.
০৮.
আরো দুটো বিষয়ে তার প্রবল আগ্রহ ছিল-ছন্দে ও শব্দে। ছন্দের ক্ষেত্রে সত্যেন্দ্রনাথের প্রবল প্রভাব অনুকৃতি ও অনুসৃতির পথে তাকে ছন্দো-স্রষ্টার মর্যাদায় উন্নীত করে। আরবি-ফারসি ছন্দের আদলে বাঙলা ছন্দ সৃষ্টি করে তিনি বাঙলা ছন্দে বৈচিত্র্য ও বিস্তার দান করেছেন, তেমনি সুরের ক্ষেত্রেও তিনি অনেক নতুন ও মিশ্র রাগ-রাগিণীর স্রষ্টা।
রবীন্দ্রনাথের ভাষার প্রভাবও নজরুলে ছিল গভীর। রবীন্দ্র-কাব্যের ও গানের বহু Phrase নজরুল হুবহু গ্রহণ করেছেন, তাঁর অনেক বাক্যাংশ কিংবা চরণাংশও দুর্লভ নয় নজরুলের কাব্যে। নজরুল আরবি-ফারসি শব্দ প্রয়োগের প্রেরণা পেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ ও মোহিতলাল থেকে। এ বিষয়ে সত্যেন্দ্রনাথ ছিলেন মোহিতলালেরও গুরু।
দেশী মুসলমানরা দৈশিক ও ভাষিক পরিচয়ে বাঙালি। এবং আরব-উদ্ভূত ধর্মে বিশ্বাসী। বাঙালি হিসেবে সব মুসলমানেরই দৈশিক ঐতিহ্য ও পুরাণের–যা নামান্তরে হিন্দুর ও হিন্দুয়ানীর সঙ্গে অল্পবিস্তর পরিচয় ঘটে এবং ধর্মীয় সূত্রে আরব-ইরানি ঐতিহ্য ও পুরাণেরও কিছু কিছু জানাশোনা থাকে। ফলে মুসলমান মাত্রেই হিন্দু-মুসলিম ঐতিহ্য ও পুরাণের সঙ্গে পরিচিত। এবং যেহেতু হিন্দুর দৈশিক ও ধার্মিক ঐতিহ্য ও পুরাণ অভিন্ন, তাই হিন্দু মাত্রই কেবল দৈশিক নামান্তরে হিন্দুর–ঐতিহ্য ও পুরাণই জানে। এরই অপব্যাখ্যায় নজরুল বা মুসলিম লেখক উদার বলে প্রশংসিত, আর রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতি হিন্দু লিখিয়েরা নিন্দিত হয়েছেন গ্রহণ-বিমুখ সংকীর্ণচিত্ত বলে।
বলেছি নজরুল অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই দ্বিবিধ ঐতিহ্য ও পুরাণ আয়ত্ত করেছিলেন। এবং মুসলিম ঐতিহ্যের ও হিন্দু পুরাণের সার্বত্রিক সুপ্রয়োগে নতুন রস ও লাবণ্য লাভ করেছে তার কবিতা ও গান। এজন্যেই তাঁর কবিতা ও গানে অতিকথন দোষ, আবেগপ্রাধান্য, চটুল ছন্দের বহুল প্রয়োগ, শিথিল বাকৃবিন্যাস, ভাবগত স্ববিরোধ ও অসংলগ্নতা এবং পৌনপুনিকতা দোষ সহসা দৃষ্টিগোচর হয় না। নইলে এমনও দেখা যায় পৌরাণিক রূপ-প্রতীকাদি কিংবা তাঁর প্রিয় শব্দগুলো প্রয়োগ করবার লোভে বক্তব্য শেষ হওয়ার পরেও তিনি কবিতা দীর্ঘ করেছেন। এতে কবিতায় ভাবগত স্ববিরোধ ও অসঙ্গতি প্রশ্রয় পেয়েছে, ফলে কাব্যে রসাভাস ঘটেছে। বিদ্রোহী, দারিদ্র্য, পূজারিণী, সিন্ধু প্রভৃতি বহু শ্রেষ্ঠ কবিতায় এ দোষ লক্ষণীয়। আর এই ঐতিহ্য ও পুরাণ সংপৃক্ত উপমা-রূপক-উৎপ্রেক্ষার বহুল প্রয়োগ নেই বলেই তাঁর উচ্ছ্বাসপূর্ণ গদ্য রুচিবান পাঠকের পক্ষে প্রায় অসহ্য।
আসলে ভঙ্গিও নয়, বক্তব্যও নয়, মুসলিম ঐতিহ্যের ও হিন্দু পুরাণের সুষম দেদার অঢেল অজস্র ব্যবহারই নজরুলের কবিতা ও গানকে লোকপ্রিয় করেছে। তাঁর কবিগৌরব এতেই লব্ধ, তার জনপ্রিয়তা এতেই প্রতিষ্ঠিত, তাঁর বৈশিষ্ট্য এতেই সুপ্রকাশিত।
.
০৯.
নজরুলের প্রেমের কবিতা ও গান সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য সামান্য। নজরুল বলেছেন বটে : মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী, আর হাতে রণ তুর্য কিন্তু তাঁর অন্তরলোকেও দেখছি দুটো আলাদা কোঠা। একটি অপরটি থেকে পাকা দেয়ালে বিচ্ছিন্ন। এ-কক্ষ ও-কক্ষ দুটো সদর-অন্দরের মতো একেবারে ভিন্ন জগৎ, ভিন্ন আলো আকাশ, বিপরীত আবহাওয়া। এক কক্ষে আগুন, অপর কক্ষে অশ্রু। এখানেও কবির দ্বৈতসত্তা প্রকট।
একই কালে তিনি শোষণ, পীড়ন, ভণ্ডামি, পরাধীনতা, কুসংস্কার প্রভৃতির বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ চিত্তে সংগ্রামী কবিতা যেমন লিখেছেন, তেমনি নারীপ্রেমের কোমলকান্ত পদও রচনা করেছেন, তেমনি লিখেছেন নাত কিংবা শ্যাম-শ্যামাসঙ্গীত। অথচ একভাব কোনো ক্রমেই অন্যভাবকে প্রভাবিত করেনি, লজ্ঞান করেনি, করেনি আচ্ছন্ন। এ এক অদ্ভুত ব্যাপার, কবির আশ্চর্য দক্ষতার স্বাক্ষর, এবং আমাদের কাছে বিস্ময়কর সংবাদ। এ কি গভীর বোধ, প্রত্যয় ও নিষ্ঠার অভাবপ্রসূত! এ কি চঞ্চল চিত্তের অস্থির প্রকাশ সঞ্জাত অথবা এ ধীরচিত্ত প্রতিভার এক আশ্চর্য প্রকাশ! না কি একটা মিটিংকা বাত, অপরটা অন্তরঙ্গ আলাপ! এর হদিসের জন্যে কবির ব্যক্তিক জীবনের অনুষঙ্গ জ্ঞান আবশ্যক।
অগ্নিবীণা, বিষের বাঁশীর সঙ্গেই পাচ্ছি দোলন চাঁপা, ছায়ানট, পুবের হাওয়া; আবার ভাঙার গান, সাম্যবাদী, সর্বহারা, ফণিমনসা ও জিঞ্জিরের পাশে পাই বুলবুল, চোখের চাতক, চক্রবাক; পুনরায় পাচ্ছি সন্ধ্যা ও প্রলয় শিখার সঙ্গে চন্দ্রবিন্দু। কিন্তু যতই অবাক হই, এও নজরুলের পক্ষে সম্ভব এবং সত্য ছিল।
নজরুলের প্রেমের গান ও কবিতা বৈচিত্র্যবিহীন। Pangs of separation and disappointment-ই তার প্রেমের কবিতা ও গানের প্রধান সুর। তার পত্রোপন্যাস বাঁধনহারায় এর প্রথম উন্মেষ। না-পাওয়ার বেদনা, পেয়ে হারানোর জ্বালা, অবহেলা প্রাপ্তির ক্ষোভ, ভুলতে না-পারার যন্ত্রণা, সাধাসাধির ব্যর্থতায় হতাশা, পাওয়া-না পাওয়ার অবমাননা, প্রিয়ার স্মৃতির সঞ্চয়ে ঠাই না-পাওয়ার ব্যথা, মিলনোক্কণ্ঠা, বিচ্ছেদ শঙ্কা, আনন্দিত স্মৃতির বিষাদ, বিরহ বিধুরতা, অতৃপ্তির অস্থিরতা, প্রতিদান না-পাওয়ার দাহ প্রভৃতিই তাঁর প্রেমবিষয়ক বিভিন্ন কবিতায় ও গানে অভিব্যক্ত।
এ প্রেমে সূক্ষ্ম ও মহৎ দর্শন নেই। এ নিতান্ত শারীর ও নির্লক্ষ্য। একনিষ্ঠতাও নেই। কবি বহুবল্লভ। আছে কেবল হৃদয়ের আকৃতি ও প্রণয়-বিহ্বলতা। একটা অসহ্য আবেগ, একটা অদম্য আকর্ষণ, একটা অসীম উৎকণ্ঠ, একটা অশেষ বাসনা, একটা অসহ্য অতৃপ্তি কবিকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে কাঁদিয়ে মারছে। বৈষ্ণব পদাবলীর রাধাও এমনি বিচলিতা, এমনি হতভাগিনী। তবু বিপ্রলব্ধ পর্বে-পূর্বাগে প্রেমবৈচিত্র্যে মানে প্রবাসে উপলক্ষ্য ও অনুভূতির বৈচিত্র্য আছে। নজরুলের কাব্যে তা দুর্লভ। তাই একই অনুভূতির পৌনপুনিকতা পীড়াদায়ক। মনে হয় একটা অকারণ ক্ষোভ, একটা অহেতুক বেদনা, একটা অগভীর অতৃপ্তি ও একটা কৃত্রিম বিরহ বাঞ্ছ বা বিলাস যেন কবিকে পেয়ে বসেছে। নজরুলের প্রেমের কবিতায় ও গানে তাই ক্ষোভ, কান্না ও বিলাপই মুখ্যত দৃশ্যমান। বহু-বল্লভের এই শারীর-প্রেম কবিকে কোনো বোধের তথা উপলব্ধির জগতে উত্তীর্ণ করেনি। তাই এ প্রেম নজরুলের চৈতন্যস্বরূপ হয়ে ফোটেনি।
