আমাদের গবেষণামূলক প্রবন্ধ আজো পেশাগত প্রয়াসে সীমিত। কারণ তা উপাধি পরীক্ষার স্তর অতিক্রম করেনি। তাছাড়া গবেষণাবৃত্তগত বলেই গবেষণালব্ধ তথ্য পরিবেশিত হয় ইংরেজিতে। তবু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধ্যাপকেরা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শন প্রভৃতি সম্পর্কে বাঙলায় কিছু কিছু লিখেছেন এবং সেগুলো নবলব্ধ জাতীয় চেতনাজাত নতুন দৃষ্টির প্রভাবে কিছু নতুন তাৎপর্য লাভ করেছে।
ভাষা সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতি ধর্ম দর্শন ইতিহাস রাষ্ট্র সমাজ ঐতিহ্য প্রভৃতি সম্বন্ধে রচিত সাধারণ প্রবন্ধের মত, পথ ও দৃষ্টির পার্থক্য ও বৈপরীত্য বিচিত্রভাবে প্রকটিত হয়েছে বিভিন্ন মন ও মননের স্পর্শে বিচিত্র ও বর্ণালি হয়ে উঠলেও তাতে দেশ-কাল-জাত-চেতনা দুর্লক্ষ্য নয়।
জাতীয় জীবনের সম্পদ ও সমস্যা, প্রয়োজন ও অভিপ্রায়-সচেতনতা সর্বত্র সুলভ। কেননা লক্ষ্য তাদের বিভিন্ন আত্মিক ও বৈষয়িক ক্ষেত্রে জাতীয় জীবনের সর্বাত্মক উন্নয়ন। এই উদ্দেশ্য সাধন কল্পে কারো দৃষ্টি দেশগত জীবনে নিবদ্ধ, কারো লক্ষ্য ধর্মগত আদর্শে সীমিত, কারো চিন্তা কালিক সমস্যার অনুগত, আবার কারো উদ্যম সর্বমানবিক কল্যাণ চিন্তায় নিয়োজিত। অর্থাৎ কেউ স্বাজাতিক পটভূমিকায়, কেউ স্বাধর্মিক প্রতিবেশে, কেউবা আন্তর্জাতিক জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে জগৎ ও জীবনকে প্রত্যক্ষ করতে প্রয়াসী এবং সেভাবেই জাতীয় জীবনে উন্নয়নকামী। তবে আমাদের প্রাবন্ধিকদের মধ্য ধর্মবাদী ও রাষ্ট্রবাদীর চেয়ে মানববাদীর সংখ্যাই বেশি। ধর্মপন্থীরা গোড়া রাষ্ট্রপন্থীরা উগ্র এবং মানবপন্থীরা উদার বলে পরিচিত। লিখিয়ে মাত্রেই–কবি কিংবা কথাশিল্পী যেই হোন–প্রবন্ধ লেখেন। তাই জনপ্রিয় বিষয়ে প্রবন্ধের সংখ্যা অজস্র। কিন্তু নতুন বক্তব্য না থাকলে যে লিখতে নেই, তা তাঁরা বোঝেন না। জ্ঞান-প্রজ্ঞা, চিন্তা-রুচি, উদ্দেশ্য ও জীবন-দৃষ্টির সমন্বয়ে গড়ে উঠে নতুন বক্তব্য। বক্তব্য ব্যক্তিত্বেরই অভিব্যক্ত রূপ। বক্তার স্বাতন্ত্রই বক্তব্যকে বিশিষ্ট করে। নিজস্ব বক্তব্যহীন বাঁচালতায় কেবল আবর্জনারই সৃষ্টি হয়। প্রবন্ধে নতুন ব্যঞ্জনা, নতুন তাৎপর্য নতুন ব্যক্তিত্বের ছাপ আবশ্যিক। বলা বাহুল্য আমাদের প্রবন্ধ-সাহিত্যে অবাঞ্ছিত আবর্জনাই বেশি।
তবু বিভিন্ন মতাদর্শের অনেক প্রাবন্ধিকই পাঠকমনে প্রভাব বিস্তার করেছেন। জাগ্রত জীবনের আহ্বান যাদের চিত্তলোকে সাড়া জাগায় তাদের কিছু-না-কিছু বক্তব্য থাকেই এবং জাগ্রত জীবন থেকেই সাহিত্যের সৃষ্টি ও পুষ্টি। অতএব এ-যুগে প্রবন্ধ-সাহিত্যের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। এবং তা হবে জাতির মনীষার মুকুর।
প্রবন্ধ দুই প্রকার : সৃষ্টিমূলক ও নির্মিতিমূলক। ভাব ও তত্ত্ব বিষয়ক বিমূর্ত রচনাই সাহিত্য গুণান্বিত হয় বেশি। আর তথ্য ও সমস্যামূলক Objective রচনা শিল্পায়িত করা অসামান্য শক্তির পরিচায়ক। রামেন্দ্রসুন্দর, রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর মধ্যে ছিল এই অনন্য প্রতিভা। নির্মিত প্রবন্ধে বৈষয়িক প্রয়োজন পূরণ হয়, আর সৃষ্ট প্রবন্ধ ভাবাত্মক বলেই রসাত্মক এবং সে কারণেই কাব্যগুণান্বিত।
বলাকাকাব্যে মৃত্যু-মহিমা
রবীন্দ্রনাথ যে বিদ্রোহী-বিপ্লবী সগ্রামী কবি নজরুল ইসলামের পূর্বসূরী ও বিপ্লব-মন্ত্রে দীক্ষাগুরু, সে কথা আমরা প্রায়ই ভুলে থাকি। বলাকাকাব্য থেকে এখানে বিপ্লবী-সংগ্রামী রবীন্দ্রনাথের পরিচয় তুলে ধরছি।
ইন্দ্রনাথ চরম তাচ্ছিল্যে শ্রীকান্তকে বলেছিল, মৃত্যুকে ভয় কি, মরতে তো একদিন হবেই। নৌকাডুবি হয়ে, গাড়িচাপা পড়ে, ঝড়-বন্যা-মহামারীর কবলে পড়ে রোজ কত কত অপঘাত অপমৃত্যু হচ্ছে। মরণকে এড়ানো-আটকানো যায় না। মরতেই যদি হবে, তাহলে অন্য দশ প্রাণীর মতো অসহায় নিষ্ফল মৃত্যুর জন্যে সভয়ে অপেক্ষা করার চেয়ে স্বেচ্ছায় মহৎ মৃত্যুবরণ করাই তো মানুষের কাজ। সক্রেটিস, যিশু, ব্রোনো এমনি মহৎ মৃত্যুই হাসিমুখে বরণ করেছিলেন। এ মৃত্যু বাঁচবার ও বাঁচাবার জন্যেই। এক প্রাণ দিয়ে লক্ষ কোটি প্রাণের নিরাপত্তা দানই এমন মৃত্যুর লক্ষ্য। প্রয়োজনমতো যে মরতে প্রস্তুত, বাঁচবার অধিকার তারই। সময়মতো যে মরতে জানে সেই বাঁচিয়ে রাখে জগৎ-সংসারের মানুষকে ও মনুষ্যত্বকে। লক্ষ-কোটি মানুষের মধ্যেই সে সগৌরবে সার্থক হয়ে বাঁচে। নিঃশেষে প্রাণ যে করিব দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।
যিশু ক্রুসে বিদ্ধ হয় রক্ত দিয়েছিলেন, দিয়েছিলেন প্রাণ। তার রক্ত ধুইয়ে-মুছে দিয়েছে কোটি কোটি পাপী-তাপী খ্রীস্টানের পাপ-তাপ এবং তার এক প্রাণের বিনিময়ে কোটি কোটি প্রাণ পেয়েছে ত্রাণ। তাই যিশু হলেন মানুষের ত্রাণকর্তা Saviour এবং যে-সে যিশু বিদ্ধ হয়েছিলেন তা হল মানুষের প্রাণরক্ষক বর্ম। এমনি করে মৃত্যুর বিনিময়ে জাগে প্রাণ, বিকাশ পায় জীবন। দুনিয়াব্যাপী মানুষের অগ্রগতির মূলে রয়েছে বীর মুযাহিদের আত্মদান।
স্বার্থপর লোভী নিজেও শেষ অবধি বাঁচতে পারে না, অন্যকেও বাঁচতে দিতে জানে না। তার লোভ ও আত্মরতি তাকে পরস্বে ও পীড়নে প্ররোচিত করে। লোকহিতার্থে তাকে ঠেকানোর জন্যেই ত্যাগবীরের প্রয়োজন। যে-দেশে যে-সমাজে তেমন লোকের অভাব, সে-দেশের ও সে-জাতির জীবন-যন্ত্রণা কেবলই বাড়ে। ভীরুরা আত্মসংকোচন করে ও পালিয়ে বাঁচতে চায়। আত্মসংকোচন ও পলায়ন নামান্তরে আত্মবিলোপ বই কিছুই নয়। কেননা ওতে লোভীর লোভ ও দুবৃর্ত্তের পীড়ন-স্পৃহা বৃদ্ধি পায়। মানুষের জীবনে ও জীবিকার যেখানে যতটুকু নিরাপত্তা রয়েছে তা তো ঐ নির্ভীক ত্যাগবীরের প্রাণের বিনিময়েই লব্ধ। এবং প্রয়োজনমতো প্রাণদানে সমর্থ কিছুসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিই তো লোভী হিংস্রকে সংযত রেখেছে। দুবৃর্তের সম্বল বুদ্ধি ও বাহুবল। এগুলোর সীমা আছে। লোক-রক্ষক সংগ্রামীর শক্তির উৎস হচ্ছে সদিচ্ছা ও মনোবল। এ শক্তি তাই অসীম, অপরিমেয় ও অফুরন্ত। ত্রাসের ঝড় বিভীষিকাময় কিন্তু ক্ষণজীবী, ত্রাণের বায়ু মৃদু-প্রবাহী কিন্তু স্থায়ী ফলপ্রসূ। দুবৃত্ত নামে ঝড়ের বেগে এবং গতিও তার ঝড়ো। জনে জনে হয় জনতা। তার বেগ বন্যার। এবং বন্যা বাঁধ মানে না। জনতার সৃষ্টি রক্তবীজে। কেটে-মেরে তাকে নিঃশেষ করা যায় না। কেবলই বাড়ে, অসংখ্য ও অজয় হয়ে বাড়ে। বাহুবলে বলীয়ান দুবৃত্ত সিংহচর্মের আবরণে শৃগাল।
