ষভাবে পাচ্ছি। ঋগ্বেদের আলোকে উত্তরকালের আর্যশাস্ত্রগ্রন্থগুলো যাচাই করলে আমরা দেখতে পাব, সেখানে শুধু যে অনার্য দেব-দেবীরাই ভিড় জমিয়েছে তা নয়-জ্ঞান ও ভক্তিবাদ, যোগ আর সাখ্যদর্শনও গড়ে উঠেছে যা একান্তভাবে অনার্য প্রভাব প্রসূত।
