তাই আত্মপ্রত্যয়ী জনতা যখন রুখে দাঁড়ায়, তখন সেই দুবৃত্তপীড়ক–
পথকুক্কুরের মতো সংকোচে সত্রাসে যাষ্য মিশে।
কেননা,
কেহ নাহি সহায় তাহার
মুখে করে আস্ফালন, জানে সে হীনতা
আপনার মনে মনে।
মনোবল আসে ন্যায়নিষ্ঠা ও আত্মপ্রত্যয় থেকে। সদিচ্ছা ও কর্তব্যবুদ্ধিই মানুষকে করে নির্ভীক ও আত্মদানে অনুপ্রাণিত। তেমন মানুষই পা বাড়ায় বিপদের মুখে। এগিয়ে যায় নিশ্চিত মৃত্যুর পথে। কেননা সে জানে, পরিণামে জয়ী হয় শহীদেরাই। ভয়-সংশয় দলিত করে জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য করে যে প্রথম এগিয়ে যায়, সেই-দেশ-জাত মানুষের ত্রাণকর্তা। পৌরুষ ও কাপুরুষতার মধ্যে ব্যবধান ঐ এক কদমেরই। ঐ বাড়তি কদমেরই নাম বীরত্ব, আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব, মনুষ্যত্ব এবং লোকাণ। জগতে ও জীবনে শক্তির ও সংগ্রামী প্রেরণার উৎস ঐ আগে-বাড়ানো কদমটিই। এই বাড়তি কদমের মূলে রয়েছে যে জাগ্রত চিত্ত, সে-চিত্ত আগেই জীবনের প্রসাদরূপে গ্রহণ করে :
কালবৈশাখীর আশীর্বাদ
শ্রাবণ রাত্রির বজ্রনাদ
পথে পথে কণ্টকের অভ্যর্থনা
পথে পথে গুপ্তসৰ্প গূঢ়ফণা।
সে-চিত্ত জানে-পীড়ন হবে যত প্রবল, মুক্তি আসবে তত দ্রুত। শিকল পরেই বিকল করতে হয় শিকল, একপ্রাণের বীজ সৃজন করতে হয় কোটি প্রাণ, বুকের রক্তই হয় রক্তবীজ যা সৃষ্টি করে অসংখ্য-অজেয়-অমর আত্মা। এমন মানুষের নেতৃত্বেই তো দেশ-জাত ও ধর্ম রক্ষার জন্যে মানুষ চিরকাল অকাতরে প্রাণ দিয়েছে–মরণোৎসবে উল্লসিত হয়েছে, রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে তুলেছে বিদ্রোহের ধ্বজা। যারা প্রাণের মমতায় প্রাণীমাত্র, তারা প্রাণটা জিইয়ে রাখার জন্যে সদসতর্ক থেকেও অকালে- অসময়ে-অকারণে-অঘোরে প্রাণ হারায়; আর যারা প্রাণের মূল্য বোঝে, তারা দেশ-জাত-মানুষের ত্রাণের জন্যে প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রাণটি দিয়ে প্রাণের মূল্য প্রমাণ করে। এবং ধন্য হয় নিজে, ধন্য করে জগৎ সংসারকে।
আমরা চলি সমুখ পানে, কে আমাদের বাঁধবে?
দিনে দিনে যখন বঞ্চনা বাড়িয়া উঠে, ফুরায় সত্যের যত পুঁজি
তখন বন্ধন পীড়ন-দুঃখ অসম্মান ক্ষুব্ধ মৃত্যুঞ্জয় তরুণেরা –
ভীরুর ভীরুতাঞ্জ প্রবলের উদ্ধত অন্যায়
লোভীর নিষ্ঠুর লোভ বঞ্চিতের নিত্য চিত্তক্ষোভ
জাতি-অভিমান।
দূর করবার জন্যে নেমে পড়ে বন্ধুর পথে। ঝড়ো হাওয়ার মতো, ঝাবিক্ষুব্ধ-সমুদ্রের মতো তারা প্রতিবাদের রোল-কল্লোল জাগায়। তখন বিশ্বজগৎ অবাক হয়ে দেখে আর শোনে ঝড়ের মাতন, বিজয় কেতন নেড়ে, অট্টহাস্যে আকাশখানা ফেড়ে এগিয়ে চলছে তরুণরা। এবং
ঝটিকার কণ্ঠে কণ্ঠে শূন্যে শূন্যে প্রচণ্ড আহ্বান
মরণের গান।
উঠেছে ধ্বনিয়া পথে নবজীবনের অভিসারে
ঘোর অন্ধকারে।
প্রপীড়িত আত্মার বন্ধন জর্জরতা ঘুচাবার সংকল্পে দৃপ্ত নির্ভীক তরুণের কণ্ঠে জেগে উঠে মরণজয়ী-গান :
লাঞ্ছিতেরে কে রে থামায়?
ঝাঁপ দিয়েছি অতল পানে
মরণ-টানে।
মরণপণ সংগ্রাম তাদের। তারা জানেই :
বাধা দিলে বাধবে লড়াই, মরতে হবে।
রবীন্দ্রনাথ কোনো সুখের-সম্পদের ও কোনো খ্যাতি-ঐশ্বর্যের লোভ দেখিয়ে তরুণদের আহ্বান করেননি। গ্যারিবল্ডীর মতোই তিনি সংগ্রামী সৈতিকদের ডাক দিয়েছেন-দুঃখ যন্ত্রণার ও মৃত্যুর পথে। তাঁর মতে যে প্রয়োজনমতো মরতে ও মারতে জানে, বাঁচবার ও বাঁচাবার যোগ্যতা রয়েছে তারই। দেশ-জাতমানুষের হিতার্থে আত্মাহুতি দিতে পারে, সমাজে তেমন তরুণের আবির্ভাব তিনি চিরকালই কামনা করেছেন। তার বিশ্বাস জীবন-মৃত্যুকে যে পায়ের ভূত্য করেনি, তেমন মানুষ দিয়ে দেশ-জাত-মানুষের কোনো কল্যাণ আসতে পারে না, কেননা সারা দুনিয়াব্যাপী পাশব-শক্তিরই দানবীয় লীলা চলছে। তার মোকাবেলার জন্যে দিতে হবে রক্ত ও প্রাণ, দিতে হবে শোণিত ও জীবন। এভাবেই দূর করা সম্ভব —
যত দুঃখ পৃথিবীর, যত পাপ, যত অমঙ্গল
যত অশ্রুজল
যত হিংসাহলাহল
মানুষের প্রাণে মানুষ যত বিষ মিশিয়েছে, সে বিষ ধুইয়ে-মুছে ফেলবার জন্যে চাই মহৎপ্রাণ ব্যক্তির রক্ত। কাজেই রবীন্দ্রনাথ ত্যাগবীর তরুণের রক্ত ও প্রাণ দান কামনা করেছেন নব-দানবের দেয়া দারিদ্র-পীড়ন-যন্ত্রণা থেকে মানুষের মুক্তির জন্যে। এই দানবের সাথে লড়াইয়ের জন্যে ঘরে ঘরে যে লড়িয়ে-তরুণ প্রস্তুত হচ্ছে, তাও তিনি দেখতে পেয়ে আশ্বস্ত হয়েছিলেন। এবং এ-ও জানতেন :
কোনো ভাবী ভীষণ সংগ্রাম
রণ শৃঙেখ আহ্বান করিছে তার নাম।
আমরা যারা বাঁচবার মতো বাঁচতে জানলাম না, পারলাম না মরার মতো মরতে, এই মৃত্যুঞ্জয়ী বীরদের আত্মাহুতির সহজ প্রবণতা দেখে আমরাও জীবনে হঠাৎ করে খুঁজে পাই শক্তি, গর্ব ও প্রত্যয়। ভাবীসগ্রামে শহীদেরাই হয়ে থাকে প্রেরণার উৎস ও পথের দিশারী।
রবীন্দ্রনাথের মতে, দুঃখ-বেদনা ও মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে ঘটে নবযুগের ও নতুন জীবনের অরুণোদয়। যে-পোষ মানে, সে মরে, যে অতীতকে আশ্রয় করে, সে হয় জীর্ণতায় অবসিত। কাজেই বিপদ সামনে নয়, পশ্চাতে। পশ্চাতই–পুরাতনই মানুষকে গ্রাস করে :
ওরা জীবন আঁকড়ে ধরে
মরণ-সাধন সাধবে
কাঁদবে ওরা কাঁদবে।..
রইল যারা পিছুর টানে।
কাঁদবে তারা কাঁদবে।
সম্মুখের বাধার আহ্বানে যে সাড়া দেয়, জীবনযাত্রায় সেই হয় জয়ী। জীবন তার কাছেই ধরা দেয়। সে জানে সামনে নতুন দিন। প্রভাত হতে দেরি নেই :
