.
০৪.
অতএব নজরুল প্রথম পর্বে কামালপন্থী ছিলেন না, দ্বিতীয় পর্বেও ছিলেন না সমাজবাদী কিংবা ডেমোক্র্যটিক সোসিয়ালিস্ট। তিনি ছিলেন মূলত ধার্মিক। তিনি চেয়েছিলেন আল্লাহ ও বিবেকের দোহাই দিয়ে পীড়নপ্রবণ লোভী মানুষকে সংযত রাখতে, যা যে-কোনো ধর্মবাদী ও ধার্মিকের লক্ষ্য।
নজরুল ছিলেন সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক আকাক্ষার প্রচারক কোনো সূক্ষ্মতত্ত্ব বা অভাবিতপূর্ণ মহৎ আদর্শের উদ্ভাবক নন। মানুষের স্থূল চেতনায় ব্যবহারিক প্রয়োজনের তাকিদ সৃষ্টিই ছিল তাঁর সাহিত্য সাধনার লক্ষ্য। অর্থাৎ তিনি দেশের মানুষের দ্বিবিধ মুক্তি কামনা করেছিলেন–রাজনীতিক পরাধীনতার ও অর্থনীতিক পরবশ্যতার বিরুদ্ধেই ছিল তার সংগ্রাম। এ সংগ্রামে তাঁর কোনো নির্দিষ্ট অস্ত্র ছিল না, কিন্তু লক্ষ্য ছিল স্থির।
স্বদেশের স্বাধীনতাই তাঁর কাম্য ছিল বলে তিনি হিন্দু-মুসলমানের মিলন সাধনা করেছেন। এজন্যে তিনি তাঁদের কুসংস্কারমুক্ত করতে চেয়েছেন, ধর্মের অবিকৃত সারবাণী স্মরণ ও অনুসরণ করতে আহ্বান জানিয়েছেন, আচারিক ধর্মের নিন্দা করেছেন। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ ভূমিকার মূলে রয়েছে এ আদর্শ। কবিতায় মুসলিম ঐতিহ্য এবং হিন্দু পুরাণের মিশ্রণও এ উদ্দেশ্য ও আদর্শ প্রণোদিত। হিন্দু-মুসলিম মিলন না হলে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম হবে অসম্ভব। ফলে স্বাধীনতা থাকবে অনায়ত্ত। মুসলিম ঐতিহ্য ও হিন্দু পুরাণের নির্বিচার বহুল ব্যবহার তাঁর কাব্যকে করেছে হিন্দু মুসলমানের হৃদয়গ্রাহী। তাঁর উদাত্ত আহ্বান তাই সাড়া দিয়েছে উভয় সম্প্রদায়ের সমধর্মী মানুষের মন।
স্বদেশবাসীকে স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করবার জন্যে তিনি আরো এক পন্থা গ্রহণ করেছিলেন–আফ্রো-এশিয়ার পরাধীন জাতির মুক্তিসংগ্রামী নেতাদের প্রশস্তি গান রচনা করেছিলেন। আকস্মিক যোগাযোগে (accidental coincidence) তাঁরা ছিলেন মুসলিম অধ্যুষিত দেশের মুসলিম নেতা। কাকতালীয় ন্যায় প্রয়োগে নজরুল হলেন মুসলিম জাগরণের চারণ কবি Pan Islamist যারা তাকে বিশ্বমুসলিম জাতীয়তাবাদী ঠাওরিয়ে উল্লসিত হলেন, সেই শিক্ষিত মুসলিম বাঙালিরাও স্বস্থ ছিলেন না, তাঁরা তখনো জামালুদ্দীন আফগানীর প্রভাবে অভিভূত। এবং নিজেরা নিঃস্ব ও অসমর্থ বলে জ্ঞাতির সৌভাগ্যস্বপ্নে আনন্দিত। তাই কোনো কৃতীপুরুষ আরবি-ফারসি নামধারী হলেই, তার গৌরব-গর্বে তাঁরা হতেন স্ফীত। এজন্যেই যে কামাল আতাতুর্ক কোরান পুড়িয়ে, মসজিদ ভেঙে এবং আরবি ছাড়িয়ে তুর্কীজাতিকে নবজীবন দানে হলেন প্রয়াসী অর্থাৎ ইসলামের কবলমুক্ত করেই বাঁচাতে চাইলেন স্বজাতিকে, তিনিই এদেশী মুসলমানদের চোখে হলেন মুসলিমদের জাতীয় বীর ও ইসলামের ত্রাণকর্তা। স্বয়ং নজরুল ইসলাম এঁদের অন্যতম।
যদিও নজরুল pan Islamist ছিলেন না, তবু স্বধর্মীপ্রীতির সংস্কার তাঁরও ছিল। এখানেও তাঁর দ্বৈতসত্তা। Pan Islamist নন অথচ একপ্রকার ধর্মীয় জাতীয়তায় আস্থা রাখেন। ফলে তিনি কখনো দেশগত জাতি নির্মাণে ব্রতী, কখনোবা ধর্মীয় স্বজাতির কীর্তি ও কর্ম থেকে প্রেরণা সঞ্চয়ে উদ্যোগী। অবশ্য তিনি হিন্দু-মুসলমানের স্বাতন্ত্রের মধ্যেই ঐক্যকামনা করেছেন, অভিন্ন জাতিরূপে গড়ে তোলা সম্ভব, ভাবেননি। অর্থাৎ পারস্পরিক প্রীতির সম্পর্কে নয়–সহিষ্ণুতার ভিত্তিতে সমস্বার্থে সমবেত হতে আহ্বান জানিয়েছেন মাত্র। এটি বাস্তব পন্থার কাছাকাছি কিন্তু বাস্তব নয়। কেননা সমস্বার্থে মিলনের আগে স্বার্থ ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে বোঝাঁপড়া দরকার। এটি রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন, নজরুল নয়।
নিপীড়িত জনতার দারিদ্র্যমুক্তির ব্যাপারেও তিনি কোনো নতুন মতাদর্শের অনুসারী ছিলেন না। ধর্মীয় চেতনার মাধ্যমে তিনি শোষক-পীড়কদের ন্যায়নিষ্ঠ ও কৃপাবান করতে চেয়েছিলেন। সামন্ত সমাজের অশোভন অসঙ্গতি থেকে বিবেকবান সমাজে উত্তরণই যেন তাঁর কাম্য ছিল। তাই তিনি কুলি-মজুর-চাষীর প্রতি সুবিচার দাবী করেছেন। মার্কসীয়তত্ত্বের অনুসরণে কিংবা লেনিনীয় সমাজের অনুকরণে ধন বণ্টনভিত্তিক শ্রেণীহীন সমাজ নির্মাণ তাঁর অভিপ্রেত ছিল না। এখানেও তিনি শাস্ত্রানুমোদিত অথচ কিছুটা মার্কসবাদ সমর্থিত আদর্শ সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। এ একপ্রকার গোঁজামিলে দুকূল রক্ষার প্রয়াস। তাই তিনি যন্ত্রের পরিবর্তন চাননি–যন্ত্রজ পদার্থকে প্রতিপক্ষ ভেবে গাল দিয়েছেন জমিদার, মহাজন, সওদাগর ও কল মালিককে। এখানেও তার সেই দ্বৈতসত্তা প্রত্যক্ষ করি। এর কারণ নজরুলের চেতনায় কোনো সংস্কার-মুক্তি ছিল না। পরিবেশ থেকে পাওয়া নতুন ভাব-চিন্তা তার অন্তরের রক্ষণশীলতার ও সংস্কারাচ্ছন্নতার মূলোচ্ছেদ করতে পারেনি। ফলে তাঁর প্রগতিবাদিতা তথা নতুন চিন্তানুরাগ বাহ্যাড়ম্বর ও বাগাড়ম্বররূপে ত্বকে প্রলিপ্ত চন্দনের মতো আভরণ হয়ে কিংবা অঙ্গে মর্দিত তৈলের মতো লাবণ্য হয়েই রইল, তাঁর কাব্যে এটি মর্মবাণী হয়ে উঠল না।
.
০৫.
প্রতিভা কেন, কোনো মানুষেরই মত-পথ ধ্রুবতায় অবসিত হয় না। কেননা অভিজ্ঞতার আলোকে মত বদলাতে হয়, পাল্টাতে হয় পথ। এ অসঙ্গতি সব প্রতিভারই চেতনায় ও কর্মে সুলভ। এটি বরং চলমানতার ও গতিশীলতার লক্ষণ, অগ্রগতির ও উত্তরণের পরিমাপক। কিন্তু ক্ষণে ক্ষণে স্ববিরোধ–দ্বিধা, দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতারই সাক্ষ্য। নজরুলে এই স্ববিরোধ অত্যন্ত প্রকট। স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে সন্ত্রাসবাদ এবং শোষণ মুক্তির জন্যে সাম্যবাদ তাঁর প্রিয় হলেও তিনি একাধারে নিয়মতান্ত্রিক, গান্ধীপন্থী, কামালপন্থী, গণবিপ্লবী, সমাজ-সংস্কারক, চরকা-মাহাত্ম প্রচারক, লীলাবাদী আধ্যাত্মিক ও মরমী, সর্বসংস্কারমুক্ত, ভৌতিক বিশ্বাসে অভিভূত, স্বধর্মনিষ্ঠ ও নাতে আসক্ত এবং শ্যাম-শ্যামা সঙ্গীতে আগ্রহী।
