যখন ছোটে রক্ত উদধি এবং ফেনা-বিষ ক্ষরে গলগল যখন ছোটে রক্ত-ফোয়ারা বহ্নির বান, যখন কোটি বীর প্রাণে–শত সূর্যের জ্বালাময় রোষ গমকে শিরায় গমগম, যখন স্বর্গমর্ত্য পাতাল-মাতাল রক্তসুরায়, বিধাতাও ত্রস্ত; তখনই কেবল দানবীয় শক্তির ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। কামাল পাশা, আনোয়ার পাশা, রণভেরী, কোরবানী প্রভৃতি কবিতায় তাঁর বীর ও বীরত্বের আদর্শ সুপ্রকট। রক্ত ও মৃত্যু, প্রাণদান ও গ্রহণ, হিম্মত ও খঞ্জর বীরের নিত্যসঙ্গী–বলা চলে জীবনচর্যার অবলম্বন। খুনে খেলব খুন-মাতন এই হচ্ছে বীরব্রত। রণ-বিপ্লব-রক্ত বর্জিত মুক্তি তার কল্পনাতীত। বাহুবল ও মনোবল ব্যতীত প্রতিকার প্রতিরোধের অন্য কোনো উপায় তার মনে ঠাই পায়নি।
তার কল্পনা উদ্দীপ্ত হয়েছে রণ, রক্ত, রুদ্র, শক্তি, ঝড়, সূর্য, বহ্নি, মৃত্যু প্রভৃতি অবলম্বনে। এগুলোকে তিনি বল-বীর্যে প্রতীকরূপে গ্রহণ করেছেন। তেমনি ন্যায়, কল্যাণ ও অধিকারের প্রতীক হয়েছে সত্য। আর সবকিছুর গোড়ায় রয়েছে অহংবোধ–আমিত্ব তথা আত্মপ্রত্যয়। এটিই তাকে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে দিয়েছে প্রবর্তনা।
কিশোর বয়সেই নজরুল ইসলাম সৈন্যদলে ভর্তি হয়েছিলেন। পল্টনী ব্যায়ামেই তাঁর সৈনিক জীবন সীমিত। লড়াইয়ের কল্পচিত্র (যেমন ভার্দুনট্রেঞ্চ) ও বীরত্বের স্বপ্ন-সুন্দর জীবন তার মন হরণ করেছিল। বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকলে হয়ত তিনি এত রণ-রক্ত প্রিয় হতে পারতেন না, সহিংস বিপ্লবেও হয়তো থাকতো না তার এত আগ্রহ। ক্ষুধা-যন্ত্রণা-মৃত্যুশাসিত সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা ছিল না বলেই Chivalry যুগের কুইকসোটি প্রেরণার প্রভাব ছিল গভীর ও ব্যাপক। তাঁর সংগ্রামী কবিতায় তাই রক্ত-অগ্নি-ঝড় মৃত্যুই পেয়েছে প্রাধান্য। ত্রাস ও ধ্বংসকর মহাশক্তির অনুধ্যানেই তাঁর আনন্দ, সত্যের প্রতিষ্ঠা শক্তি দিয়েই সম্ভব–এই তার বিশ্বাস। কাব্যের ক্ষেত্রে এই প্রলয়ঙ্কর ভয়াল ভৈরবত্বের আবহ সৃষ্টির জন্যে প্রায় প্রতি কবিতায় হাইফেন-যোগে তিনি অসংখ্য বাপ্রতিমা নির্মাণ করেছেন। তাঁর মনোনীত ছন্দের বন্ধনে তাঁর নির্মিত বাক্-খণ্ডও উত্তেজিত মানুষের আবেগচালিত অনর্গল বক্তৃতার মতো করে তুলেছে তাঁর কবিতাগুলোকে। রুদ্ধশাসে যেন অনবসর জীবনের কথাগুলো বলে শেষ করতে পারলেই আবেগ-ভারাক্রান্ত মানুষটি স্বস্তি পান। আবেগের তাপে মুখে যেন তার খই ফুটছে, পটকার মতো গর্জে উঠছে যেন এক-একটি কথা।
অগ্নি-ঋষি, বহ্নি-রাগ, অগ্নি-মরু, বেদন-বেহাগ, অগ্নি-সুর, রক্ত-শিখা, প্রলয়-নেশা, মৃত্যুগহন, বজ্র-শিখা, প্রাণ-লুকানো, রক্ত-তড়িৎ, সৃজন-বেদন, বজ্ৰ-গান, শাসন-ত্রাসন, চুম্বন-চোর-কম্পন, রৌদ্র-রুদ্র, হিম্মত-হ্রেষা, অগ্নি-পাথার, নভ-তড়িৎ,বহ্নি-ফিনিকি, লাল-গৈরিক, রোষ-হুঁতাশন, রক্ত উদধি, ফেনা-বিষ, রক্ত- ফোয়ারা, রক্ত-সুরা, মন-খুনী, খুন-খচা, রক্ত-অশ্ব, জ্বালা-ক্রন্দন-কুর, বিষ-মদ-চিকুর, ফণা-ছায়া-দোল, অশুভ-অগ্নি-পতাকা, মমতা-মানিক, বিষ-অভিশাপ-সিক্ত, অগ্নি স্নান, অগ্নি-ফণী, সোহাগ-সুখ-ছোঁওয়া, জরজর শোক, বহ্নি-সিন্ধু, আঁসু-পরিমল, হারামণি-পাওয়া হাস্য, রক্ত-পাথার, ক্রন্দন-ঘন, জীবন-ফাগুন, মালঞ্চ-ময়ুর-তখৃত, ধ্বংস-বন্যা, শক্তি-বস্ত্র, বহ্নি বীর্য, অগ্নি-মন্ত্র, মুক্তি-তরবারি, উল্কাপথিক, মাভেঃবিজয়মন্ত্র, ফন্দি-কারার, গণ্ডী-মুক্ত, ভয়-দানব, অমর-মর-সিন্ধু-তীর, রক্ত-যুগান্তর, স্বরাজ-সিংহদুয়ার, দেশ-দ্রৌপদী, দুঃশাসন-চোর, জাত-শেয়াল, জাত-জুয়ারী, বহ্নি-লিখা, মুক্তি-শখ, মৃত্যু-শোণিত এলকোহল, প্রাণ-আঙুর, আকাশ গাঙ, স্নেহ সুরধুনী, গ্রহণ-বালা, বোলতা-ব্যাকুল–এমনি আরো শত শত বাক-মূর্তি রয়েছে তাঁর কাব্যে। বস্তুত এগুলো তার মনোভঙ্গির–তার মানস বা Style-এর পরিচয়বাহী এবং হয়তো অসম্ভুত আবেগেরও প্রমাণক।
পূর্বপুরুষ : উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্য
০১.
নির্বোধ যখন বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে, ঘরে-সংসারে তখনই যথার্থ বিপদ নেমে আসে, ক্ষতির ঝুঁকি তখনই বেড়ে যায়। নির্বোধের কোনো স্বকীয় অভিজ্ঞতা থাকে না। পরের জ্ঞানে সে জ্ঞানী, পরের মুখে শোনা যুক্তিপ্রয়োগে সে তার্কিক।
মানুষের সমাজে প্রগতির বড় বাধা এই নির্বোধেরাই। তারা অবশ্য বৈষয়িক ব্যাপারে নির্বোধ নয়। বলতে গেলে তাদের অর্জিত বিদ্যা, বুদ্ধি, জ্ঞান, উদ্যম সবকিছুই তারা তাদের বৈষয়িক জীবনের নিরাপত্তা ও প্রসারের জন্যে নিয়োজিত করে। তাই তারা সমাজ–ধর্ম-রাষ্ট্রবিজ্ঞান-দর্শন প্রভৃতির তত্ত্বচিন্তার ভার কয়েকজনের উপরেই ছেড়ে দেয়। এবং নিজেদের পছন্দমতো কারো ভাব চিন্তা ও যুক্তি-বুদ্ধির প্রতি আনুগত্য রেখে দিব্যি সুখে জীবন কাটায়। কিন্তু তাদের সমর্থিত চিন্তা ও চিন্তানায়কদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী চিন্তা ও চিন্তানায়কদের মত-পথের দ্বন্দ্ব-সংঘাত শুরু হলে কাক শেয়ালের মতো স্ব স্ব নায়কের পক্ষে হৈ চৈ, মারামারি কিংবা প্রয়োজনমতো হানাহানি শুরু করে দেয়। জীবনের অন্যক্ষেত্রে যতই তাদের দায়িত্ববোধ কিংবা কর্তব্যবুদ্ধির অভাব থাক, এ ক্ষেত্রে তাদের সতর্কতা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও সঙ্প্রীতি নির্ভেজাল। এভাবে তারা হযরত মুসা-ঈসা-মুহম্মদ প্রমুখ অনেককেই লাঞ্ছিত, বিতাড়িত ও হত্যা করেছে।
