অথচ ভাব-চিন্তা-কর্মের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ও স্বকীয়তাপ্রসূত নতুন কিছু করতে গিয়ে ভুল করার অধিকারই মানুষের স্বাধীনতার ভিত্তি। কারণ ভ্রান্তি থেকেই সত্যকে ও শ্রেয়সকে চেনা যায়। ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্র অভিভাবকের ভূমিকা গ্রহণ করে মানুষের এই মৌল অধিকারই অহরহ হরণ করছে। ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্র সমাজবদ্ধ মানুষকে শেখায় ফানাতত্ত্ব। অর্থাৎ ব্যক্তি-জীবন হবে সমাজ-স্বার্থের অনুগত যৌথ জীবনের প্রত্যঙ্গ। কারণ তার স্বাতন্ত্র্য সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক। অথচ ব্যক্তিজীবনের স্বাতন্ত্র্য, নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন বিকাশ লক্ষ্যেই শুরু হয়েছিল যৌথ আবাস, আচার ও কর্ম। অবশেষে মুক্তির অবলম্বন হয়ে উঠেছে বন্ধনের শৃঙ্খল। কিন্তু ভৌগোলিক সংহতি ও গণশিক্ষা–ব্যক্তিজীবনে না হোক, সামগ্রিক জীবনে আজ নতুন চেতনা দান করেছে। তাই দুনিয়ার সর্বত্র দেখা দিয়েছে দ্রোহ।
.
০৫.
জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তার জন্যেই মানুষ হল যূথবদ্ধ। আর যৌথ জীবনের নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রী শক্তি হিসেবে গড়ে উঠল সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্র। এই তিন মনিবের ঘর করে মানুষ, সেবা করে তিন মালিকের, শাসন মানে তিন প্রভুর। মানুষ যেন সেভুইচড, গলে বের হবে, সে সাধ্যও নেই। কিন্তু যাদের কথা বলছি, তারা তা অনুভব করে না, তারা মনে করে আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে আসমান ও জমিনের মালিকের হেফাজতে পাখির মতো তারা সোনার টঙ্গীর আশ্রয়ে রয়েছে, লীলাময়ের ইচ্ছে ব্যতীত সেখানে সাপ-বেড়ালের উপদ্রব ঘটে না। অথচ জীবন বিকাশের অবলম্বন হিসেবেই সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রের উদ্ভব। জীবনবোধ ও প্রয়োজন বৃদ্ধির সাথে সাথে ধর্মবুদ্ধির ও ধর্মনীতির প্রসার ও পরিবর্তন হওয়া উচিত ছিল, তা হয়নি বলে পুরোনো ধর্ম লোপ পেয়ে নতুন ধর্মের ঠাই করে দিয়েছে। মানুষ অবশ্য কোনোদিন সচেতন ভাবে তা চায়নি। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই তা ঘটেছে। প্রয়োজনের শক্তি অপ্রতিরোধ্য। সেই প্রয়োজন প্রাকৃত শক্তির মতো অমোঘ, নদীর স্রোতের মতো তীরপ্লবী ও কূলগ্রাসী। যে-মানুষের মাধ্যমে নতুন প্রতিষ্ঠা পায়, তিনিও জানেন না তিনি কী কারণে কোন্ অমোঘ শক্তির প্রভাবে কী করছেন।
আজো সে নিয়মেই সব ভাঙছে, হচ্ছে, চলছে। কিন্তু সমকালীন মানুষ তা বুঝতে পারে না। চলন্ত ট্রেনে বসে সে ভাবছে, পাশের বস্তুই চলছে তার ট্রেন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মন স্থিতিকামী, তাই তার এ বিভ্রান্তি। তার জীবনে কাজে লাগছে না, তবু সে ধর্ম ও সমাজ-ভূতের ভয়-ভরসা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। ধর্ম ও সমাজকে সে ভালোবাসে না, ভয় করে। সে-জুজুর ভয় তার দিবারাত্রির বিভীষিকা। ক্রীতদাসের অসহায়তায় ও আত্মসমর্পণেই তার স্বস্তি। সে কেবলই আত্মরক্ষায় উদ্বিগ্ন, তাই বাঁচার স্বাদ সে পায় না। মৃত্যুভীরু জীবনের মমতায় সদা ব্যাকুল, তাই জীবনের প্রসাদ থেকে সে হয় বঞ্চিত।
.
০৬.
যারা নতুন জীবন কামনা করে, আত্মপ্রত্যয় যাদের প্রবল, তারা ধর্ম, সমাজ ও রাষ্ট্রকে জীবনের অনুগত করে। ওগুলোর পুরোনো নিয়ম-নীতির কাছে আত্মবলি দেয় না। অতীত কারো জীবনের আদর্শ হতে পারে না। কেননা অতীত কখনো ভবিষ্যৎ হয়ে ওঠে না। ঐতিহ্যও প্রেরণার উৎস নয়। তাহলে গ্রীক-রোমান-আরবের পতন হল কেন? এটিলা-চেঙ্গিস-বুদ্ধ-হোমারের কী ঐতিহ্য ছিল? ঐতিহ্য বলে যদি কোনো কিছু মানতেই হয় তাহলে এক মানুষের পক্ষে যা সম্ভব অন্য মানুষের পক্ষেও তা সাধ্যাতীত নয় –এই মানবিক ঐতিহ্যে আস্থাই যথেষ্ট। অতীত যদি কোনো কাজে লাগে তবে তা ধর্ম বা সমাজের নীতি-আদর্শ নয়– ইতিহাসের জ্ঞান ও শিক্ষা।
অতীত ও ঐতিহ্য সম্বন্ধে আমাদের ধারণা মোটেই পষ্ট নয়। একটা শোনা-কথা আপ্তবাক্য রূপেই আমরা আওড়িয়ে চলছি মাত্র। যা পিছনে ফেলে আসি, যা চুকে-বুকে যায় হারিয়ে যায়, তাই অতীত। সে-স্মৃতি আমাকে কেবল ধরে রাখতে পারে, এগিয়ে দিতে পারে না। মানুষ তার চোখ দিয়ে সুমুখেই কেবল দেখতে পায়, সচেতন প্রয়াসে পাশেও। কিন্তু পিছনে তাকাতে হলে পিছনকে সুমুখ করতে হয়। অতীতকে স্মরণে রাখতে গেলে ভবিষ্যৎকে ভুলতে হয়। চোখের স্থিতি ও পায়ের পাতার বিস্তৃতি দেখে তো মনে হয় স্রষ্টা মানুষকে সুমুখে দেখবার ও এগুবার ইঙ্গিতই দিয়েছেন।
আমার প্রপিতামহের জমিদারি ছিল, আমার পিতার প্রপিতামহ কবিতা লিখেছিলেন, আমার পিতামহ দীঘি দিয়েছিলেন, আমার পিতা বিদ্বান ছিলেন, আমি সামান্য লেখাপড়া শিখে সম্প্রতি ঢাকায় এক দোকানে কর্মচারী। নিবাস তাঁতিবাজারের এক মেস। ঐতিহ্য আমাকে কী দিল?
হোমার-শেকস্পীয়র-টলস্টয়-কালিদাস-সাদী লিখিয়ে হলেন, তাদের কারো পিতৃপুরুষের কেউ লেখক ছিলেন না। আবার রবীন্দ্র-নজরুলের সন্তান কবি হতে পারলেন না। আদম-সন্তান কাবিল হল লম্পট, নূহর সন্তান হল পিতৃদ্রোহী। ঐতিহ্যের প্রভাব কোথায় পড়ল? সভ্যতায় ও শাসনে কালো আফ্রিকার কী ঐতিহ্য আছে? তাই বলে কি তারা আরণ্য থাকছে? আমার চৌদ্দপুরুষের কেউ লেখাপড়া করেননি, বাবা ছিলেন ক্ষেতমজুর; আমি বিদ্বান, বড় চাকুরে, অবশেষে মন্ত্রী কিংবা রাষ্ট্রপতি হলাম। এ তো হবার কথা নয়।
ভূঁইফোড় লোক রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, আর রাজার ছেলে রাজ্য রক্ষা করতে জানেন না। এই বা হবার কারণ কী! ব্যক্তিক কিংবা জাতিক জীবনে ঐতিহ্যই যদি প্রেরণার আকর ও আত্মোন্নয়নের ভিত্তি হত তাহলে সমাজে কিংবা দেশে কোনো মানুষের বা জাতের জীবনে উত্থান-পতন থাকত না। বর্ণে বিন্যস্ত হিন্দুসমাজের মতো জন্মসূত্রেই জীবন ও জীবিকা নিয়ন্ত্রিত হত। কেননা যার ঐতিহ্য নেই, সে তা কখনো অর্জন ও সৃজন করতে পারত না। ঐতিহ্য বলতে আমরা ভালো কৃতিই বুঝি– মন্দকৃতি ঐতিহ্য নয়। মানুষ কি এতই সুবোধ ও সুশীল যে সে কেবল পূর্বপুরুষের ভালটাই গ্রহণ করবে আর মন্দটা পরিহার কবে? ভালোটা শরণ করতে গেলে মন্দটা মনের কোণে উঁকি দেবে– আর ভালটাকে কেউ শরণ করলে মন্দটাও তাকে অনুসরণ করবে। কে না জানে মানুষের মন্দের আকর্ষণই বেশি? কারণ শয়তান অলস নয়।
