নতুন ঊষার স্বর্ণদ্বার।
খুলিতে বিলম্ব নাই আর।
রবীন্দ্রনাথের চিরকালই এ-বিশ্বাস ছিল যে-কোনো মহৎ মৃত্যুই বৃথা যায় না এবং রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে ছাড়া কোনো মহৎ কল্যাণ, কোনো বৃহৎ মুক্তি আসতে পারে না। কেননা পাপ ও পীড়ন, অন্যায় ও শোষণ দানবীয় শক্তিরই দান। সেই রাক্ষুসে রাহু- গ্রাসই ম্লান করে দিয়েছে– কালো করে দিয়েছে পৃথিবীর আলো। তাই আস্তিক্যবুদ্ধি নিয়ে কবি প্রশ্ন করেছেন :
মৃত্যুর অন্তরে পশি অমৃত না পাই যদি খুঁজে
সত্য যদি নাহি মেলে দুঃখ সাথে যুঝে,
পাপ যদি নাহি মরে যায়
আপনার প্রকাশ লজ্জায়,
অহংকার ভেঙ্গে নাহি পড়ে আপনার অসহ্য সজ্জায়,
তবে ঘর ছাড়া সবে
অন্তরের কি আশ্বাস রবে
মরিতে ছুটিছে শত শত
প্রভাত আলোর পানে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের মতো?
বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা
এর যত মূল্য সে কি ধরার ধূলায় হবে হারা?
রাত্রির তপস্যা সে কি আনিবে না দিন?
নিদারুণ-দুঃখরাতে
মৃত্যুঘাতে।
মানুষ চূর্ণিল যবে নিজ মর্তসীমা
তখন দিবে না দেখা দেবতার অমর মহিমা?
রবীন্দ্রনাথ গান্ধীপন্থী ছিলেন না, তিনি শক্তি দিয়ে শক্তির মোকাবেলায় আস্থা রাখতেন।
বাউল মত ও সাহিত্য
ক.
বাউলমতের উদ্ভব সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করেছি অন্যত্র। কিন্তু সেসব বাহ্য পরিচয়ই বহন করে। অন্তরঙ্গ পরিচয়ের জন্যে তত্ত্বকথার জাল বুনতে হবে এবং তাতে ইতিহাসের পাথুরে প্রমাণ প্রয়াগ করা সম্ভব হবে না। প্রমাণ যা থাকবে তা পরোক্ষ, তাই পঞ্জী হবে বিরল।
চলমান জীবন প্রতিমুহূর্তে বিচিত্ররূপে নিজেকে প্রকাশ করে। অভিব্যক্তির এ প্রবাহকে কোনো ছকে ফেলে যাচাই করা চলে না। এ-কথা কেবল ব্যক্তি সম্পর্কেই নয় জাতীয় জীবন সম্বন্ধেও সত্য। তবু জানবার-বুঝবার সুবিধের জন্য একটা মাপকাঠি স্বীকার না করলেই নয়। তাই সমাজ-নীতি ধৰ্ম-বিধি রাষ্ট্রসংস্থা ইতিহাস দর্শন বিজ্ঞান শিল্প স্থাপত্য ভাস্কর্য সাহিত্য সঙ্গীত পোশাক আচার আচরণ প্রভৃতি সাধারণভাবে সমাজের বা জাতির সভ্যতা-সংস্কৃতির পরিচায়ক ও পরিমাপক বলে স্বীকৃত হয়। যদিও এমন কোনো সাধারণ গুণনীয়ক কিংবা সমীকরণ পদ্ধতি নেই যা দিয়ে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষের বিচিত্র আচরণকে একটি সামগ্রিক ধারণার অনুগত করে বিচার করা সম্ভব। কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে একটা জাতির পূর্ণ পরিচয় নিবন্ধ নেই বলে সামগ্রিক স্বরূপে কোনো জাতিকে চিহ্নিত করাও অসম্ভব। তবু মানুষের বোধের ও ব্যবহারের পরিসরে জাতিক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ের যে রেওয়াজ চালু রয়েছে, আপাতত আমাদের তাই অনুসরণ করতে হবে।
জাতির পরিচয় ক্ষেত্রে ধর্ম ও সাহিত্যকে প্রধান উপকরণ বলে গণ্য করা হয়। কেননা জীবন একান্তই স্থান-কাল ভিত্তিক। কাজেই মানুষের দেহমন গড়ে তোলে প্রতিবেশ। আর মানুষের অন্তরের অপকট অনুভূতি ও উপলব্ধির সুন্দরতম ও নিবিড়তম প্রকাশ ঘটে সাহিত্যে। এবং জীবনের তথা মনের ও আচরণের অলক্ষ্য নিয়ন্তা হচ্ছে ধর্মীয় সংস্কার। ধর্মের অন্তলীন প্রভাবের স্বরূপ যাই হোক, সাহিত্য যে মানুষের বোধ-বুদ্ধির অবিকৃত প্রতিরূপ তা মানতেই হবে। কারণ সাহিত্য জীবনালেখ্য নয়, জীবনবোধের অভিব্যক্ত সাক্ষ্য। এজন্যেই সাহিত্য জাতীয় জীবনের মুকুর বলে স্বীকৃত। সাহিত্যে মানুষের মর্মমূলের স্বরূপ বিধৃত থাকে বলে মানুষের অন্তসত্তার পরিচায়করূপে একে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। আর মানুষের মননে ও আচরণে স্থানিক কালিক প্রভাব অনপনেয় বলে কোনো কোনো ঐতিহ্য মানুষের প্রেরণার মাতৃকা, কর্মের দিশারী ও মর্মের পরিচায়ক। কাজেই সাহিত্য ও ঐতিহ্যের উজান পথে সন্ধান নিতে হবে তত্ত্বের।
.
খ.
মানুষের মনে জগৎ ও জীবন সৃষ্টির রহস্য এবং জগৎ ও জীবনের মহিমা, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্বন্ধে যে চিরন্তন ও সর্বজনীন জিজ্ঞাসা রয়েছে তারই জবাব খোঁজা হয়েছে ধর্ম ও আধ্যাত্মজীবন সম্পর্কিত রচনায়। বাস্তবধর্মী শক্তিমানের যে জিজ্ঞাসা মানুষকে বিজ্ঞানী করেছে, ভাববাদী দুর্বলকে তা-ই করেছে তাত্ত্বিক ও দার্শনিক। একই জিজ্ঞাসা আপাত বিরোধী দু-কোটির চিন্তা ও কর্মের প্রেরণা ও জন্ম দিয়েছে। এই একই জিজ্ঞাসা কাউকে করেছে বহির্মুখী, কাউকে দিয়েছে অন্তদৃষ্টি। বহির্মুখিতা মানুষকে করেছে বিষয়ী ও বিজ্ঞানী, অন্তর্দৃষ্টি মানুষকে করেছে রহস্যবাদী, গড়ে তুলেছে অধ্যাত্মবাদ। বিজ্ঞান এনেছে ভোগবাদ বা ঐহিক জীবনবাদ তথা বস্তুতান্ত্রিকতা। অধ্যাত্মবাদ দিয়েছে। বৈরাগ্য বা ইহবিমুখিতা জাগিয়েছে, জীবনের জীবনের আকাঙ্ক্ষা। বৈরাগ্য প্রাচ্যের মানস- সম্পদ আর বিজ্ঞান প্রতীচ্যের ঐশ্বর্য। দুটোরই মূল প্রেরণা জিগীষা–একটার লক্ষ্য আত্মজয়, অপরটার কাম্য দুনিয়া-জয়। একটার সম্বল হৃদয় ও মনোবল, অপরটার হাতিয়ার বুদ্ধি ও বাহুবল। একটি হৃদয়বৃত্তির লীলা, অপরটি প্রাণধর্মের অভিব্যক্তি।
তত্ত্বচিন্তা মানুষকে তিনটে মার্গের সন্ধান দিয়েছে–জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তির পথ। জ্ঞানবাদ আস্তিক, নাস্তিক্য ও সংশয়প্রবণ দর্শনের জন্ম দিয়েছে। কর্মবাদ সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রবিধি গড়ে তুলেছে আর ভক্তিবাদ হয়েছে নিষ্ঠা ও বৈরাগ্যের উৎস। এবং ভক্তিবাদের উপজাত কিংবা পরিণাম হচ্ছে প্রেমবাদ। বাঙলা ভাষায়ও এই তত্ত্বজিজ্ঞাসা তিন ধারার সাহিত্য সৃষ্টির উৎস হয়েছে– ধর্মসাহিত্য, তত্ত্বসাহিত্য ও সাধনসাহিত্য। বাউল গান হচ্ছে তত্ত্বাশ্রয়ী মরমীয়া সাহিত্য।
