.
০২.
তাঁদের বিশ্বাস, যুক্তি ও নীতি একটিই।
আমাদের পূর্বপুরুষ আমাদের ভাবনা ভেবে রেখেছেন। আমাদের তারা ধর্ম দিয়েছেন, আদর্শ দিয়েছেন, রীতি দিয়েছেন, নীতি শিখিয়েছেন, আচার জানিয়েছেন, আচরণ বাতলিয়েছেন, খাদ্যতালিকা দিয়েছেন, পোশাকের আদল দিয়েছেন, হাসি-কাসি-হাই তত্ত্ব রেখে গেছেন, দিন-ক্ষণ মাস-রাশি-নক্ষত্র জানিয়েছেন। আকাশ ও পৃথিবীর তথ্য, ইহ-পরকাল তত্ত্ব পাপ-পুণ্য ও স্বর্গ-নরক চিত্র –এর কোন্টি আমাদের আর জানতে বাকি আছে! এতে দর্শন-বিজ্ঞানের কোন্ তত্ত্ব নেই! কী তাঁরা দিয়ে জাননি যে আমরা নতুন করে খুঁজে খুঁজে খেটে খেটে হয়রান হব!
যারা পূর্বপুরুষের গড়া জীবন-ছাঁচ অবহেলা করে তারা পামর। এ সম্পদ, এ রিথ যারা অগ্রাহ্য করে তারা জাহিল। যারা বিদ্রূপ করে তারা নাস্তিক, যারা বিদ্রোহ করে তারা অভিশপ্ত শয়তান। কেননা পুরোনো কালেই বিধাতা নিজে এসে তার নির্বাচিত প্রিয়জনদের পাঠিয়ে শিশু ও পশু মানুষকে জীবনের যা কিছু জ্ঞাতব্য, যা কিছু কর্তব্য, যা কিছু প্রয়োজনীয়, তা শিখিয়ে পড়িয়ে বুঝিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন। সেসব ত্রিকালজ্ঞ নবী-ঋষির মতো জ্ঞান-প্রজ্ঞা-বুদ্ধিসম্পন্ন লোক পৃথিবীতে কখনো হয়নি, কখনো হবে না। কারণ তাঁরা ছিলেন বিশেষ উদ্দেশ্যে তৈরি বিশেষ মানুষ– লোক-শিক্ষক।
অতএব আমাদের কর্তব্য প্রদত্ত জ্ঞান আয়ত্ত করা, বিধি-নিষেধ মেনে চলা, তাঁদের প্রদর্শিত জীবন-পদ্ধতি অনুসরণকরা আর নিশ্চিন্তে জীবিকা অর্জনে মনোযোগ দেয়া। আহা তাঁদের দানের তুলনা নেই? আমাদের কাজ কেবল কৃতজ্ঞ ও অনুগত থাকা। নিতান্ত জাহিল অর্বাচীন না হলে কি কেউ এমন নিশ্চিন্ত নীড় ভাঙে, এমন সুখের জীবন পায়ে ঠেলে!
.
০৩.
অপরপক্ষের কথায় তারা কান দেয় না। কারণ তারা বিশ্বাস ও বিস্ময়কে জীবন-যাত্রার পাথেয় করেছে। বিধির ও ভগবানের অর্থাৎ নিয়ম-নীতি ও নিয়ন্তার অনুগত হলে বিবেক থাকে অবহেলিত। নিজেরা চিন্তা করে না, কাজেই নতুন যুক্তি খুঁজে পায় না, তাই নতুন জীবন-দৃষ্টিও লাভ করে না। বিশ্বাসে ও শ্রদ্ধায় তারা অভিভূত। তাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন। তাদের মন ভয়-ভরসায় বিমূঢ়। নইলে তারা ভোলা চোখেই দেখতে পেত বিধাতার বরপুষ্ট মানুষ যা ভাবতে-খুঁজতে বুঝতে-করতে পারেননি, আজকের জ্ঞানী-বিজ্ঞানী-মনীষীরা তা পেরেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান-ইতিহাস দর্শন কিংবা অভিজ্ঞতা ও জীবনের ক্ষেত্রে সেদিন যা ছিল অভাবিত ও অসম্ভব, আজ তা মানুষের আয়ত্তে। আজকের মানুষের এত বড় সর্বাত্মক সাফল্য দেখেও যারা প্রাচীন নবী-ঋষির তুলনায় আজকের জ্ঞানী-মনীষীকে তত্ত্ব ও তথ্যের ক্ষেত্রে নির্বোধ-নির্জন ভাবতে পারে তাদের অন্ধতা ঘুচবার নয়।
আশ্চর্য, ছোটখাটো ব্যাপারেও তারা প্রশ্নহীন। পূর্বপুরুষের নির্ধারিত খাদ্যতালিকাও আমাদের রদবদলের অধিকার নেই। হালাল আর কখনো হারাম হবে না, হারামও হতে পারে না হালাল। পোশাকের পরিবর্তনও দূষণীয়। পৈত্রিক শত্রুকেও বন্ধু করা চলবে না। চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী, কান্তার মরু-পর্বত-সমুদ্র সম্বন্ধেও আমাদের তাত্ত্বিকজ্ঞানের পরিবর্তন পাপপ্রসূ। কেবল পূর্বপুরুষের কদম মোবারক শরণ ও অনুসরণ করেই মানুষ থাকবে কৃতার্থ ও তৃপ্তমন্য।
তারা অবশ্য জানে, তাদের নবী-ঋষিরা অজ্ঞাতপূর্ব জ্ঞান দিয়েছেন এবং অশ্রুতপূর্ব নতুন কথা বলেছেন, নতুন ধর্মমতও প্রবর্তন করেছেন। এবং তা বিধাতার অভিপ্রায় ও অনুমোদনক্রমেই সম্ভব হয়েছে। কলিকালে ঈশ্বর আর কোনো পরিবর্তন কামনা করেননি। তিনি যে-পাট চুকিয়ে দিয়েছেন কলিকালে শয়তান তা খুলে বসেছে। শয়তানের চেলারাই কেবল পরিবর্তন প্রয়াসী ও নতুনের সন্ধানী। তারা এ-ও জানে তাদের প্রত্যেকেরই পূর্বপুরুষ সুদূর সেকালে কিংবা অনতি অতীত একালে কোনো-না-কোন সমকালীন নতুন ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন। এবং তাদের মতে শেষবারের মতো সত্যধর্ম বরণ করে তাদের পূর্বপুরুষরা ঈশ্বর-দত্ত শেষ সুযোগ লাভের অনুগ্রহ লাভ করেছেন। এটিই ছিল বিধাতার সর্বশেষ আনুশাসনিক ও প্রশাসনিক সংস্কার বা পরিবর্তন। এর পরে তো বিধাতা প্রলয় অবধি বিশ্রাম-সুখই লাভ করেছেন।
.
০৪.
বিশ্বাসের অঙ্গীকারে ধর্মবোধের উদ্ভব ও স্থিতি। তাই ধর্মভাব অশিক্ষিত মানুষের ভূষণ, এবং ধর্মাদর্শ তাদের জীবনের দিশারী। ধর্মীয় নীতি ও রীতি তাদের জীবনযাত্রার পথ ও পাথেয়। লেখাপড়া-জানা ধর্মভীরু মানুষেরও মনোভূমি অনাবাদে অপচিত। আর একশ্রেণীর শিক্ষিত অথচ চরিত্রহীন বুদ্ধিমান দুরাত্মা সব জেনেবুঝেও স্বস্বার্থে এই বিশ্বাস-সংস্কার ও স্মৃতিকে প্রশ্রয় দিয়ে, পুঁজি করে মানুষকে শাসন-শোষণের আনন্দ, আরাম, গৌরব ও সম্মান লাভ করে। ধর্ম কিন্তু সব মানুষের সমান উপকার করে না। ধর্মের বিধি-নিষেধ প্রয়োগে বড়লোকের-ছোটলোকের ও নারী-পুরুষের পার্থক্য স্বীকৃত। রাজা যুদ্ধ করেন, পররাজ্য কেড়ে নেন, মানুষ হত্যা করেন –এতে পাপ নেই। সাধারণ লোক না বলে পরের তৃণখণ্ড নিলেও চৌর্যের কিংবা পীড়নের পাপ স্পর্শ করে। তাছাড়া ধর্ম বাধাপথে চলার যান্ত্রিক সুবিধা দান করে বটে, কিন্তু মনুষ্যত্ব বিকাশের কিংবা মানবিক বোধ-বুদ্ধির স্বাধীন প্রয়োগের অধিকার হরণ করে। ধার্মিক মানুষ পোষমানা প্রাণী। কেননা তার মন-বুদ্ধি বিবেকের স্বাধীন প্রয়োগ-পথ থাকে রুদ্ধ। এই মানুষ গোঁড়া, অসহিষ্ণু ও অনুদার না হয়ে পারে না।
