গাও-রা দারান্দা বাওর দর খোদায়ে আমিয়া
নুহরা বাওর না দারান্দ আজ পে পয়গম্বরী।
–গরুকে খোদা বলে মানতে তোমাদের বাধে না, নুহকে পয়গম্বর বলে মানতেই তোমাদের যত আপত্তি!
একালে মানুষ বিশ্বাস-সংস্কার ও যুক্তি-বুদ্ধির দ্বান্দ্বিক টানাপড়েনে উদ্বস্ত। তাই তারা কখনোবা বিশ্বাস চালিত, কখনোবা সন্দেহতাড়িত, আবার কখনোবা যুক্তিনিষ্ঠ। এ কারণেই কখনো তাঁরা আদিম ও স্থূল আবার কখনো শীলবান ও পেলবচিত্ত।
বস্তুত বাহুবল ও সশস্ত্র প্রতিকার-পদ্ধতি আজো real এবং বিবেক-বুদ্ধির কাছে নিরস্ত্র নিবেদন আজো ideal পাণঘাতী ও রক্তক্ষরা শাস্তিই শায়েস্তা করার মোক্ষম প্রতিকার-নীতি –এটি আজো real; আর প্রীতি, ক্ষমা, সহিষ্ণুতা ও যুক্তিপ্রয়োগ প্রভৃতি এখনো ideal প্রতিকার-পদ্ধতি।
অতএব একটি real, অপরটি ideal. Real-এ আপাত কার্যসিদ্ধি হয়, কিন্তু পরিণাম নিষ্ফল। Ideal-এ আপাত ব্যর্থতা অবধারিত, কিন্তু পরিণাম ফলপ্রসূ। Ideal-এ পৌঁছতে সময় লাগে, real-এর ফল তাৎক্ষণিক। Ideal ভুললে আমাদের জীবন অর্থহীন হয়ে পড়বে, আর real-কে অস্বীকার বা অবহেলা করলে আমরা পথে দাঁড়াব। Ideal-হীনতা মনের নিঃস্বতা ও মানবিকবোধের নির্লক্ষ্যতার পরিচায়ক, আর real-এর প্রতি ঔদাসীন্য চলমান জীবনকে অগ্রাহ্য করার নামান্তর। Real-এর উপযোগ বর্তমানে, আর ideal ভবিষ্যতের পুঁজি। Real প্রাণে বাঁচায়, ideal মন গড়ে তোলে। প্রাণে না বাঁচলে মন অস্তিত্ব পায় না, আবার মনের পরিচর্যা না হলে প্রাণে বাঁচা অসার্থক।
তাই আমাদের আপাতকর্তব্য শোভন ও পরিশ্রুত পদ্ধতিতে real-কে বরণ করা যাতে তা ideal–এর পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়ে যায়। বস্তুত মানুষের মানবিক বোধের ও কর্মের তথা সংস্কৃতির ও সভ্যতার বিকাশ এভাবেই হচ্ছে। নতুবা যুদ্ধ ও যুদ্ধবাজ ঘৃণ্য হল কী করে? শান্তির সপক্ষে এত মানুষ উচ্চকণ্ঠ কেন? অথবা নিরস্ত্রীকরণের কথাই বা ওঠে কী করে? কাজেই মানুষ ideal-এর দিকে মন্থর গতিতে হলেও–এগুচ্ছে, এটিই আশা ও আশ্বাসের কথা। নইলে কত বর্বরতা ও বর্বরনীতি মানুষ পরিহার করল কী করে!
প্রবন্ধ-সাহিত্য
সাহিত্যে আমরা জীবনের গানই শুনতে পাই। কেননা সাহিত্যের উৎসই হচ্ছে জীবন। জীবনের ভাব-চিন্তা-প্রয়াসই অভিব্যক্তি পায় সাহিত্যে। জীবনের গান অবশ্যই-সুর-তাল লয়ে ও বক্তব্যে বিচিত্র। কারণ জীবনে রয়েছে আনন্দ ও যন্ত্রণা, ভয় ও ভরসা এবং আশা ও নৈরাশ্য। যেখানে বিকার সেখানেই বিচলন। এ বিচলন থেকেই আসে গানে-গাথায়, গল্পে-উপন্যাসে, কাব্যে-নাটকে, রম্য রচনায় ও প্রবন্ধে বিচিত্র সুরে জীবনের শ্ৰেয় ও প্রেয়, উল্লাস ও বেদনা, প্রয়োজন ও সমস্যা প্রকাশ পায়।
সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মতো প্রবন্ধ-সাহিত্যের আবেদন পরোক্ষ নয়। উচ্ছ্বাস কল্পনা এবং অলৌকিকতার ভার প্রবন্ধ-সাহিত্য সয় না বলেই বাস্তব জীবন-প্রতিবেশে উদ্ভূত ভাব ও চিন্তা, তত্ত্ব ও তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা-সম্পদ ও আপদ, প্রয়োজন ও সমস্যা, কল্যাণ ও দুর্ভোগ প্রভৃতিই প্রবন্ধ সাহিত্যের বিষয়। অতএব দুনিয়ার যাবতীয় ভাব ও বস্তুই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় হতে পারে যা গল্প-উপন্যাস কিংবা নাটক-কবিতার আঙ্গিকে সম্ভব নয়।
আমাদের ভাষায়ও প্রবন্ধ বিভিন্ন বিষয় উপজীবী। বিজ্ঞান-দর্শন-ইতিহাস, রাষ্ট্র-সমাজ-ধর্ম, সাহিত্য-শিল্প-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি-ভাষা, রীতিনীতি-আদর্শ প্রভৃতি চিরন্তন ও সাময়িক সব বিষয়েই অল্প-বিস্তর রচনা চোখে পড়ে। যদিও গুণগত কিংবা সংখ্যাগত দৈন্য আজো ঘোচেনি।
যেহেতু সমকালীন দৈশিক ও জাতিক জীবনের আনন্দ ও উদ্বেগ, প্রয়োজন ও সমস্যা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি, ইতিহাস ও দর্শন, শিক্ষা ও সম্পদ, ধর্ম ও রাষ্ট্র প্রভৃতি সম্বন্ধেই প্রবন্ধগুলো লেখা হয়; সেহেতু প্রবন্ধ-সাহিত্য নাগরিক চেতনারই প্রসূন। এবং তাই প্রবন্ধ-সাহিত্যে দেশের শিক্ষিত মননশীল কল্যাণকামী মানুষের বিদ্যা-বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, মন-মনন, রুচি-সংস্কৃতি, আদর্শ-উদ্দেশ্য, ভাব-চিন্তা প্রভৃতি প্রতিবিম্বিত হয়।
এ কারণেই প্রবন্ধ-সাহিত্যে দেশগত ও কালগত জীবনের ভাব-চিন্তা-কর্মের প্রতিচ্ছবি যতটা পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে, এমনটি গানে-নাটকে-কবিতায় কিংবা কথা-সাহিত্যে কখনো সম্ভব হয় না। প্রবন্ধ-সাহিত্যেই বিশেষ দেশের ও কালের মানুষের জীবন-দৃষ্টির একটি সামগ্রিক পরিচয় মেলে। এজন্যে সাহিত্যের জাতীয় রূপ প্রবন্ধ-সাহিত্যেই থাকে সুপ্রকট। স্থানিক ও কালিক প্রতিবেশ, শৈক্ষিক যোগ্যতা, নৈতিক চেতনা, আর্থিক অবস্থা, সাংস্কৃতিক মান, সামাজিক পরিবেশ, প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ধার্মিক প্রত্যয়, আদর্শিক প্রেরণা প্রভৃতির সামষ্টিক প্রভাবে ও প্রতিক্রিয়ায় গড়ে উঠে যে মন ও রুচি এবং যে-প্রবণতা ও অভিপ্রায়, তা-ই অভিব্যক্তি পায় প্রাবন্ধিকের রচনায়। প্রজ্ঞা, চিন্তা, যুক্তি, তথ্য, তত্ত্ব ও সামগ্রিক জীবন-দৃষ্টি প্রবন্ধ সাহিত্যের প্রাণ বলেই লেখকের ব্যক্তিত্ব ঐ প্রবন্ধের প্রাণবায়ু। সুলিখিত প্রবন্ধ বুদ্ধিকে জাগ্রত ও তৃপ্ত করে এবং জ্ঞান ও বিচারকে দেয় প্রাধান্য।
সব প্রবন্ধ সাহিত্য হয় না। পাকা লিখিয়ের হাতেই প্রবন্ধ সাহিত্য-শিল্প হয়ে ওঠে জ্ঞান-যুক্তি প্রয়োগ-পরিবেশনের দুর্লভ নৈপুণ্যে। বাঙলায় বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-রামেন্দ্রসুন্দর-প্রমথ চৌধুরীর হাতে প্রবন্ধ সাহিত্য হয়ে উঠেছে।
