.
গ.
বাউলগান আমাদের তত্ত্ব-সাহিত্যের অন্যতম শাখা। মুসলিম প্রভাবে তথা সূফীবাদের প্রত্যক্ষ সংযোগে এক প্রাচীন মতের রূপান্তরে বাউল মতের উদ্ভব হয়েছে। সে মতের জড় রয়েছে প্রাচীন ভারতে। আদিকাল থেকেই মানুষ সাধারণভাবে দৈহিক শুচিতাকে মানস-শুচিতার সহায়ক হিসেবে বিবেচনা করেছে। এজন্যে যে-কোনো ধর্মমতে উপাসনাকালে দৈহিক পবিত্রতা আবশ্যিক। মনে হয় এ বোধেরই পরিণতি ঘটেছে দেহাত্মবাদে ও দেহতত্ত্বে। যোগে, সাংখ্যে বৌদ্ধ ও হিন্দুতন্ত্রে এবং সূফীসাধন তত্ত্বে দেহকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। দেহের আধারে যে-চৈতন্য সেই তো আত্মা। এ নিরূপ নিরাকার আত্মার স্বরূপ-জিজ্ঞাসা শারীরতত্ত্বে মানুষকে করেছে কৌতূহলী। এ থেকে মানুষ বুঝতে চেয়েছে–দেহযন্ত্র নিরপেক্ষ আত্মার অনুভূতি যখন সম্ভব নয় তখন আত্মার রহস্য ও স্বরূপ জানতে হবে দেহযন্ত্র বিশ্লেষণ করেই। এভাবে সাধনতত্ত্বে যৌগিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব দেয়া হয়েছে অসামান্য। তাই এদেশে অধ্যাত্ম সাধনায় যোগাভ্যাস একটি আবশ্যিক আচার। যোগসাধন পাক ভারতের একটি আদিম অনার্য শাস্ত্র। বৌদ্ধযুগে এর বহুল চর্চা ছিল। বাঙলায় পাল আমলের তান্ত্রিক বৌদ্ধমতের একটি শাখাই মধ্যযুগে সূফী প্রভাবে বৈষ্ণব সহজিয়া ও বাউল মত রূপে প্রসার লাভ করে। এভাবে চর্চাগীতির পরিণতি ঘটে সহজিয়া পদে ও বাউল গানে। তত্ত্ব-সাহিত্যে তথা মরমীয়া সাধনায় সাধারণভাবে যোগ আর সূফী সাধন তত্ত্বের ও পদ্ধতির মিশ্রণ ঘটেছে। সমাজ ও ধর্মের আচারিক প্রভেদ সত্ত্বেও শাসক-শাসিত সম্পর্কের অন্তরালে ভিন্নাদর্শমুখী দুটো জাতির মধ্য কী নিবিড় প্রাণের যোগ সৃষ্টি হয়েছিল তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ মেলে বাউল গানে ও এ ধরনের অন্যান্য রচনায়। জীবনের যে চিরন্তন প্রশ্নে আত্মার আকুলতা-উদার পটভূমিকায় ও বিস্তৃত পরিসরে তার সমাধান খুঁজতে চাইলে জাত, ধর্ম ও সমাজ চেতনার উর্ধ্বে উঠতেই হয়। মানস সংস্কৃতির এরূপ লেনদেন, এমনি আত্মিক যোগাযোগ চিরকালই মানুষের চিত্তপ্রসারের ও আত্মবিকাশের সহায়ক হয়েছে।
মুসলিম বিজয়ের পরে হিন্দু-মুসলমানের বিপরীতমুখী ধর্ম ও সংস্কৃতির সংঘর্ষে প্রথমে দক্ষিণ ভারতে, পরে উত্তরভারতে এবং সর্বশেষে বাঙলা দেশে হিন্দুসমাজে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এ আলোড়নের বাহ্যরূপ ধর্ম ও সংস্কৃতির সমন্বয় প্রয়াস। হিন্দুর মায়াবাদ ও তজ্জাত ভক্তিবাদ এবং ইসলামের সূফীতত্ত্বই এ আন্দোলনে প্রেরণা যুগিয়েছে। দক্ষিণ ভারতের ভক্তিধর্ম; উত্তর ভারতের সন্তধর্ম এবং বাঙলার বৈষ্ণব ও বাউল মত সূফীবাদের প্রত্যক্ষ প্রভাবের ফল। সেদিন ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মহিমা যে আবেগ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়েছিল তারই ফলে মন্দির ছেড়ে মসজিদে না গিয়ে উদার আকাশের নিচে স্রষ্টার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক পাতাবার এ নতুনতরো প্রয়াসমাত্র। তারা বুঝেছে যদিও হিন্দু ধাবই দেহরা, মুসলমান মসীত সেখানে তো আল্লাহ নেই। কবীরের ভাষায় তাদেরকে আল্লাহ বলেছেন :
মো কো কঁ টুড়ো বন্দে মৈ তো তেরে পাসর্মে
না মৈ দেবল না মৈ মসজিদ, না কাবে কৈলাসর্মে।
জীবাত্মার মধ্যেই পরমাত্মার স্থিতি। কাজেই আপন আত্মার পরিশুদ্ধিই খোদা প্রাপ্তির উপায়-তাই আত্মার স্বরূপ উপলব্ধির সাধনাই এদের প্রাথমিক ব্রত। এদের আদর্শ হচ্ছে Knoweth thyself; আত্মানাং বিদ্ধি–নিজেকে চেনো, হাদীসের কথায় মান আরফা নাফসাহু ফাঁকাদ আরাফা রাব্বাহু–যে নিজেকে চিনেছে সে আল্লাহকে চিনেছে। জীবনের পরম ও চরম সাধনা সে-খোদাকে চেনা।
.
ঘ.
ইরানি সূফী সাধনাও যৌগিক প্রক্রিয়া নির্ভর। পাক-ভারতের যোগ-সাধনার সঙ্গে পরিচয়ের পর। সূফীদের দেহচর্চায় যোগশাস্ত্রে প্রচুর প্রভাব পড়ে। সূফীদের দেহতত্ত্বের সঙ্গে যোগশাস্ত্রের সার্থক মিশ্রণ ঘটিয়ে উভয় প্রক্রিয়ার সমন্বয় সাধন করে যিনি পাক-ভারতের মুসলিম সমাজে বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করেন তাঁর নাম শেখ শরফুদ্দিন বু আলি কলন্দর শাহ (মৃত্যু ১৩২৪ খ্রী.)। তার প্রবর্তিত সাধনপদ্ধতির বাঙলা নাম যোগ কলন্দর। পানিপথে তার সমাধি আছে। উত্তরভারতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আর তাঁর খ্যাতি আজো ম্লান হয়নি। এক সময়ে বাঙলায় কলন্দর-পন্থী বৈরাগীর এমনি প্রাদুর্ভাব ছিল যে কলন্দর বলতে মুসলিম বৈরাগীই বোঝাত। কবিকঙ্কণ চণ্ডীতে আছে কলন্দর হৈয়া কেহ ফিরে দিবারাতি। ঋণ করি নাহি দাও, নহ কলন্দর। আর সূফীতত্ত্বের সঙ্গে এদেশের লোকের সাহিত্যিক পরিচয় ঘটে প্রথমে রুমীর মসনবী এবং পরে হাফিজ প্রভৃতির সৃষ্টির মারফৎ। ব্যবহারিক পরিচয় তো আগে থেকেই ঘটেছে, কেননা ভারতে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে প্রধানত সূফী দরবেশের ও তাদের অনুচরের মাধ্যমে।
আত্মা পরমাত্মার অংশ। কাজেই আত্মাকে জানলেই পরমাত্মাকে জানা হয়। তাই দেহধারাস্থিত আত্মাকে জানাই বাউলের ব্রত।
খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়
ধরতে পারলে মন-বেড়ী দিতাম তাহার পায়।
এ দেহের মাঝে আছেরে সোনার মানুষ ডাকলে কথা কয়।
বাউলেরা তাদের ভাষায় অচিন পাখি, অলখ সাঁই (অলক্ষ্য স্বামী) মনের মানুষ বা মানুষ রতন-রূপ আত্মা তথা পরমাত্মাকে জানবার সাধনা করে। বৈষ্ণব বা সূফীর মতো এরা প্রেমিক নয় যোগীর মতো তাত্ত্বিক। বাউল গান একাধারে ধর্মশাস্ত্র ও দর্শন-সাধ, সঙ্গীত ও ভজন গান ও গীতিকবিতা। তথাপি ভাষায়, আঙ্গিকে ও ভঙ্গিতে এগুলো আমাদের লোকসাহিত্যেরই অন্তর্গত। মোটামুটিভাবে সতেরো শতকের দ্বিতীয় পাদ থেকেই বাউলমতের উন্মেষ। মুসলমান মাধববিবি ও আউলচাঁদই এ মতের প্রবর্তক বলে বাউল সম্প্রদায়ের বিশ্বাস। মাধববিবির শিষ্য নিত্যানন্দ-পুত্র বীরভদ্রই বাউল-মত জনপ্রিয় করেন। আর উনিশ শতকে লালন ফকিরের সাধনা ও সৃষ্টির মাধ্যমেই এর পূর্ণ বিকাশ।
