.
১০.
এবার গানের কথা বলি। সত্য বটে নজরুল অজস্র গান রচনা করেছেন। তাঁর গানের সংখ্যা কেউ বলেন দু-হাজার, কেউ বলেন তিন হাজার। সুরস্রষ্টা হিসেবেও তিনি প্রখ্যাত। বিদেশের ও বিভাষার নানা সুর বাঙলা গানে সংযোজিত করে এবং অনেক মিশ্ররাগ নির্মাণ করে তিনি গানের আকাশ করেছেন বিস্তৃত, সঙ্গীতশাস্ত্রকে করেছেন ঋদ্ধ। তাঁর গানের কথা ও সুর সঙ্গীতরসিকদের মুগ্ধ করেছে। তাঁর গানের স্বীকৃত বিশিষ্টতা রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো নজরুলগীতিরও গর্বিত স্থূল বা খান্দান গড়ে তুলেছে। গানের জগতে নজরুলের দিগ্বিজয়ী জনপ্রিয়তা-মুগ্ধ কোনো কোনো গুণী ও বিদ্বান এমনও মনে করেন যে, কাজের ক্ষেত্রে যাই হোক, গানের ভুবনে নজরুল অমর এবং তাঁর গান ও সুর থাকবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও অবিনশ্বর। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, দুনিয়ায় অক্ষয় অবিনাশী কিছুই নেই। রবীন্দ্রনাথের গান যেমন কাব্য হিসেবেও সুন্দর ও ভাবগর্ভ অর্থাৎ তাতে ভাব, ভাষা, ছন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে সূক্ষ্ম গভীর বাণীও। নজরুলেরও অনেক গান তেমন সব গুণে ঋদ্ধ। কিন্তু আধুনিক গানের তোড়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতই পিছিয়ে পড়ছে, নজরুল গীতই বা কি টিকবে! কালান্তরে পুরোনো সুর টেকে না বলেই গান নশ্বর। যুগে যুগে যুগোপযোগী সুরই যুগের চাহিদা মিটায় এবং কালান্তরে তা বিলীন হয় কালগর্ভে। মানুষ চিরকালই সুখে দুঃখে, কাজে অকাজে, ভয়ে ভক্তিতে, দ্বন্দ্বে সগ্রামে গান গেয়েছে বটে, কিন্তু তা কখনো অপরিবর্তিত থাকেনি। বৈদিক বন্দি গন্ধর্বের গায়ত্রী বন্দনা থেকে আজকের আধুনিক গান অবধি সঙ্গীতের এদেশী বিবর্তন ধারাই আমাদের এ ধারণার সমর্থক। কালে কালে মানুষের মন বদলায়, বদলায় রুচি। তাছাড়া ভাষা আর সুরও বদলায়। কাজেই মনের সঙ্গে কথা এবং ভাষার সঙ্গে সুরের পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। তাই তো আমাদের কীর্তন, গাজন, গম্ভীরা, রামপ্রসাদী যেমন সাধন-ভজন সংপৃক্ত হয়েও লুপ্তপ্রায়, তেমনি মানবিক সুখ দুঃখের গানও অতিক্রান্তকালে চিরদিনই হয়েছে বিলুপ্ত। বাউলগান, ব্রহ্মসঙ্গীত, দ্বিজেন্দ্র-রজনী-অতুল-মুকুন্দের গানই বা আজ আর কে গায়! কাজেই মর্মান্তিক হলেও এ সত্য অস্বীকার করা চলবে না যে রবীন্দ্র-নজরুলসঙ্গীতও আগামী পঞ্চাশ বছরও টিকবে না।
.
১১.
নজরুলের অনেক অপূর্ণতার কথাই বলা হল বটে, কিন্তু তবু একটা প্রশ্ন থেকে যায়। গীতিকবি তো দার্শনিক কিংবা সমাজকর্মী নন, তাঁকে নানা দায়ে দায়ী করার সার্থকতা কী? স্বেচ্ছায় যা দিয়েছেন বা দিতে পেরেছেন, এবং আমরা যতটুকু আনন্দ ও প্রেরণা পেয়েছি বা পাচ্ছি তা তো যথালাভ। তাছাড়া সাধারণ পাঠকের কাছে তিনি আজকের পরিবেশেও অম্লান সূর্য, প্রাণময়তার উৎস। তার ছিল তাজা, তরুণ ও উচ্ছল প্রাণ। সেই প্রাণের স্পর্শে দেশে জেগে উঠেছিল লক্ষ প্রাণ। আজো তেমনি জাগে, কেননা তিনি যে-পরিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষণা করেছিলেন, তা আজো অবিলুপ্ত। তাই আজ বাঙলার সবকিছু ভাগ হয়েছে। ভাগ হননি কেবল নজরুল। এজমালি সম্পদরূপে তাঁর এই স্থিতিই প্রমাণ করে যে নজরুল এত বিচ্যুতি সত্ত্বেও সার্থক ও সফল কবি। বাঙলার ও বাঙালির তিনি আজও মনের মানুষ, হৃদয়ের ধন, সংগ্রামের প্রবর্তনদাতা নায়ক। এক হৃদয়ের প্রীতি অন্য হৃদয়েও অনুরাগ জাগায়। সীমিত ও সংকীর্ণ অর্থে নজরুলও মানবতাবাদী ও মানবপ্রেমিক। তাঁর বিদ্রোহের জড় রয়েছে এই মানবতাবোধে। মানবপ্রীতিই তাঁকে বিদ্রোহী ও নিষ্ঠুর সংগ্রামী করেছিল। তিনি বলেছেন, আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম পেতে এসেছিলাম। তাঁর সেই অভিলাষ পূর্ণ হয়েছে। নজরুল দীন-দুঃখী-নিপীড়িত মানুষকে ভালোবাসতেন, তাই শোষক- পীড়করা ছিল তার শত্রু। স্বদেশের কৃতজ্ঞ মানুষের কাছে তিনি প্রাণপ্রিয় হয়েই আছেন। তাই তারা তাঁকে ভুলেনি, ভুলবে না, ভুলতে পারবে না। জয়তু নজরুল।
নজরুল-কাব্যে বীর ও বীর্যপ্রতীক
যদি আমরা বিশ্বাস করি, যে-কোনোকিছুর উপযোগ ও ফলপ্রসূতা তার স্বকালেই সীমিত, তাহলে কোনোকিছুই কালজয়িতা ও চিরন্তনতার জন্যে আমাদের উৎকণ্ঠা ঘুচাবে। আসলে চিরন্তনতার কামনা একটি মানসমোহ ছাড়া কিছু নয়। এটি আবেগের প্রসূন, উপযোগ-বুদ্ধি কিংবা প্রয়োজন চেতনার ফল নয়। প্রকৃতির জগতে ফুল-পাতা, অথবা আম-জাম, কলা-মূলা স্বল্পজীবী, তাই বলে কোনো অর্থেই তাদের জীবন মিথ্যে বা ব্যর্থ নয়। তেমনি মানুষের জীবনে ও সমাজে কোনোকিছুরই উপযোগ চিরস্থায়ী নয়–অন্তত তার স্থানিক, কালিক ও ব্যক্তিক উপযোগ ভেদ ও রূপান্তর আছে। কোনো পুরাতনই নতুনকালের নতুন মানুষের চাহিদা পূরণ করতে পারে না। এই তাৎপর্যে নতুন মানে বর্তমান আর পুরাতন অতীতেরই প্রতীক। সকালে যা নতুন, অতিক্রান্তকালে তাই হৃতউপযোগ পুরাতন।
এই দৃষ্টিতে নজরুল-কাব্য আজো নতুন। তার উপযোগ ও প্রয়োজন আজো বর্তমান। কেননা আমাদের সমাজে, ধর্মে, অর্থনীতিতে ও রাজনীতিতে আজো রূপান্তর ঘটেনি। নজরুল-বিঘোষিত সগ্রাম ও সগ্রামের উদ্দেশ্য আজো সফল হয়নি। লক্ষ্য আজো অনায়ত্ত, মঞ্জিল আজো অদৃষ্ট। তাই নজরুল আজো প্রিয়নাম। নজরুল-কাব্য আজো অবশ্যপাঠ্য। এ-কারণেই বাঙলার সবকিছু ভাগ হয়েছে, ভাগ হয়নি নজরুল। পর হয়ে যাননি তিনি কারো–তাই তাকে নিয়ে আজো দুই বঙ্গে এত টানাটানি ও কাড়াকাড়ি।
