বস্তুত পূর্বপুরুষের বস্তুগত সম্পদের উত্তরাধিকারই মানুষ পেয়ে থাকে-যা দৃষ্টিগ্রাহ্য ও কেজো। মানস-উত্তরাধিকার বলে কিছু যদি থাকেও তা সামান্য ও প্রয়োগসাপেক্ষ। এবং প্রয়োগের জন্যে চাই প্রয়োজনবোধ। এই প্রয়োজনবুদ্ধি জাগে আত্মপ্রত্যয়ী, আত্মশক্তি সচেতন ও কাক্ষী মানুষের। আর এ তিনটে গুণই স্বকীয়তার স্বাক্ষর বহন করে। এ মানুষের ঐতিহ্য থাকা না-থাকায় কিছু যায় আসে না। সে হয় স্বসৃষ্ট –এটি ব্যক্তিক ও জাতিক জীবনে উভয়ত সত্য। দেশ-কালের পরিপ্রেক্ষিতে আত্মোন্নয়নের পন্থা এই একটিই। আমার পিতার প্রাথমিক শিক্ষাটাই গৌরবের ও গর্বের হল, আর আমার এম.এ ডিগ্রীটা তুচ্ছ? বাবার কুটিরটারই গর্ব করব, আমার দালানটা কিছুই নয়? সচল ব্যবহারিক জীবনে স্থান-কাল ভেদে আচারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রিক রীতিনীতি– যতই মন্থর হোক–পরিবর্তিত হয়, কেবল ধার্মিক জীবনের নীতিই থাকবে ধ্রুব এ কেমন কথা। এ ক্ষেত্রে কি জীবনের গতিশীলতার কোনো চাহিদা নেই। কার্যত ধর্মনীতিও লঙ্ঘিত হয়, কেবল স্বীকার করতেই আপত্তি। নইলে একই ধর্মে এত বিভিন্ন মত-পথবাদী সম্প্রদায় গড়ে উঠল কী করে!
তাছাড়া, অর্জন-বিমুখ মানুষ পূর্বপুরুষের ধনে ধনী থাকতে পারে না। সে দরিদ্র হতে থাকে ব্যক্তিক ও জাতিক জীবনে –-এ স্বতেসিদ্ধ তথ্য। এবং রিখথ হিসেবে প্রাপ্ত কোনো বাস্তব সম্পদও সমকালীন জীবনের ব্যবহারিক-বৈষয়িক চাহিদা মিটাতে পারে না। কেননা তার কেবল ক্ষয়ই আছে, বৃদ্ধি নেই। স্বােপার্জিত সম্পদ বাড়তির লাবণ্যে প্রাণপ্রদ। পিতৃসম্পদ জীর্ণতার জনক। জোয়ারভাটার মতো আয়-ব্যয়ে বহমানতা থাকা চাই। প্রয়াসবিহীন প্রাপ্তিতে গৌরব নেই। প্রয়াসের মধ্যেই প্রাণের পরিচয় ও বিকাশ। আসলে ঐতিহ্য মানুষকে ধরে রাখে, এগিয়ে দেয় না। স্থিতির জীর্ণতা ও জড়তা তাকে পেয়ে বসে, গতির প্রাণ ও প্রেরণা থাকে অনায়।
এই পুরোনো পৃথিবী প্রতি-মানুষের চোখে নতুন করে দেখা দেয় বলেই পৃথিবী সুন্দর। প্রতিটি জীবন নতুন করে আবিষ্কার করে আপনার ভুবন। নতুন জীবনের চাহিদা মিটাতে দেশগত ও কালগত জীবনের অনুগত করে বদলাতে হয় ধর্মনীতি, সমাজরীতি ও রাষ্ট্রবিধি। প্রাণের সচলতার প্রতীক হচ্ছে সৃজনশীলতা, নতুনের স্বপ্ন ও ভবিষ্যতের দিকে এগুবার আগ্রহ। জরা ও জড়তার ধর্ম হচ্ছে অতীতকে ও স্থিতিকে আঁকড়ে ধরে রাখা। কেননা জরা ও জড়তার ভবিষ্যৎ নেই, কেবল অতীতের স্মৃতিই থাকে। ভবিষ্যতে তার মৃত্যু-ত্রাস, অতীতে তার মধুর স্মৃতি।
পূর্বপুরুষের দানে নয়, মানুষকে বাঁচতে হয় স্বকালে স্বদেশে স্বকীয় সৃষ্টিতে। অন্যের কৃতির ফল ভোগ করার গ্লানির মধ্যে নয়, নিজের কৃতি ও কীর্তির উল্লাসের মধ্যে বাঁচাই যথার্থ বাঁচা। মানুষের এ-ই কাম্য।
প্রতিকার-পন্থা
অন্যায়ের প্রতিকার-পন্থা, হৃত-অধিকার আদায়ের উপায় ও পীড়ন-শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির নানা রীতি-নীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ নানা চিন্তা-ভাবনা করেছে। এবং বিচিত্র পথে এই প্রতিকার-প্রয়াস বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রত্যেকটা উপায় ও নীতি আপাতদৃষ্টে যৌক্তিক। কেবল দেশ-কাল ও ব্যক্তি ভেদে সেগুলোর উপযোগ ভেদ ঘটেছে মাত্র। এক গোষ্ঠীর মতে যে-নীতি বাঞ্ছিত ও প্রযোজ্য, অপর গোষ্ঠীর ধারণায় তা অবাঞ্ছিত ও পরিহার্য। এমনি করে কাল এবং কর্তা ভেদেও পরিবর্তিত হয়েছে নীতি-পদ্ধতি। ক্রমবিবর্তন ও ক্রমউকর্ষ-ধারায় এই নীতি-পদ্ধতি আজ যে-স্তরে উন্নীত তাও সন্তোষজনক নয়, সবার মনঃপুত তো নয়ই। এখনো তা উন্নয়ন ও বিকাশ সাপেক্ষ। এই নীতি-পদ্ধতি দৈশিক, গৌত্রিক, কিংবা জাতিক সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবিকবোধ বিকাশের অন্যতম পরিমাপক হলেও তা দেশ-গোত্র-জাতির সব মানুষের বোধ-বুদ্ধি সংস্কৃতির আনুপাতিক মান নির্ণয়ের মাপকাঠি যে নয়, তাও উল্লেখ্য। কেননা, এ নীতি-পদ্ধতি নির্ধারিত ও প্রযুক্ত হয় দেশ, গোত্র বা জাতির নেতা বা কর্তৃপক্ষের দ্বারা। নেতা বা কর্তাগণের মন বিদ্যা-বুদ্ধি ও নীতিবোধই থাকে এর পশ্চাতে ক্রিয়াশীল, অন্যমানুষের সম্পর্ক নিতান্ত গৌণ। আবার ব্যক্তিগত প্রতিকার- নীতি ও গোষ্ঠী বা জাতিগত প্রতিকার-পদ্ধতিতে পার্থক্যও সামান্য নয়। এখানেও উপযোগ ও প্রয়োগভেদ স্বীকৃত।
ব্যক্তিগত প্রতিকার-প্রয়াসে কেউ প্রতিহিংসা নীতিতে আস্থাবান, কেউ ক্ষমার মাহাত্মে মুগ্ধ, কেউবা স্থান-কাল-পাত্রভেদে কখনোবা শাস্তি, কখনোবা ক্ষমার পক্ষপাতী। কিন্তু গোত্রীয়, জাতীয় কিংবা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে প্রায় সবাই প্রতিহিংসা-প্রতিশোধ নীতিকেই মোক্ষম বলে মানে। তাই হন্তা ও যোদ্ধাই বীর ও মহাপুরুষরূপে পরিকীর্তিত।
এক্ষেত্রে বিষে বিষ ক্ষয় বুনো কচু ও বাঘাতেঁতুল এবং শঠে শাঠ্যাং সমাচরেৎ –এই সুপ্রাচীন নীতির তত্ত্বগত সত্য ও তথ্যগত যাথার্থ্য বহু পরীক্ষিত। বহুলপ্রযুক্ত এই নীতি বৈজ্ঞানিক ও ফলপ্রসূ বলে নির্ভরযোগ্য। কেননা, মানুষ শক্তের ভক্ত, নরমের যম। এ পন্থা বাহুবল ভিত্তিক এবং দ্বন্দ ও সংঘাতপ্রসূ। এক্ষেত্রে কুশলী দুর্বলের নীতি হচ্ছে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা কিংবা হাতী দিয়ে হাতী বাঁধা।
শামীয়জগতে প্রতিকার-নীতির ক্রমবিকাশের ধারায় তিনটি সুস্পষ্ট পদ্ধতি দেখতে পাই। হযরত মুসা বলেন, দাঁতের বদলে দাঁত, চোখের বদলে চোখ উপড়াও। অর্থাৎ বাহুবলে প্রতিরোধ কর, প্রতিশোধ নাও, কিন্তু অপরাধ ও শাস্তির সমতা রক্ষা করো তথা অন্যায় ও তার প্রতিকার আনুপাতিক হওয়া চাই।
