কেউ কেউ বলেন ব্যক্তিগত ও সামাজিক অন্যায় এবং পীড়নের ক্ষেত্রে ক্ষমা ও নিরস্ত্র প্রতিরোধ কার্যকর। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ এবং শাসন ও শান্তির জন্যে সশস্ত্র শক্তির প্রয়োজন। যে গান্ধী অহিংস অসহযোগ ভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে স্বাধীনতা সংগ্রাম চালিয়েছেন, তিনিই স্বাধীন ভারতে প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ শাসন-শান্তির জন্যে সহিংস-সশস্ত্র বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছেন। জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানের কিংবা জনসনের উক্ত নীতিতে নতুন কিছু নেই। প্রতিকার ব্যবস্থায় বাহুবল ও জনবলহীন মানুষ চিরকালই আশ্রয় নিয়েছে আইন আদালতের। আর ধনবলহীন মানুষ প্রতিকার খোঁজে সালিশে। এ দুটোই শক্তিমান লোকের কাছে অবজ্ঞেয়।
আসলে ধর্মের দোহাই দিয়ে, আল্লাহর কাছে গোহারী করে কিংবা নালিশে-সালিশে-ক্ষমায় প্রতিকার চেয়ে নির্বলই প্রবোধ এবং সান্ত্বনা খোঁজে। সবল চিরকালই নিজ হাতে স্বশক্তি প্রয়োগে প্রতিকার করেছে বা প্রতিকারের চেষ্টা করেছে। অস্ত্রাভাবেই গান্ধী ছিলেন অহিংস প্রতিরোধ প্রতিকারের প্রবক্তা, অস্ত্রাধিকার লাভের সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সশস্ত্র শক্তিতে আস্থাবান হয়ে ওঠেন। কাজেই বাহুবল-ধনবল-জনবল যার আছে, সে কখনো সালিশে-নালিশে, দোহাই-গোহারীতে কিংবা শাপে-বরে বিশ্বাস করবে না। বোঝা যাচ্ছে দুর্বল ও অক্ষমই কেবল মহৎ আদর্শের বুলি কপচিয়ে আত্মরক্ষা ও আত্মসম্মান রক্ষার উপায় খোঁজে। সবল ও পরাক্রান্ত ব্যক্তির কাছে ওসব হাস্যকর বালভাষণ।
তবু মনে হয়, মহৎ আদর্শে কোনো অপ্রতিরোধ্য শক্তি নিহিত রয়েছে। নইলে প্রবল পরাক্রমশালীও একে প্রকাশ্যে সোজাসুজি তাচ্ছিল্য করতে সংকোচ ও লজ্জাবোধ করে কেন? কেন তারা অপকর্মের জন্যে ছলচাতুরীর আবরণ খোঁজে? কেন তাদের অন্যায় অপকর্মকে যুক্তিগ্রাহ্য করে তুলতে চায়? কেন আজ অস্ত্রবল সঞ্চয়ে তৎপর হয়েও তারা অস্ত্রসংবরণ ও অস্ত্রবর্জনের কপট বুলি আওড়াতে বাধ্য হচ্ছে?
কাজেই আপাত অকেজো ও অশ্রদ্ধেয় সহিষ্ণুতা সালিশ, ক্ষমা ও নিরস্ত্র প্রতিরোধও যে মানুষের মানবিক বোধ-বুদ্ধির বিকাশের সহায়ক, নৈতিক চেতনা বৃদ্ধির অনুকূল, তা অস্বীকার করবার উপায় নেই।
আজ আর রাষ্ট্রপতি-রাষ্ট্রনায়কেরা আগেকার রাজা-বাদশার মতো প্রভু ও শাসক নন। এখন তারা একাধারে শাসক ও সেবক। সেজন্যে গণসমর্থন ব্যতীত তাঁদের স্থিতি অসম্ভব। নাগরিক মনে নৈতিক-চেতনা ও আদর্শানুগত্য থাকলে তা রাষ্ট্রপতির চিন্তা ও কর্মকে প্রভাবিত করেই। কেননা তাঁর হুকুম অমান্য করবার লোক তাঁর রাষ্ট্রেই থাকে এবং তারা নিরস্ত্র হয়েও সশস্ত্রবাহিনীর চেয়ে প্রবল। এই জনমত-রূপ আদর্শের প্রেরণা-পুষ্ট মনোবলের মতো বল আর নেই। ভিয়েতনামের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিরোধী জনমতে সে ইশারাই পাওয়া গেছে। এমন দিনও হয়তো আর দূরে নয় যখন সৈন্যেরাও প্রাণের প্রেরণা ছাড়া কেবল হুকুমের চোটে যুদ্ধ করতে অস্বীকার করবে। অথবা যুদ্ধের কারণই হবে অপগত। এ মনোবল আসে বিশ্বাস-মুক্তি ও মুক্তবুদ্ধি থেকে। আগের যুগে মানুষের জীবন ছিল বিশ্বাস-নির্ভর ও সংস্কার-ভিত্তিক; এখনকার অনেক মানুষের জীবনই বুদ্ধি ও যুক্তিনিষ্ঠ। তাই আত্মবিশ্বাস ও আত্মজ্ঞান এবং তজ্জাত সাহস বেশি। ভয় ও সন্দেহ-সংশয়ের স্থলে আত্মবিশ্বাসসম্পন্ন ব্যক্তিই সাহস করে বিপদের ঝুঁকি নিয়ে এগিয়ে আসে। অন্যেরা যখন ভয়ে ও সংশয়-সংকোচে জড়বৎ অচল, তখন সাহসীই প্রথমে কদম বাড়ায়। আর এই পয়লা কদমই পৌরুষ ও কাপুরুষতার পরিমাপক। নামৰ্দমী-মর্দমী কাদমে ফাসেলা দারাদ। –মদামী না মদামীর মধ্যে ওই এক-কদমেরই ব্যবধান। কিন্তু সেই ব্যবধান কত ব্যাপক গুরুতর ও তাৎপর্যময় আর কী যুগান্তকারী পরিণামপ্রসূ! মরদের এই বাড়তি কদমই লক্ষ হৃদয়ে শক্তি ও সাহস যোগায়। এই বাড়তি কদমই নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের অধিকারী-মানবভাগ্যের নিয়ন্তা, দেশ-দুনিয়ার মানুষের শক্তির ও ভরসার আকর। এখনকার দিনে ভয়-সংশয় জয় করে পা বাড়ানোর লোক অনেক। তাই জনতা শক্তিমান, তাই জনতা ও জনমত প্রবলতম শক্তিরও বিজয়ী প্রতিদ্বন্দ্বী।
জার্মান দার্শনিক Riechl বলেছেন, মানুষই একমাত্র প্রাণী যে মেরুদণ্ডের উপর শির উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। মানুষ তা পারে, কারণ মানুষের জীবনে আদর্শ আছে, উদ্দেশ্য আছে, আছে মহৎ লক্ষ্যে উত্তরণের আগ্রহ। এ মহৎ লক্ষ্য হচ্ছে মানবতার মানবমনীষার ও মানবসংস্কৃতির পূর্ণবিকাশ। প্রতিকার-বাঞ্ছা যুক্তি ও প্রয়োজনবুদ্ধি সাপেক্ষ। বিশ্বাসের সঙ্গে যেহেতু নিয়তিবাদ যুক্ত সেহেতু বিশ্বাসের আনুগত্যের চেয়ে বড় কারাগার নেই। বিশ্বাসের কবল-মুক্তির চেয়ে বড় মুক্তিও তাই নেই। আগের যুগে অজ্ঞ অসহায় মানুষের জীবনযাত্রা ছিল বিশ্বাস-ভিত্তিক। তাই তারা বিশ্বাসীর চোখে গরুকেও দেখেছে দেবতারূপে আর বিশ্বাসের অভাবে হযরত নুহকে করেছে বিদ্রূপ। এবং হযরত ঈসাকে চড়িয়েছে শূলে, তাড়িয়েছে মুসা ও মুহম্মদকে। মনে যুক্তিবোধের উদয় হলেই কেবল মানুষ শ্রেয়সকে ও কল্যাণকে সহজেই বরণ করতে পারে, তা যতই নতুন ও অভাবিত হোক না কেন। মনে যুক্তি-বুদ্ধির ঐশ্বর্য থাকলেই তবে মানুষ পরিহার্য পুরাতনে আস্থা ও আকর্ষণ হারাবার যোগ্যতা অর্জন করে। এ-কথাটা বুঝতে চাননি বলেই হাকিম ইবনে সীনা বৃথা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন :
