হযরত ঈসা বলেন– একগালে থাপ্পড় পেলে তো অপর কপোলও থাপ্পড় নেয়ার জন্যে উন্মুক্ত কর। অর্থাৎ প্রতিরোধ করো না, প্রতিশোধ ব্যবস্থা মনে ঠাই দিয়ো না, বরং মহত্ত্ব ও ক্ষমা দিয়ে অন্যায়কারীর হৃদয় জয় করো–যাতে সে চিরকালের জন্যেই অপকর্ম থেকে নিবৃত্ত হয়–ক্ষমা ও মহত্ত্বের মহিমায় মুগ্ধ হয়ে।
হযরত মুহম্মদ বললেন– পারো তো ক্ষমা করো, নইলে শাস্তি দাও। অর্থাৎ স্থান-কাল পাত্রভেদে ক্ষমা বা শাস্তির উপযোগ ও প্রয়োগসাফল্য নজরে রেখো।
এদেশে হিন্দু ও বৌদ্ধধর্ম কর্মবাদে আস্থা রাখে। পাপ-পুণ্যের শাস্তি ও পুরস্কার অমোঘ। গীতায় দুষ্কৃতিদমনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকৃত। কিন্তু গৌতমবুদ্ধ প্রতিকারের চেয়ে অন্যায়-বিরতিতে গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। তার দশশিক্ষা Precautionary ও Preventive ব্যবস্থারূপে পরিগণিত। পার্থিব সবকিছুকে নশ্বর ও তুচ্ছ জেনে মায়া ও তৃষ্ণা তথা আকাক্ষা ও মোহমুক্ত হতে উপদেশ দিয়েছেন তিনি। এমনি রীতি ও সংযমের কথা অবশ্য সব ধর্মেই রয়েছে। মহত্ত্ব, সহিষ্ণুতা ও ক্ষমাকেই তিনি উত্তম ও শ্রেয় বলে জেনেছেন। রাজোবাদ জাতকের কাহিনীতে তার এ মনোভাব সুপরিব্যক্ত। কাহিনীটি সংক্ষেপে এই :
বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তকুমার এবং কোশলরাজ মল্লিক উভয়েই সমসাময়িক এবং আদর্শ ধার্মিক রাজা। প্রজারা তাদের শাসনে-পালনে সুখে স্বচ্ছন্দে বাস করছে। একদিন এই দুইরাজ্যের দুইরাজার রথ একই রাস্তায় এসে মুখোমুখি দাঁড়াল। এখন কে কাকে পথ ছেড়ে দিয়ে নিজের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করবেন, সে হল সমস্যা। উভয় রাজাই সমবয়স্ক। কাজেই বয়সের দাবীও টেকে না। এমনকি তাঁদের কুলগৌরব, রাজ্যপরিমাণ, সেনাবল, ঐশ্বর্য, যশ এবং জনপ্রিয়তাও সমান। এখন উপায়? অবশেষে স্থির হল, চরিত্রবলে যিনি মহত্তর, তাকেই পথ ছেড়ে দেয়া হবে।
প্রথমে কোশলরাজ মল্লিকের গুণপনা বর্ণিত হল : তিনি কঠোরে কঠোর এবং কোমলে কোমল; আর সাধুজনের সঙ্গে সদ্ব্যবহার এবং শঠের সঙ্গে শাঠ্যনীতি অনুসরণ করেন।
আর বারাণসীরাজ ব্রহ্মদত্তকুমার অক্রোধের দ্বারা কুদ্ধকে, সাধুতার দ্বারা অসাধুকে দানের দ্বারা কৃপণকে এবং সত্যের দ্বারা মিথ্যাবাদীকে শিক্ষাদানের নীতির মাধ্যমে শাসন করেন।
এমনি কাহিনী মহাভারতেও রয়েছে। সেখানেও কৌরব সুহোত্র এবং উশীনর-পুত্র শিবির রথ মুখোমুখি হলে চরিত্রগুণে শিবিই পথের অধিকার পান। কেননা, তিনিও দানের দ্বারা কৃপণের ক্ষমার দ্বারা কুরকর্মার, সত্যবাদিতার দ্বারা মিথুকের এবং সাধুতার দ্বারা অসাধুর চরিত্র সংশোধনের আদর্শ অনুসরণ করতেন।
বায়জিদ বিস্তামীকে যে মাতাল আঘাত করে রক্তাক্ত করে দিল তাকে পরদিন তিনি বললেন, ভাই, আমার মাথায় ঠেকে যে তোমার বীণাটি ভেঙে গেল তাতে আমি দুঃখিত।
কিংবা চৈতন্যদেবকে যে জগাই-মাধাই লাঞ্ছিত ও আহত করল, তাদেরও তিনি বলেলেন, ভাই মেরেছ কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেব না? –গৌতমবুদ্ধ বায়জিদ কিংবা চৈতন্যদেবের এসব মহত্ত্ব আদর্শের ক্ষেত্রে মানুষ অত্যন্ত মূল্যবান বলেই জানে, কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে শ্রদ্ধেয় বলে মানে না।
এ পর্যন্ত যে-সব নীতি-পদ্ধতির কথা বলা হল সবগুলোই পুরোনো কালের। তবে এ-যুগেও সে-সব মূল্য-মর্যাদা হারায়নি।
এ-যুগে বিশেষ করে ব্যক্তিক কিংবা সামাজিক জীবনে পীড়ন-প্রতিকার নিয়ে মানুষ বিশেষ মাথা ঘামায় না। একালে সব-সমস্যা জাতিক ও রাষ্ট্রিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই সমাধান প্রয়াসও চলছে যৌথপ্রচেষ্টার মাধ্যমে এবং প্রতিকারনীতিও তাই জাতীয় কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বার্থে নির্মিত ও প্রযুক্ত হয়।
গ্যারিবল্ডী বাহুবল-নির্ভর হিংসাত্মক সংগ্রামের পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি স্বাজাত্য ও স্বদেশপ্রেমের প্রেরণায় ক্ষুধার, যন্ত্রণার ও মৃত্যুর পথেই আহ্বান জানিয়েছিলেন দেশবাসীকে।
মাও সে-তুঙও আপোষহীন রক্তক্ষরা সংগ্রামে আস্থাবান। তিনি বলেন : Political power grows out of the barrel of a gun–মার্কস লেনিনেরও ছিল এ মত।
নিগ্রো মনস্তত্ববিদ Frantz Fanon তাঁর The wretched of the Earth গ্রন্থে বলেছেন :
Violence is a cleansing force. It frees the native from his inferiority complex and from his despair and inaction, it makes him fearless and restores his self-repect.
রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—
ক্ষমা যেথা হীন দুর্বলতা বলে অপব্যাখ্যাত হয়, সেখানে কঠোর হতে হবে। এই কঠোরতা নিশ্চয়ই হিংসাত্মক বা শাস্তি সমর্থক।
প্রতিকার পদ্ধতিটা কবিসুলভ হলেও এব্যাপারে তার আরো স্পষ্ট উক্তি রয়েছে :
অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে,
তব ঘৃণা তারে যেন তৃণসম দহে।
গান্ধী অহিংস প্রতিরোধ ও অসহযোগকেই প্রতিকার পদ্ধতিরূপে বরণ করেছিলেন।
জওয়াহেরলাল নেহেরুর আস্থা ছিল Co-existence নীতিতে। এটি মূলত নৈতিকবোধের প্রীত আবেদন।
জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠানের নীতি-পদ্ধতি হয়েছে সালিশির মাধ্যমে বিরোধের মীমাংসা। এটিও সদিচ্ছা ও শান্তিপ্রিয়তা সাপেক্ষ।
L. B. Johnson এক বক্তৃতায় বলেছেন, আজকের প্রতিকার পদ্ধতি হবে–To convert hostility into negotiation, bloody violence into politics and hate into reconciliation.
