বলাবাহুল্য, নজরুল ছিলেন বিপ্লবী ও বিদ্রোহী। তিনি উপায়নিষ্ঠ ছিলেন না বটে, কিন্তু তাঁর লক্ষ্য ছিল অবিচল। এ-ও সত্য যে, তিনি রাজনীতিক জটিলতা বুঝতেন না। কিন্তু বৈপ্লবিক চেতনা ছিল তাঁর গভীর ও তীব্র। তাঁর মন ও মস্তিষ্কের মেলবন্ধন ছিল না বলেই তাঁর ভাবকর্ম যতটা আবেগ-চালিত, ততটা মনীষা-নিয়ন্ত্রিত ছিল না। রক্তপিচ্ছিল সহিংস বিপ্লবই তাঁর প্রিয় ছিল, তবু তিনি অভীষ্ট সিদ্ধির অন্য উপায়কেও অভিনন্দিত করেছেন। তার অস্থির অথচ অকৃত্রিম আগ্রহ ও সমর্থন ছিল সব পদ্ধতিরই প্রয়োগ-প্রয়াসে।
সমাজ ও ধর্মবুদ্ধির সংস্কারে, আর্থিক জীবনের রূপান্তরে এবং রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর আকুতি-আকুলতার তীব্রতাই তাঁকে মারি অরি পারি যে-কৌশলে মতে প্রবর্তনা দিয়েছিল। এসব কিছুর মূলে রয়েছে শোষিত-পীড়িত মানুষের প্রতি দরদের গভীরতা। তা ছাড়া আরো একটি অবচেতন প্রেরণা হয়তো ছিল–সেটি আত্মত্রাণের; কেননা তিনিও ছিলেন নিঃস্বদের একজন। এই দ্বৈতকারণের সমন্বয়ে তাঁর বাণী তীব্র, তীক্ষ্ণ ও অকৃত্রিম যেমন হয়েছে, তেমনি হয়েছে ক্ষুব্ধ, কুদ্ধ ও বঞ্চিত ব্যক্তির প্রাত্যহিক জীবনের তুচ্ছ আবেগে ভারগ্রস্ত।
এ কারণেই জাগ্রত জীবনের আহ্বানে যারা বুকের রক্ত দিয়ে কঠিন মাটি নরম ও উর্বর করে, যারা পলাশলাল সূর্যের অনুধ্যানে আনন্দিত, যারা খুন-রাঙা তরুণ তপনের আকর্ষণে চঞ্চল, যারা আত্মাহুতির উল্লাসে মত্ত, যারা বাঁচবার আগ্রহে মৃত্যুবরণ করে চরম তাচ্ছিল্যে, যারা মহিমান্বিত মৃত্যুর সঞ্চয়ে ও জাগ্রত জীবনের ঐশ্বর্যে সমৃদ্ধ করে দেশ ও জাতিকে; তাদেরই বন্দনা গেয়েছেন। কবি। তাদেরকেই তিনি জেনেছেন দেশ-জাত-মানুষের ত্রাণকর্তা বলে। যৌবনে ও তারুণ্যে তাঁর প্রত্যয় ছিল প্রবল। তার দৃঢ় বিশ্বাস–চিরকাল এমনি তরুণেরাই নর-দানবের পাশব শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে লড়ে আত্মাহুতি দিয়ে দেশ-জাত-মানুষকে পীড়ন থেকে, শোষণ থেকে ও অপমৃত্যু থেকে বাঁচিয়েছে। তাই যার মধ্যেই এই প্রাণপ্রাচুর্য, এই তারুণ্য, এই যৌবনদীপ্তি ও সংগ্রামী স্পৃহা প্রত্যক্ষ করেছেন; দেশ-কাল-জাতের গণ্ডী অতিক্রম করে তিনি তারই প্রশস্তি রচনা করেছেন। তাদের নামে সংগ্রামে অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছেন দেশের তরুণদের। প্রবুদ্ধ তারুণ্যের ও জাগ্রত যৌবনের বন্দনায় তিনি মুখর থেকেছেন সর্বক্ষণ।
শাসক-শোষক-পীড়ক এক রক্ত-খেকো রাক্ষুসে শক্তি। বাঘ-সিংহের মতোই তার লোভ ও হিংস্রতা। বুকের রক্ত দিয়েই তার মোকাবিলা করতে হয়। পার্থক্য কেবল এই, বাঘ-সিংহ রক্ত খেয়ে হয় পুষ্ট এবং আরো লুব্ধ, আর রক্তের স্পর্শে চুন-লাগা জেঁকের মতো কাবু হয়ে পড়ে ঐ দানবীয় শক্তি, গণরক্তের বিষক্রিয়ায় তার শক্তি-ভাণ্ড হয় জর্জরিত। এজন্যেই রক্তের বিনিময়ে আসে মুক্তি। দানবীয় রাক্ষুসে শক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা সম্মুখসমরের জন্যে তাই তরুণের তাজা টকটকে লাল রক্ত প্রয়োজন।
অতএব রক্তদানের অঙ্গীকারে নজরুলের গণসংগ্রামের শুরু এবং যারা এভাবে বুকে বুলেট কিংবা গলায় ফাঁস গ্রহণ করেছে, তারাই নজরুলের ব্যবীর। আর যারা মুক্তিসংগ্রামে বুকের রক্তদানে উৎসুক তারাই তাঁর ভরসাস্থল। সংগ্রাম-সুন্দর রক্ত-ঝরা দিন এবং রক্ত-রাঙা মাটিই তাঁর স্মৃতির সঞ্চয় ও ঐতিহ্যের আকর। তাই মৃত্যুর মহিমান্বিত রূপের অনুধ্যানে তার আনন্দ। নতুন সৃষ্টির সুখ-উল্লাসই তাঁকে প্রবর্তনা দেয় পুরোনো সবকিছুর ধ্বংস সাধনায় এবং জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশ-স্বপ্নই মৃত্যুবরণ করে উৎসাহিত। এই ধ্বংস ও মৃত্যুর ভয়াল রূপের অন্তরে রয়েছে কল্যাণ সুন্দর রূপ :
জরায় মরা মুমূর্ষদের
প্রাণ লুকানো ঐ বিনাশে–
এবার মহানিশার শেষে
আসবে ঊষা অরুণ হেসে
করুণ বেশে।
দিগম্বরের জটায় লুটায়
শিশু চাঁদের কর
আলো তার ভরবে এবার ঘর।
কাজেই,
ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর?
প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন।
আসছে নবীন জীবনহরা
অসুন্দরে করতে ছেদন।
কেননা,
ভেঙে আবার গড়তে জানে।
সে চির-সুন্দর।
এই ভয়ঙ্কর আসে দুরন্ত, দুর্মদ, দুর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস, অথচ গণকল্যাণকামী রক্ত-মাতাল মৃত্যু-মাতাল তরুণরূপে। তাই বেদুঈন, চেঙ্গিস, পরশুরাম, দুর্বাশা, জমদগ্নি, নটরাজ, বিশ্বামিত্র, খালেদ, উমর, হায়দর, কামাল, আনোয়ার প্রভৃতি তার কাছে পৌরুষের আদর্শ। এ দুর্বার বিদ্রোহ ভৃগুর মতোই ভগবান-বুকে পদচিহ্ন এঁকে দেয়ার স্পর্ধা রাখে।
কবির প্রিয় ধ্বজা রক্তরঙিন, তাঁর প্রিয় ফুল জবা ও পলাশ, তাঁর প্রিয় পোশাক লাল-গৈরিক, তাঁর প্রিয় শরাবও রক্তরাঙা; তার সংগ্রামী প্রেরণাও হয়তো এসেছিল লালফৌজ থেকে, তাঁর আসমানও খুন-খারাবির রঙ মাখা, তাঁর বিপ্লবের ঘোড়াও রুধির-লাল-রক্ত অশ্ব। তাঁর প্রিয় শাড়ি লাল, কেননা তার বিশ্বাস রক্ত-দান ও গ্রহণ- সামথ্যেই মানবিক সমস্যার সমাধান। তাই তিনি শক্তিরূপিণী দেশমাতৃকার অঙ্গে কামনা করেছেন রক্তাম্বর, হাতে চেয়েছেন খুনরাঙা তরবারি, ললাটে দেখতে চেয়েছেন সিঁদুরের বদলে কালচিতার রাঙা আগুন এবং আরো কামনা করেছেন দেশমাতার চরণ-আঘাতে উদগারে যেন আহত বিশ্ব রক্ত-বান, এবং বুকে-মুখে-চোখে রোষ হুতাশন, নয়নে তার ধূমকেতু জ্বালা উঠুক সরোষে উদ্ভাসি। আর জালিমের বুক বেয়ে খুন ঝরে লালে লাল হোক শ্বেত হরিৎ।
