এমনকি তিনি কোরআনের মুমীন অনুবাদক এবং রসুলজীবনের ভাষ্যকারও। কোরআনে আল্লাহ বলেন, আমি যাকে ঐশ্বর্য দিই, তাকে বেহিসাব অপরিমেয় দিই। আমি সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করি। এবং রসুল ন্যায়নিষ্ঠায়, অনুকম্পায় ও দানে দীক্ষা দিয়েছেন, ধনবৈষমের নিন্দা করেননি। শাস্ত্র ও সাম্যবাদের মহিমা একই সঙ্গে উচ্চারণ নীতি-নিষ্ঠার অভাবপ্রসূত।
কোনো একক প্রত্যয় তাকে একনিষ্ঠ করেনি বলেই যা-কিছু তার কল্পনা-উদ্দীপিত করেছে, যা-কিছু তার বক্তব্যের অনুকূল, তা তিনি নির্বিচারে গ্রহণ করলেন এবং মত-পথের বিচার না করেই স্বাধীনতার সংগ্রামী মাত্রকেই সমান আগ্রহে করেছেন অভিনন্দিত। আবার কার্যকারণ বিচার না করেই ধনীকে জেনেছেন অপরাধী, ভেবেছেন শত্রু। নিজে নিঃস্ব ও দুঃস্ব বলেই তিনি নিপীড়িত মানবতার প্রতি সহানুভূতিশীল, নির্যাতিত মানবতার বিক্ষুব্ধ নায়ক। কিন্তু তার অবচেতন লক্ষ্য ছিল বুর্জোয়া ঐশ্বর্য ও বুর্জোয়া বিলাস। তাই ধনিক-বণিকদের হত্যা করে ধ্বংস করে তাদের ঐশ্বর্য ভোগ করতে চেয়েছেন তিনিঃ
এই ক্ষুধার জোরেই করব এবার সুধার জগৎ জয়।
—কৃষাণের গান
সংবেদশীলের যে মানবতাবোধ বুর্জোয়াকে স্বস্বার্থবিরোধী গণসংগ্রামে অনুপ্রাণিত করে, নিঃস্ব নির্যাতিত মানুষের দুঃখ মোচনে উদ্বুদ্ধ করে, নিজের কায়েমী স্বার্থ ও নিশ্চিত আরামের জীবন ত্যাগের তাকিদ দান করে, নজরুলের মানবতাবাদ সে শ্ৰেণীর নয়। এ অনেকটা স্বস্বার্থে সংগ্রাম এবং জৈবিক উত্তেজনা প্রসূত, তাই এ তমঃগুণজাত। এ কারণে এত দূরদৃষ্টি নেই–স্থায়ী সমাধান পন্থার নির্দেশ এতে অনুপস্থিত। শ্ৰেণীহীন সমাজ গড়ে তাতে নির্বিশেষ মানুষের কল্যাণ তিনি চাননি। কেননা ধনবৈষম্য তাঁর অনভিপ্রেত নয়। কেবল বুভুক্ষা-নগ্নতা-নিরাশ্রয় মুক্ত সমাজই তার। কাম্য যা ঐশ্বর্যশালী পুঁজিবাদী সমাজে দুর্লভ নয়। অতএব কুলি-মজুর-চাষীর জন্যে অন্ন, বস্ত্র, গৃহ সংস্থানই তাঁর লক্ষ্য, তা যেভাবেই হোক–দয়ায় বা দাবীতে।
এখানে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কলি মনে পড়ছে :
চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে।
নজরুলেরও মনটি ছিল ঠিক চোখের কোলেই। তিনি যা দেখেছেন, তাই বলেছেন, ভাবেননি কিছুই। তিনি চোখের আনুগত্যে চলেছেন, অন্তরের নির্দেশ পাননি। এর একাধিক গূঢ় কারণ আছে নিশ্চয়ই। সেগুলোর একটি শিক্ষাগত আর একটি আবেগসঞ্জাত।
.
০৬.
নজরুল দুটো বিষয়ে ব্যুৎপন্ন ছিলেন। একটি পাঁচশ বছর আগেকার ফারসি সাহিত্য এবং অন্যটি দুই-আড়াই হাজার বছর পূর্বেকার হিন্দু-পুরাণ। অথচ আমাদের আজকের জীবনবোধ ও শিল্পচেতনা পাশ্চাত্য শিক্ষায় লব্ধ। আধুনিক বাঙলা সাহিত্য তো ইংরেজি সাহিত্যেরই প্রতিরূপ। সেই কারণেই মোহিতলাল নজরুলকে একটি সৎ পরামর্শ দিয়েছিলেন, তাঁকে ইংরেজি সাহিত্য পাঠ করতে বলেছিলেন। তিনি তা গ্রহণ করেননি। আধুনিক জীবনবোধ বিকাশের জন্যে সমকালীন সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শন পাঠ আবশ্যক ছিল। নজরুল সে শিক্ষা গ্রহণ করেননি। নজরুলের জন্মের পূর্বেই ডারুইন, মার্কস ও ফ্রয়েড মানুষের জগতে ও জীবনে কালান্তর ঘোষণা করেছেন। এই তিনজনকে অবহেলা করে আধুনিক মানুষ হওয়া চলে না। নজরুলের কাছে ডারুইন ও ফ্রয়েড অজ্ঞাত আর মার্কস অবহেলিত। কাজেই তার বন্ধুরা তাঁর সম্বন্ধে সত্য কথাই বলেছিলেন :
পড়ে না কো বই, বয়ে গেছে ওটা।–কবির কৈফিয়ৎ
ফলে কাব্যের ক্ষেত্রে তিনি কেবল লাটিমের মতো ঘুরেছেন, অগ্রসর হননি মোটেই। ভাব ভাষা ছন্দ কিংবা ভঙ্গির ক্ষেত্রে তাঁর কাব্যে আবর্তন আছে, বিবর্তন নেই। কোনো নতুন অভিজ্ঞতার আনন্দে, কোনো নতুন প্রত্যয়ের ঐশ্বর্যে, কোনো নতুন সৃষ্টির সাফল্যে, কোনো নবলব্ধ চেতনার চাঞ্চল্যে, কোনো নবাবিষ্কৃত সত্যের প্রসঙ্গে তার জীবন কিংবা সাহিত্য উত্তরণের পথ খুঁজে পায়নি। জীবনে, সমাজে ও সাহিত্যে তিনি অন্ধের মতো কেবলই ছুটোছুটি করেছেন–বিপ্লবীরূপে, ধার্মিকরূপে, মরমীরূপে, প্রেমিকরূপে। শ্রান্ত হয়েছেন, সফল হননি।
নব নব কিশলয় মাধ্যমে বৃক্ষ বেড়ে ওঠে, আত্মবিস্তার করে। নজরুল-প্রতিভাকে বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করা চলে না। তাঁর প্রতিভা গুল্ম-জাতীয়–সহজে স্বপ্রতিষ্ঠ, নাতিবৃদ্ধি ও স্বল্পজীবী। ১৯২২ থেকে ১৯৩২ সনের মধ্যেই তার আকস্মিক উন্মেষ, বৈদ্যুতিক বিকাশ ও বেলুনীয় পরিণতি! এ সময়ের মধ্যে আম-জাম-বেগুন-বরইর মতোই তাঁর সৃষ্টি অঢেল অজস্র! বাকি বারো বছরের ফসল সামান্য, বৈশিষ্ট্য বর্জিত, নিস্পন্দ ও ম্লান। অথচ তখনো তিনি প্রৌঢ় নন, যৌবনের প্রান্তসীমায় দাঁড়িয়ে মাত্র।
.
০৭.
নজরুল তাঁর মন ও মস্তিষ্কের অদ্বয় সহযোগিতা পাননি কোনোদিন। হৃদয়বৃত্তিই ছিল তাঁর সম্বল। তাই তিনি সর্বত্র আবেগ চালিত। আবেগ পরিমিতি মানে না। তাই তাঁর রচনায় পরিমিতি দুর্লভ। অতিকথন তাঁর গল্পে উপন্যাসে নাটকে প্রবন্ধে এবং গানে কবিতায় সর্বত্র দৃশ্যমান। এই আবেগ বিহ্বলতা, এই উচ্ছ্বাসের অপ্রতিরোধ্যতা তার গল্প উপন্যাস নাটক প্রবন্ধ মাটি করেছে। গান ও কবিতা দুঃসহ হয়নি অন্য কারণেএস কথা পরে হবে। এমকি সামান উৎসর্গপত্র কিংবা মুখবন্ধও উচ্ছ্বাসের আত্যন্তিকতায় ফেনিল। আবেগ উচ্ছ্বাস স্থানকাল বিশেষে ভালোই, এমনকি প্রয়োজনীয়ও। কিন্তু সার্বত্রিক প্রয়োগে তা শিল্পকলাকে নষ্ট করে, বক্তব্যকে করে লঘু ও নিষ্ফল। উচ্ছ্বাস মুখ্য হলেও গল্পে উপন্যাসে নাটকে রূপক-রচনায় নজরুল ইসলামের ব্যর্থতার অন্য কারণও রয়েছে। গল্প উপন্যাস নাটক লেখার প্রতিভা নজরুলের সামান্যই ছিল। এতে মস্তিষ্কের প্রয়োজন বেশি, হৃদয়বৃত্তির স্থান সামান্য। ভূয়োদর্শন, পরিবেষ্টনী চেতনা, মানবিক বৃত্তি-প্রবৃত্তির গতি-প্রকৃতি জ্ঞান, ব্যক্তির পারস্পরিক আচরণের ও বাহ্য ঘটনার আন্তর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অভিজ্ঞতা, মনস্তত্ত্বের ধারণা এবং প্রজ্ঞা প্রভৃতির সমন্বিত সামর্থ্যেই সম্ভব গল্প উপন্যাস নাটক সৃজন। নজরুলে এগুলো সুলভ ছিল না। তাই তাঁর পরিকল্পিত কাহিনী শিথিলগ্রন্থি, তাঁর অঙ্কিত চরিত্র নির্বণ ও বৈশিষ্ট্য বর্জিত। তার বক্তব্য তাৎপর্যহীন। সংলাপ প্রায় অপ্রতিরোধ্য প্রলাপ ও জীবনবোধ সংকীর্ণ। অবশ্য খণ্ডচিত্র দুর্লভ নয়, মনোহর বাণীমূর্তিও সুলভ। এবং কোনো কোনো প্রবন্ধ সুখপাঠ্য। ভাষাও স্থানে স্থানে হৃদয়গ্রাহী, কিন্তু সামগ্রিক সৌন্দর্য দুর্লক্ষ্য।
